12/06/2026
অটিজমের কারণ খোঁজার চেয়ে দ্রুত ইন্টারভেনশন ও প্রশিক্ষণ বেশি জরুরি
Mofijul Islam
Executive Director
MOONFLOWER AUTISM FOUNDATION
যখন কোনো শিশুর অটিজম শনাক্ত হয়, তখন অধিকাংশ অভিভাবকের প্রথম প্রশ্ন হয়—“আমার সন্তানের অটিজম হলো কেন?” কেউ জিনগত কারণ খোঁজেন, কেউ গর্ভাবস্থার কোনো ঘটনা মনে করার চেষ্টা করেন, কেউ আবার নিজের বা পরিবারের কাউকে দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অটিজমের সুনির্দিষ্ট একক কারণ এখনো বিশ্বব্যাপী নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জিনগত, স্নায়ুবিক ও পরিবেশগত কারণ নিয়ে গবেষণা করছেন, কিন্তু একজন শিশুর ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে অটিজম হয়েছে, তার নির্ভুল উত্তর অধিকাংশ সময়ই পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, একটি বিষয় বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত—যত দ্রুত সঠিক ইন্টারভেনশন, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা শুরু করা যায়, শিশুর বিকাশের সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পায়।
গত ২৪ বছরে বাংলাদেশসহ ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ডে অটিজম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে Training অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, সফল পরিবারগুলো অটিজমের কারণ নিয়ে বছরের পর বছর চিন্তা করেনি; বরং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে শৈশবের প্রথম কয়েক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুত ঘটে। শিশুর ভাষা, যোগাযোগ, সামাজিক দক্ষতা ও আচরণগত সক্ষমতা গড়ে ওঠার জন্য এটি একটি “সোনালি সময়”।
অনেক পরিবারকে দেখেছি যারা এক চিকিৎসক থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে ছুটছেন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, অটিজমের “মূল কারণ” খুঁজছেন। এদিকে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। কিন্তু শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, আচরণগত প্রশিক্ষণ বা বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা শুরু হচ্ছে না।
ফলে শিশুটি মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলছে।
অন্যদিকে, যেসব পরিবার দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত ইন্টারভেনশন শুরু করেছে, তাদের অনেক শিশুকেই আমি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে দেখেছি।
“অপেক্ষা করি, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে”—সবচেয়ে বড় ভুল
বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার মনে করে, ছেলে শিশুদের কথা বলতে দেরি হয়, বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন, “বাবাও ছোটবেলায় দেরিতে কথা বলেছে।”
এই ধারণা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে।
যদি একটি শিশু নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়, চোখে চোখে কম তাকায়, কথা বলতে না পারে, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে না চায়, একই কাজ বারবার করে বা আচরণগত অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তাহলে দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
অটিজম কোনো “অপেক্ষা করে দেখার” বিষয় নয়। যত দ্রুত শনাক্ত হবে, তত দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
ইউরোপ থেকে শেখা একটি বিষয়
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে training ও পর্যবেক্ষণের সময় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখেছি—সেখানে অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারগুলোকে দ্রুত সহায়তার আওতায় আনা হয়।
অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, বাড়িতে কীভাবে শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে তা শেখানো হয়, স্কুল ও থেরাপিস্টদের মধ্যে সমন্বয় করা হয়।
তারা জানে, অটিজমের কারণ নিয়ে গবেষণা চলবে, কিন্তু শিশুর বিকাশ থেমে থাকবে না।
এই বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়ায় আমি দেখেছি, পরিবারকে অটিজম ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা থেরাপি যথেষ্ট নয়। শিশুর জাগ্রত সময়ের অধিকাংশই পরিবারে কাটে। তাই বাবা-মা যদি প্রশিক্ষিত হন, তাহলে প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলোও শেখার সুযোগে পরিণত হয়।
খাবার খাওয়া, পোশাক পরা, খেলাধুলা করা, বাজারে যাওয়া, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া—সবকিছুই হয়ে ওঠে শেখার অংশ।
যেসব পরিবার এভাবে কাজ করেছে, তাদের শিশুদের মধ্যে ভাষা, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন দক্ষতার উন্নতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত হয়েছে।
