11/07/2026
৩০ জুলাই বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস।
৩০ দিন, ৩০ ভয়েস।
পর্ব–১১: আমাকে বিক্রি করার আগে তারা আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিল।
"আমি ভেবেছিলাম অবশেষে আমার নতুন কর্মস্থলে পৌঁছেছি। কিন্তু পরে বুঝলাম, সেই ইন্টারভিউটাই ছিল আমাকে একটি সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে আটকে ফেলার শেষ ধাপ।"
আমি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছিলাম এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আমি একটি বৈধ চাকরি পেয়েছি। কম্বোডিয়ার সিহানুকভিলে পৌঁছানোর পর আমার দালাল আমাকে বলেছিল, আগে একটি কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে হবে। তখন আমার মনে হয়েছিল, সবকিছুই সত্যি এবং বৈধ।
কোম্পানির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দালাল আমার একটি ছবি তুলে একজন চীনা নাগরিকের কাছে পাঠায়। কয়েক মিনিট পর একটি কালো প্রাইভেট কারে কয়েকজন চীনা নাগরিক এসে পৌঁছায়।
তাদের একজন তার মোবাইল ফোনে আমার সেই ছবিটি দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল,
"এটা কি তোমার ছবি?"
আমি মাথা নেড়ে বুঝালাম এটা আমার ছবি।
তারপর তারা গেট খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
ইন্টারভিউটি একেবারেই বাস্তব মনে হয়েছিল।
তারা আমার টাইপিং স্পিড পরীক্ষা করল।
বাংলাদেশে আমি কী কাজ করতাম, কত ঘণ্টা কাজ করতাম এবং আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইল।
ইন্টারভিউ শেষে তারা আমার পাসপোর্ট নিয়ে নিল এবং বলল, "আগামীকাল থেকে তুমি কাজ শুরু করবে। তোমার মাসিক বেতন হবে ৮০০ মার্কিন ডলার।"
আমি বিশ্বাস করেছিলাম, বিদেশে আসার যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলাম, তা হয়তো সত্যি হতে চলেছে।
পরদিন সকালে কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মী আমাকে কাজ শেখাতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে কোনো ডাটা এন্ট্রির চাকরির জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
আমি মানবপাচারের শিকার হয়ে একটি সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে এসে পড়েছি।
সেখানে আমাকে অনলাইনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের নাগরিকদের টার্গেট করে প্রতারণা করার কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল।
আমি যখন বললাম, আমি এই কাজ করতে পারব না, তখন তারা এমন একটি কথা বলেছিল, যা আজও আমি ভুলতে পারিনি।
"এই কোম্পানি থেকে বের হতে চাইলে তোমাকে ২,০০০ মার্কিন ডলার দিতে হবে। আর যদি বাঁচতে চাও, তাহলে ঠিকমতো কাজ করো।"
সেই মুহূর্তেই আমি বুঝে গেলাম, আমি আর স্বাধীন নই।
সেই ইন্টারভিউ কখনোই আমাকে চাকরি দেওয়ার জন্য ছিল না।
মানবপাচারকারী চক্রগুলো এখন অনেক বেশি কৌশলী হয়ে উঠেছে। তারা শুধু নিয়োগের সময় প্রতারণা করে না; তারা বৈধ কর্মসংস্থানের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই নকল করে ইন্টারভিউ, দক্ষতা যাচাই, কোম্পানির অফিস এবং চাকরির প্রতিশ্রুতি সবকিছু ব্যবহার করে একটি বৈধ চাকরির ভ্রম সৃষ্টি করে।
এটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
বিদেশে যে কোম্পানিগুলো চাকরির প্রস্তাব দেয়, সেগুলোর সত্যতা কে যাচাই করে?
বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তা ও কর্মস্থল কতটা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়?
আর কতজন অভিবাসী কর্মী এমন একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন, যা বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বৈধ মনে হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের একটি সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে পৌঁছে দেবে?
আজকের মানবপাচার অনেক সময় শিকল দিয়ে নয় বরং একটি বৈধ চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েই শুরু হয়।