19/08/2026
চিরকুট
দুইশত চল্লিশ
একজন ‘শায়েখ’ এঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে । ‘তিনি বলেছেন, ‘যে নামাজ পড়েনা, তাকে হত্যা করতে হবে। তারপর তাকে গোসল ছাড়াই, কাফন ছাড়াই দূরে মাঠে কোথাও পুঁতে ফেলতে হবে, যাতে কোন চিহ্ন না থাকে’ । যিনি বলেছেন, সেই শায়েখের নাম এ লেখায় উল্লেখ করতে চাইনে । ফেসবুকের সম্মানিত প্রায় সকল পাঠকই তাঁর বক্তব্যের ওপর বিরুপ মন্তব্য করেছেন । যারা শায়েখ মহোদয়ের পক্ষে বলেছেন, তাঁদের দু’জনের মতামত নিম্নরূপ-
এক- ‘(তিনি) খাঁটি মুসলমান, নবী যা কোরআন ও হাদিসে বলে গেছেন, তাই তিনি ডেলিভারি করেন’।
দুই-“ইসলাম কায়েম করতে হলে, এগুলো করতেই হয়। অতীতেও হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে”।
এ দু’টি মন্তব্যই শায়েক মহোদয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাস থেকে করা হয়েছে- তা সুস্পষ্ট ।
‘শায়েখ’ আরবী শব্দ । ‘শায়েখ’ অর্থ প্রবীণ বা সম্মানিত ব্যক্তি। আলেম সমাজে সাধারণত ইসলাম ধর্ম বিষয়ে প্রবীণ জ্ঞানী ব্যক্তিকে ‘শায়েখ’ সম্বোধন করা হয় । তার মানে ভাইরাল বক্তব্য দেওয়া শায়েখ মহোদয় ইসলাম ধর্ম বিষয়ে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি এবং তাঁর বড় একটি অনুসারী দলও রয়েছে।
এখানে প্রশ্ন, ইসলাম ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানের ভিত্তি কি ? এককথায় উত্তর দিলে বলতে হয়, ইসলাম ধর্ম মতে জ্ঞানের মূল উৎস কোরআন । যদি প্রশ্ন করা হয়, শায়েখ মহোদয় নামাজ না পড়া বিষয়ে যা বলেছেন, তা কি কোরআনে আছে ? বা তিনি কি এ বিষয়ে কোরআন সম্মত বক্তব্য দিয়েছেন ? এ প্রশ্নের এককথায় উত্তর, ‘না’, একথা কোরআনে নেই এবং শায়েখ মহোদয় নামাজ না পড়া বিষয়ে কোরআন সম্মত কথা বলেননি ।
ইসলাম ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানের দ্বিতীয় ভিত্তি ‘সুন্নাহ, যা মূলত হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এঁর জীবন আদর্শ। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজের জীবনের কোনও ক্ষেত্রে,বা কোনও পরিস্থিতিতে কি শায়েখ মহোদয় যা বলেছেন, এমন কোনও কথা, কখনও কি তিনি কোথাও বলেছেন ? এ প্রশ্নেরও এককথায় উত্তর ‘না’। নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর জীবনে কখনও, কোথাও বলেননি যে, ‘যে নামাজ পড়ে না, তাকে হত্যা করতে হবে’ ।
কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোন জোরজবরদস্তি নেই ‘ (সূরা বাকারা, আয়াত, ২৫৬)। ‘যে নামাজ পড়েনা, তাকে হত্যা করতে হবে’ – কথাটি নিঃসন্দেহে জবরদস্তিমূলক- যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত বিধানের সরাসরি পরিপন্থী ।
যে কথা কোরআনে নেই বা হাদিসে নেই- অথচ, শায়েখ সাহেব কিসের ভিত্তিতে বললেন, ‘যে নামাজ পড়েনা, তাকে হত্যা করতে হবে’ ? এ বিষয়ে কোরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করা যেতে পারে । কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর এক শ্রেণির মানুষ (ঐশী বাণীর পরিবর্তে) অসার কথাবার্তাকেই প্রাধ্যান্য দেয় । ওরা অর্থহীন বাক্যমালা ব্যবহার করে নির্বোধ লোকদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে এবং আল্লাহর বিধান নিয়ে হাসিতামাশা করে। ওদের জন্য রয়েছে অপমানজনক কঠিন শাস্তি” (সূরা লোকমান, আয়াত ৬-৭)।
প্রকৃত পক্ষে যারা শায়েক মহোদয়কে অনুসরণ করছেন, তাঁরা তাঁর প্রতি অন্ধবিশ্বাস থেকেই করছেন –যা এক ধরণের ধর্ম থেকে বিচ্যুতি । কোরআনে এ ধরণের অন্ধবিশ্বাস থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে । বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম জীব হচ্ছে সেই মূক ও বধিররা, যারা তাদেরকে প্রদত্ত বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে না’ (সূরা আনফাল, আয়াত ২২)।
একজন শায়েখ পবিত্র কোরআন পরিপন্থী একটি কথা বললেন; কিন্তু দেশের সচেতন আলেম সমাজের কেউ এ বিষয়ে কোন প্রতিবাদ করেন নি । এতে শুধু ভিন্নধর্মের মানুষ নয়, সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেও ভুল বার্তা যায় । বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ধর্ম বিতর্কিত হওয়ার মূলে আলেম সমাজের এ ধরণের নিরলুপ্ততা অনেকটা দায়ী । ভাইরাল শায়েখ মহোদয়কে বলবো, ধর্মের শাখা প্রশাখার ওপর নির্ভর না করে, দয়া করে মুসলমানদের মূল ধর্মগ্রন্থ কোরআন পড়ে সে অনুযায়ী কথা বলুন । বিজ্ঞ আলেম সমাজের প্রতি বিনীত অনুরোধ, ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো কোরআন এবং কোরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা করুন । এদেশের ধর্মভীরু মানুষেরা অন্ধভাবে আলেমদের বিশ্বাস করেন, আলেমগণ যেভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা দেন, তাঁরা সেটাই মেনে নেন । সাধারণ মুসলমানদের এ ধরণের সরল বিশ্বাসের মর্যাদা আলেমগণ দিবেন- এই প্রত্যাশা আমাদের ।
আমার মত সাধারণ একজন মুসলমান, সাধারণ ধর্মজ্ঞান নিয়ে ইসলামের শায়েখ পর্যায়ের একজন আলেমের বক্তব্য নিয়ে কলম ধরুন - এটা আমার নিজেরও কাম্য নয় ।
রাশেদুল ইসলাম , ১৯ আগস্ট, ২০২৬ । মোহাম্মদপুর, ঢাকা ।