12/11/2025
আজকে আব্দুল মালেক সাহেব দা বা রংপুরে এসেছিলেন। তিনি আমাদের ভেতরে পিপাসা আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। তালীমুদ্দিন একাডেমীর দীর্ঘ দুই ঘন্টা এবং বেগম রোকেয়া ইউনিভার্সিটির এক ঘন্টার আলোচনার সারমর্ম,
১. আলিমদের জন্য ফিতনায়ে বাতিলা বা ইসলাম বিরোধী সমস্ত মতাদর্শ গভীরভাবে জানা ও বোঝা ফরজ। সাধারণ মানুষের জন্য জানাও জরুরী। আকিদা সহিহ না থাকলে ইমান রক্ষা করা যাবে না।
২. যে কোনো কাজে কর্মে আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করা বা তাঁর আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ করা সিরাতাল মুস্তাকিমের বিপরীত।
৩. ফিতনা দুই প্রকার। এক. ইসলামের নামে ফিতনা (আহমদিয়া মুসলিম জামাত, ঈসায়ী মুসলিম, আহলে কুরআন, সুফী ইসলাম এবং আধুনিক যুগের ইন্টারফেইথ, বিভিন্ন ইসলামবিরোধী মতাদর্শ) এরা সম্পূর্ণ ইসলামের গণ্ডির বাইরে।
দুই. ইসলামের ভেতরে ফিতনা। (বিভিন্ন বিদয়াত, কাদিরিয়া, জাহমিয়াা) এরা ইসলামের বাইরে চলে গেছে তা বলা যাবে না। কিন্তু ভুলের মধ্যে আছে। এদের মধ্যে ইসলামের নামে মানুষকে ধোঁকা দেয়াটা বেশি মারাত্মক। কারণ সাধারণ মানুষের জন্য এর থেকে বেঁচে থাকা কঠিন।
৪. প্রত্যেকটা বিষয়ে সিরাতাল মুস্তাকিম আছে। বিয়েতে সিরাতাল মুস্তাকিম হলো নবীজির দেখানো পথ। তিনি যেভাবে সংসার জীবন অতিবাহিত করেছেন সেটা বিয়ের জন্য সঠিক পথ। একইভাবে তিনি যে পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন সেটাই রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পথ, যেভাবে সমাজ চালিয়েছেন সেটাই সামাজ পরিচালনার সিরাতাল মুস্তাকিম। কেউ যদি তাঁর পদ্ধতি বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ পছন্দ করে ইসলামের আদর্শ বাদ দিয়ে সেকুলারিজম, মার্কসবাদ লেলিনবাদ মানে তাহলে সে সরাসরি রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করল। আর কেউ রাসূলের বিরুদ্ধে গেলে তার স্থান হলো জাহান্নাম।
৫. এই ফিতনার সময়ে বেঁচে থাকার কৌশল হলো মুমিনদের পথ অনুসরণ করা। মুমিনদের সব অংশ একসাথে গোমরাহ হবে না। এই ফিতনার সময়ে যারা ভিন্ন ভিন্ন দাওয়াতের বিপরীতে কোনটা সঠিক বুঝতে পারবে না তাদের জন্য সঠিকটা চিনতে হলে উম্মতের সম্মিলিত মতের দিকে খেয়াল করতে হবে। কোন মতটা উম্মতের অধিকাংশ আলিম ও মুমিনগণ অনুসরণ করছেন তা বেছে নিবে।
৬. আহলে সুন্নাত ওয়াল একটা স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন এবং বিপদমুক্ত রাস্তা। আমাদের এই আকিদায় অটল থাকতে হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আদর্শ চেনার মূলনীতি হলো,
ক. তারা কোনো নবীদের সমালোচনা করে না।
খ. তারা কোনো আহলে বায়েত বা নবী পরিবারের সমালোচনা করে না।
গ. তারা কোনো সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে না
ঘ. তারা উম্মতের কোনো ইমামদের সমালোচনা করে না
ঙ. তারা সম্মিলিতভাবে আলিমদের বিরোধিতা বা সমালোচনা করে না।
চ. তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর রাসূল ও তার খলিফাদের পথ অনুসরণ করে।
যেখানেই এর বাইরে কোনো কথা হবে বা এর বাইরে কোনো মত পাওয়া যাবে তা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার অন্তর্ভুক্ত নয়। যে বা যারা এই পয়েন্টগুলোর বাইরে কিছু বলতে বা বোঝাতে চাইবে আমাদের তাদের সঙ্গ বা সেই স্থান ত্যাগ করতে হবে।
৭. বর্তমান সময়ে জরুরি হলো, আকিদার ইলম অর্জন করা। এরপর জরুরি হলো হালাল হারামের ইলম জানা।
