16/04/2026
আমার পিএইচডির প্রথম টপিক ছিলো সাসটেইনিবিলিটি, সুনির্দিষ্টভাবে বললে, কোম্পানি যখন পরিবেশ আর সমাজের জন্য ভালো কিছু করে, সেটা তার ব্যবসায়িক লাভের উপর কী প্রভাব ফেলে সেই সম্পর্কের বিশ্লেষণ। পরে সাবজেক্ট বদলেছি, কিন্তু কার্বন ট্রেড নিয়ে পিএইচডির কোর্স হিসেবে একটা পুরো কোর্সও করেছিলাম। কিঞ্চিৎ পড়াশোনা আছে এই এলাকায়। সেই পড়াশোনার জায়গা থেকেই বলি।
প্রথমে দেখি কার্বন ক্রেডিটটা কী জিনিস?
ধরেন আপনি একটা কারখানা চালান, কার্বন বের হয়। আপনি পরিবেশের ক্ষতি করতেছেন। আপনার উপায় নাই কার্বন কমানোর। কিন্তু আপনি আন্তরিক ভাবে চান আপনার পরিবেশ ধ্বংসের দায় থেকে যেন আপনি কিছুটা হলেও মুক্তি পান। তখন আপনার দায়মুক্তি দেয়ার জন্য কেউ কেউ এগিয়ে আসে। এরাই হচ্ছে কার্বন ক্রেডিট ট্রেডার। সেটা আবার কী?
ধরেন আরেকজন গ্রামে সোলার প্যানেল বসালো, কার্বন কমলো। সেই "কমানো কার্বন"-টা একটা সার্টিফিকেট হয়ে বাজারে বিক্রি হয়, এটাই কার্বন ক্রেডিট। যে কারখানা কার্বন কমাতে পারছে না, সে এই ক্রেডিট কিনে নিজেকে "গ্রিন" বা পরিবেশ বান্ধব দেখায়। সোজা কথায়, দূষণের অপরাধবোধ টাকা দিয়ে কেনা।
এবার বাংলাদেশের হিসাবটা দেখেন।
বাংলাদেশ ২০০৬ থেকে আজ পর্যন্ত, মানে প্রায় ২০ বছরে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে আয় করেছে মোট ১৬.২৫ মিলিয়ন ডলার। বছরে গড়ে ১ মিলিয়ন ডলারের কম। এই আয়টা আসছে মূলত আইডিকলের দুটো প্রকল্প থেকে, গ্রামে উন্নত চুলা বিতরণ আর সোলার প্যানেল বসানো।
আইডিকল কী? সরকারের একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকার টাকা নিয়ে গ্রামে পৌঁছে দেয়। ৬০ লক্ষের বেশি বাড়িতে সোলার প্যানেল বসিয়েছে। উন্নত চুলা বিতরণ করেছে। গ্রামে যেখানে বিদ্যুৎ লাইন পৌঁছায়নি, সেখানে এই সোলার প্যানেলে বাতি জ্বলে, ফোন চার্জ হয়। আর উন্নত চুলায় কাঠ কম পোড়ে, ধোঁয়া কম হয়, কার্বনও কম বের হয়। এই "কমানো কার্বন"-ই আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি হয়।
২০ বছরে ১৬ মিলিয়ন। এটাই আমাদের এখন পির্যন্ত আয়। হিসাবটা মনে রাইখেন।
আর সাইমুম বলতেছেন এটা বছরে ১ বিলিয়ন হবে। মানে এক লাফে ১০০০ গুণ বাড়বে। হ্যাঁ, এক হাজার গুণ।
তাইলে আসেন আমরা হিসাব করি।
১ বিলিয়ন ডলার আয় করতে হলে আজকের বাজারদরে প্রতি ক্রেডিট ৫ থেকে ১০ ডলার করে ধরলে বছরে ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ক্রেডিট লাগবে। ধরেন প্রিমিয়াম ক্রেডিট বেচবেন যেমন ম্যানগ্রোভ, সুন্দরবন, ব্লু কার্বন, তাহলে ২০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত পেতে পারেন। সেক্ষেত্রেও ২০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ক্রেডিট দরকার।
বাংলাদেশ এখন বছরে কতটা জোগাড় করতে পারে? দেড় লাখ ক্রেডিট। মানে ০.১৫ মিলিয়ন। টার্গেট হওয়ার কথা ২০ থেকে ২০০ মিলিয়ন। ফারাকটা কতো? ১০০ গুণ থেকে ১৩০০ গুণ।
স্বপ্নে ১ বিলিয়ন ডলার আসবে?
