19/06/2026
চিরকুট
দুইশত চৌদ্দ
আমার কাজের জন্য কোন সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার প্রত্যাশা আমার কখনও ছিল না মূলত দু’টি কারণে-
এক, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য যে যোগ্যতা ও মানসিকতা দরকার, তা আমার নেই ।
দুই, আমি যে বিষয়ে কাজ করি তার ফলাফল দৃশ্যমান নয়; আমার জীবদ্দশায় তা দৃশ্যমান হওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই । ফলে, কোন ধরণের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার আশা আমি কখনও করিনি । হয়ত এ কারণেই যখন জানলাম রোটারি, ক্লাব অব উত্তরা আমাকে সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য ‘Vocational Excellence Award, 2026’ বা ‘বৃত্তিমূলক শ্রেষ্ঠত্ব পুরুস্কার, ২০২৬’ এর জন্য নির্বাচন করেছে; তখন সত্যিই আমি অবাক হয়েছি । তবে, একথা সত্য, আমার কাজের কোন কৃতিত্ব থাকলে, তা আমার নিজের নয়, এ কৃতিত্ব অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের । কারণ, আমি যাকিছু করি, তা অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের পক্ষে করে থাকি ।
অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন আসলে দুনিয়ার সকল প্রকার ভালো কাজ করতে চায় । কিন্তু বাস্তবে যেহেতু পৃথিবীর সব ভালো কাজ কোন একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা সম্ভব নয়; তাই আমরা আমাদের কাজকে দু’ভাগে ভাগ করেছি ।
এক, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো কাজ করা; এবং
দুই, অন্যকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা ।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো কাজ করার কাজ আমরা অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি পাঠাগারের মাধ্যমে করে থাকি। অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি পাঠাগার যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার মুক্তারপুর গ্রামে অবস্থিত ।
অন্যকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার কাজ অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ঢাকা অফিস থেকে পরিচালনা করা হয়। উল্লেখ্য, আমি নিজে একসময় এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ছিলাম । অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি পাঠাগারের মাধ্যমে সমাজকল্যাণমূলক কাজ এবং এনজিও ব্যুরো পরিচালনার অভিজ্ঞতা - এই দুটো মিলে আমার মনে হয়েছে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন না হলে এদেশের সত্যিকার উন্নতি কখনও সম্ভব নয় । দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কাজ; আমার মনে হয়েছে, এ ধরণের সমাজকল্যাণমূলক কাজে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা না কমিয়ে, বরং বৃদ্ধি করে থাকে। কারণ, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে গেলে দেখা যায়, এদেশের সকলেই দরিদ্র- সকলেই ত্রাণ সামগ্রী পেতে চান। যারা ত্রাণ বিতরণ করেন, তাঁরা জানেন, ত্রাণ সামগ্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে এদেশে ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । আমাদের দেশের সকল প্রকার সচ্ছল মানুষের এ ধরণের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে, কোনভাবেই এ দেশের উন্নতি সম্ভব নয় । এই অপ্রিয় বাস্তবতায় অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন অন্যকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে থাকে; যার ফলাফল স্বল্পমেয়াদে পাওয়া সম্ভব নয় ।
বর্ণিত অবস্থায় মানুষকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন বর্তমানে ৩টি কাজ করে থাকে-
১। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘শুদ্ধাচার অনুশীলনে চল্লিশের চর্চা’র আয়োজন ।
আমাদের মনে হয়েছে, এদেশে যতপ্রকার দুর্নীতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, এসবের মূলে ৩ টি কারণ কাজ করে- এক, সমাজে মানুষের অবাধ মিথ্যাচার, দুই, দেশপ্রেমের অভাব এবং তিন- মানুষের মধ্যে ধর্ম ও নৈতিকতাবোধ কাজ না করা । এই ৩ টি বদগুণ আমাদের বড়দের প্রায় সকলের মধ্যে আছে । স্বল্পমেয়াদে এধরণের বদগুণমুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণেই অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ছোটদের তথা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুদ্ধাচার অনুশীলনে চল্লিশের চর্চা’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে । চল্লিশ দিনের শুদ্ধাচার অনুশীলন কৌশল এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ৩টি বদগুণ দানা বাধতে না পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ প্রতিযোগিতা পরিচালনার পাশাপাশি আমরা সরকারকে অনুরোধ জানাই, যেন প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে এ ধরণের প্রতিযোগিতাকে বাধ্যতামূলক কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এক্সট্রাকারিকুলার হিসেবে গ্রহণ করা হয় । এতে সরকারের কোন আর্থিক সংশ্লেষ নেই; অথচ এ ধরণের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে ।
২। পুস্তক প্রকাশনাঃ আমার বছরব্যাপী লেখার সংকলনগ্রন্থ প্রতিবছর বইমেলায় প্রকাশিত হয় । প্রকাশক ইছামতি প্রকাশনী। বর্তমানে অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের গ্রন্থস্বত্বের ১২/১৩ টি বই বাজারে রয়েছে । বইগুলো অনেকের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস।
৩। বিভিন্ন সংস্থা/ প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে মতবিনিময় সভার আয়োজনঃ এ কর্মসূচি আমরা চলতি বছরে শুরু করেছি। যেকোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনঃ সমাজ পরিবর্তনের অপরিহার্য শর্ত’ বিষয়ক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হলে আমরা সেখানে অংশ নিয়ে থাকি। রোটারি ক্লাব উত্তরা এ ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে জেনে আমি আমাদের কর্মকাণ্ড ক্লাবকে জানাই । প্রস্তাবিত মতবিনিময় সভা আয়োজনের আগেই আমাকে ‘Vocational Excellence Award, 2026’ প্রদান করে সম্মানিত করা হয়েছে- এজন্য রোটারি ক্লাব অভ উত্তরার সম্মানিত সভাপতি রোটারিয়ান মনোয়ারা বেগম মুন্নি, পিএইচএফ, বি, এমডিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা ।
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রী অধ্যাপক শারমিনা পারভীন, কন্যা দোলনচাঁপা ইসলাম এবং অর্পণ - দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম এম্ব্যাসেডর জনাব মাশফিক- উজ- জামান নিউটন উপস্থিত ছিলেন। আমাদের কর্মকাণ্ড বিষয়ে রোটারি ক্লাবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্নেহভাজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রোটারিয়ান আব্দুল হামিদ । তাঁদের সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও শুভকামনা ।
রাশেদুল ইসলাম । ১৯ জুন, ২০২৬ । উত্তরা, ঢাকা ।