থেরাপি নয়, পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সপ্তাহে দুই বা তিন দিন থেরাপি দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
বাস্তবে থেরাপিস্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক তার পরিবার।
একজন শিশু সপ্তাহে হয়তো দুই ঘণ্টা থেরাপি পায়, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে থাকে শত শত ঘণ্টা।
তাই অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি অসংখ্য পরিবার দেখেছি, যারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়েছে, বাড়িতে থেরাপিস্টের নির্দেশনা অনুসরণ করেছে, শিশুর সঙ্গে বেশি সময় কাটিয়েছে। তাদের সন্তানদের অগ্রগতি অনেক বেশি ইতিবাচক হয়েছে।
অলৌকিক চিকিৎসার ফাঁদে পা দেবেন না
অটিজম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে কষ্টের বিষয়গুলোর একটি হলো, অনেক পরিবার প্রতারণার শিকার হয়।
কেউ বলে বিশেষ ওষুধে অটিজম ভালো হয়ে যাবে, কেউ বলে বিশেষ পানীয়, তাবিজ, ভেষজ চিকিৎসা বা ব্যয়বহুল থেরাপি সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেবে।
এ ধরনের দাবির পেছনে সাধারণত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকে না।
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, অটিজম কোনো সংক্রামক রোগ নয় এবং এর কোনো একক “ম্যাজিক চিকিৎসা” নেই।
কিন্তু সঠিক প্রশিক্ষণ, বিশেষ শিক্ষা, থেরাপি, সামাজিক সহায়তা ও পারিবারিক অংশগ্রহণ শিশুর জীবনমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
বাবা-মায়ের মানসিক শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর অনেক বাবা-মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কেউ নিজেকে দায়ী করেন, কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তার পাশে একজন আশাবাদী, ধৈর্যশীল ও ইতিবাচক অভিভাবক।
আমি এমন অনেক শিশুকে দেখেছি, যাদের শুরুতে খুব সীমিত যোগাযোগ দক্ষতা ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, পরিবারের সহযোগিতা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা স্কুলে গেছে, দক্ষতা অর্জন করেছে, এমনকি কর্মজীবনেও প্রবেশ করেছে।
প্রত্যেক শিশুর বিকাশের গতি আলাদা, কিন্তু সম্ভাবনা প্রায় সব শিশুর মধ্যেই থাকে।
অটিজম মানেই জীবনের শেষ নয়
বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার অটিজম নির্ণয়ের পর মনে করে, সন্তানের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেছে।
এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য অটিস্টিক ব্যক্তি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন, কর্মজীবনে সফল হয়েছেন, উদ্যোক্তা হয়েছেন, শিল্পী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে অবদান রেখেছেন।
সব শিশু একইভাবে এগোবে না, কিন্তু প্রত্যেক শিশুরই নিজস্ব শক্তি ও সম্ভাবনা রয়েছে।
আমাদের কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে সাহায্য করা।
নতুন অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ
১. অটিজম সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানুন।
২. দ্রুত মূল্যায়ন ও ইন্টারভেনশন শুরু করুন।
৩. স্পিচ, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিন।
৪. অভিভাবক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন।
৫. শিশুকে সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন।
৬. অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
৭. শিশুর ছোট ছোট অগ্রগতিও উদযাপন করুন।
৮. নিজের মানসিক সুস্থতার প্রতিও যত্ন নিন।
৯. স্কুল, থেরাপিস্ট ও পরিবারের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখুন।
১০. আশা হারাবেন না।
অটিজমের কারণ নিয়ে গবেষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান একদিন হয়তো আরও স্পষ্ট উত্তর দেবে। কিন্তু একজন শিশুর শৈশব অপেক্ষা করে না।
আজ যে সময়টি চলে যাচ্ছে, সেটি আর ফিরে আসবে না।
তাই অটিজমের কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বিগ্ন থাকার পরিবর্তে, শিশুর বর্তমান প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন। দ্রুত ইন্টারভেনশন, পরিবারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক শিক্ষা ও ধারাবাহিক সহায়তাই শিশুর উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
গত ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে—অটিজমের কারণ জানাটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়াটা তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যে পরিবার আজই শুরু করে, সেই পরিবারই আগামী দিনের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। ♥️
Dhaka, 12 June, 2026 7.20pm