আসেন দেখি বাস্তবে বাংলাদেশ কতদূর যেতে পারে। সেক্টর ধরে ধরে হিসাব করি।
ইট ভাটা, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দূষণকারী সেক্টরগুলোর একটা। পুরোপুরি গ্রিন টেকনোলজিতে নিয়ে গেলে ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ক্রেডিট সম্ভব। কিন্তু "পুরোপুরি গ্রিন" মানে হাজার হাজার ভাটাকে আধুনিক করতে হবে, সেটা কবে হবে আল্লাহ জানেন।
কুকস্টোভ, দেশে ২৯ মিলিয়ন অদক্ষ চুলা আছে। সব রিপ্লেস করলে বছরে ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ক্রেডিট আসতে পারে। কিন্তু ২৯ মিলিয়ন চুলা বদলানো এক দশকের কাজ, এক বছরের না।
রিনিউয়েবল এনার্জি, সোলার, উইন্ড বিশাল স্কেলে না গেলে বছরে ৫ থেকে ১০ মিলিয়নের বেশি হবে না।
সুন্দরবন, এমনিতেই প্রটেক্টেড ফরেস্ট। এখানে একটা টেকনিক্যাল সমস্যা আছে যেটাকে বলে "অ্যাডিশনালিটি"। মানে কার্বন ক্রেডিটের নিয়ম হলো, আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার প্রকল্প না থাকলে এই কার্বন কমতো না। সুন্দরবন তো আগে থেকেই আছে, আগে থেকেই সংরক্ষিত — তাহলে "অতিরিক্ত" কী করলেন? এই প্রশ্নে সুন্দরবন আটকে যাবে। নতুন ম্যানগ্রোভ প্ল্যান্টেশন করলে হয়তো ২ থেকে ৫ মিলিয়ন।
সব যোগ করেন, সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ক্রেডিট বছরে। সেটাও আজকে না, ২০৩৫-এর দিকে হবে, যদি সবকিছু ঠিকঠাক যায়।
গড় দাম ১০ ডলার ধরলে? আয় ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার। কয়েকশো মিলিয়ন। ১ বিলিয়ন না।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ না। আরো কয়েকটা ঘটনা আছে যেগুলো সাইমুম বলেনি।
প্রথম ঘটনা, নিজের টার্গেটের সাথে সংঘর্ষ।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির একটা নিয়ম আছে, আপনি যে ক্রেডিট বিক্রি করবেন, সেটা আপনার নিজের কার্বন কমানোর টার্গেটে গোনা হবে না। বাংলাদেশ ২০৩০-এর মধ্যে ২২% কার্বন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন যদি বেশি ক্রেডিট বেচে দেন তাহলে নিজের টার্গেট মিস করবেন। এটা ফ্রি মানি না। এটা একটা ট্রেড-অফ; হয় বেচবেন, নয় নিজে ব্যবহার করবেন। দুটো একসাথে হবে না।
দ্বিতীয় ঘটনা, কার্বন বাজারে এখন বিশ্বাসের সংকট চলতেছে।
২০২৩-২৪ সালে পুরো ভলান্টারি কার্বন মার্কেটে বড় ধরনের ধাক্কা লাগছে। ভেরা, গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের মতো যেসব সংস্থা ক্রেডিট সার্টিফাই করে, তাদের অনেক প্রজেক্ট ধরা পড়েছে ওভারকাউন্টিং-এর জন্য। মানে যতটা কার্বন কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে, আসলে কমেনি ততটা। আর কোন ধরনের ক্রেডিট সবচেয়ে বেশি সন্দেহের তালিকায় জানেন? কুকস্টোভ ক্রেডিট। যেটা বাংলাদেশের প্রধান আয়ের উৎস। গ্লোবাল ক্রেতারা এখন সতর্ক, দাম পড়ছে।
তৃতীয় ঘটনা, বাংলাদেশ নিজেই খুব কম কার্বন ছাড়ে।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০.৪৭ শতাংশ। কার্বন ক্রেডিটের পুরো যুক্তিটাই হলো, আপনি যা কার্বন ছাড়তেন সেটা কমালেন, সেই "কমানো"-টা বিক্রি করলেন। কিন্তু বাংলাদেশ তো এমনিতেই প্রায় কিছু ছাড়ে না, তাহলে "কমানোর" জায়গা কই? যে দেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম দূষণ করে, তাকে বলা হচ্ছে দূষণ কমানোর সার্টিফিকেট বেচে কোটিপতি হওয়া যাবে। আপনার গো / য়ায় চাম থাকলে না আপনি রাধে কিষ্টের নাম জপবেন।
চতুর্থ ঘটনা, যাচাইয়ের সক্ষমতা নেই। প্রতিটা কার্বন ক্রেডিট ভেরিফাই করতে হয়, মানে মাপতে হয়, রিপোর্ট করতে হয়, তৃতীয় পক্ষ দিয়ে যাচাই করাতে হয়। এটাকে বলে এমআরভি; মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং, ভেরিফিকেশন। প্রতিটা ধাপে খরচ আছে, দক্ষ লোক লাগে, প্রতিষ্ঠান লাগে। বাংলাদেশে সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
তাহলে সাইমুম এই ১ বিলিয়ন কোত্থেকে পাইলো? এইডাই কি বাংলার লুথার কিং এর পেলান? হুদাই এইসব আনতাবড়ি ভাব নেয়ার দরকার আছে? বাংলাদেশের মানুষ বেকুব নাকি, যা খুশী কইয়া দিলেই হইলো? এইড্যা কি ধানের শীষের নিব্বাচনি পোতিক? যে ভাসানী কব্বর থিকা উঠ্যা আইস্যা দিয়া যাবে?
সাইমুম এই পেলানের হিসাব মিলায়ে দিক। আমরা শুনবো।
Collected from Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য