৮. ঐক্যের কারণে সমাজে বিভেদ তৈরি হয়। আকিদার সমস্যা তৈরি হয়। অনেকসময় বৃহৎ স্বার্থে বিভিন্ন দল বা গোত্রের সাথে আমাদের ঐক্য করতে হয়। তবে ইসলামে ঐক্যের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ঐক্যের নামে নিজের আদর্শকে বিকিয়ে দেয়া যাবে না। নির্দিষ্ট শর্ত ও সুবিধা জেনে বুঝে শরীয়ত অনুযায়ী ঐক্য করা যাবে।
৯. প্রত্যেকটা মানুষের ভেতরে গুনাহ ছাড়ার শক্তি রয়েছে। কিন্তু আমরা সেই ঈমানের শক্তিটা কাজে লাগাই না। যার ফলে গুনাহ থেকে বাঁচতে পারি না। অথচ আল্লাহ তায়ালা শয়তানের সকল ফাঁদকে দুর্বল বলেছেন।
১০. ভার্সিটি ক্যাম্পাস বা নিজ এলাকার ভাইদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দ্বীনি মজলিসে যাওয়ার দাওয়াত দিতে হবে। আদবের সাথে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে বলতে হবে। তারা না আসতে চাইলেও নিয়মিত আহ্বান করে যাওয়া। কারণ তারা ফিরে আসলে এটা আপনার সদকায়ে জারিয়ার কারণ হবে। আমলনামা বৃদ্ধি পানে।
১১. পৃথিবীতে যত সমস্যাই থাকুক না কেন এর সমাধান আল্লাহর রাসূল সা. এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনী ও আদর্শ থেকেই হবে। সমস্যা নতুন হোক বা পুরাতন সমাধান কেয়ামত পর্যন্ত পুরাতন পদ্ধতিতেই হবে।
এছাড়া তার দীর্ঘ সময়ের আলোচনায় তিনি অনেককিছুই বলেছেন। আমি শুধু নিজের অনুভূতি বলি। একটা বিষয় খুব কষ্ট পেয়েছি। তার আলোচনার মাঝখানে বারবার মনে হচ্ছিল, এতদিন কেউ কেন এভাবে ইসলাম বুঝিয়ে দিল না? ইসলাম এত সহজ আর সুন্দর তা কেন জানলাম না?
আসলে আমাদের ইলমের অভাব নেই, বুঝের অভাব নেই কিন্তু বুঝিয়ে দেয়ার মানুষের অভাব। আহ! অন্যরা কি বলবে জানিনা কিন্তু এই মানুষটাকে দেখলে বোঝা যায় প্রকৃত আলিম কি এবং আলিম কাকে বলে। যখন তিনি কুরআনের আয়াত বললেন তখন তার বিশ্লেষণ আমাদের মুগ্ধ করলো বারবার। আর যখন হাদিস থেকে পাওয়া উসূল ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন তা আমাদের গভীর আবেগাপ্লুত করে তুলল। একটা হাদিস নিয়ে এভাবেও ভাবা যায় তা দেখে আশ্চর্য হলাম।
আমি পুরোটা সময় হুজুরের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে চেষ্টা করেছি। এই মানুষটার কদর করতে পারিনি আমরা। জীবনে অনেক আলিমের সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। অনেককে সামনা সামনি দেখার তাওফিক হয়নি। কিন্তু এখন পর্যন্ত নববী আখলাক আর নবুয়তের সৌরভ মিশে থাকা এই মানুষটার পুরো ব্যক্তিত্ব আমার হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছে। আজ নবুয়ত নাই। নবী না থাকার যন্ত্রণা আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করি। কিন্তু এমন একটা মানুষের কাছে আসলে হৃদয়ের সেই ক্ষুধা কিছুটা মেটানোর সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু অন্যদের মাঝে এমনটা নেই কেন? কেন এই আখলাক, এই ভালোবাসা, এই মায়া, এই আবেগ, এই দরদ দিয়ে কেউ এতটা সহজ করে ইসলামটা বুঝিয়ে দেন না আমাদের?
আমরা আজ কোন ইসলাম নিয়ে পড়ে আছি জানিনা। সারাদিন যুক্তিতর্ক আর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা দেখে শুনতে শুনতে ক্লান্ত হৃদয়। আমাদের এমন শান্ত প্রবাহমান স্রোত দরকার। যেখানে গা মেলে দিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে। যেখানে কিছুক্ষণ পর পর কারণে অকারণে তার 'লা ইলাহা ইল্লালাহ' বলা আমাদের কোনো ব্যাখ্যা আর বিশ্লেষণ ছাড়াই তাওহীদের সবক শুনিয়ে দেবে।
সংগৃহীত