13/04/2026
প্রতি বছর চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের শুরুতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা, গান-বাজনা ও রঙিন আয়োজনে ভরপুর এই দিনটিকে অনেকে নিছক সংস্কৃতির অংশ মনে করেন। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্ন হলো — ইসলাম কি এই উদযাপনকে অনুমোদন করে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর উৎস, প্রকৃতি ও বিধান কী?
এই লেখাটি কোনো মানুষকে ছোট করার জন্য নয়, বরং একজন মুসলিম ভাই ও বোনকে ভালোবেসে সত্য জানানোর সৎ প্রচেষ্টা। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে হেদায়েতের উপর অবিচল রাখুন।
ঐতিহাসিক পটভূমি
পহেলা বৈশাখের উৎস কোথায়?
পহেলা বৈশাখ মূলত মোগল সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত বাংলা সনের প্রথম দিন। তখন এটি ছিল কৃষি-নির্ভর খাজনা আদায়ের একটি প্রশাসনিক উপলক্ষ। পরবর্তীতে ব্রিটিশ যুগে ও বিশেষত ১৯৬০-এর দশকে এটি পূর্ণ একটি সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ নেয়।
বর্তমান কালের মঙ্গল শোভাযাত্রায় হিন্দু পৌরাণিক প্রতীক — পেঁচা (লক্ষ্মীর বাহন), মাছ, বাঘের মুখোশ, ময়ূর — এসব ব্যবহার করা হয়, যা স্পষ্টতই অন্য ধর্মের আচার থেকে নেওয়া। ইউনেস্কো ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, একজন মুসলিমের কাছে কোনো কিছু গ্রহণের মানদণ্ড হলো কুরআন ও সুন্নাহ — ইউনেস্কো নয়।
প্রথম দলিল — কুরআনুল কারিম
কুরআন কী বলে?
সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭২)
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
"এবং যারা মিথ্যা ও অর্থহীন কাজে উপস্থিত থাকে না, আর যখন অর্থহীন কাজের পাশ দিয়ে যায়, তখন সম্মানের সাথে পাশ কেটে যায়।"
অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন, এখানে 'الزُّور' (জুর) মানে হলো মুশরিকদের উৎসব ও অনুষ্ঠানসমূহ। এটি রাহমানের বান্দাদের বিশেষ গুণ হিসেবে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন — তারা এমন অনুষ্ঠানে যায় না।
সূরা আল-মায়িদা (৫:৫১)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ
"হে মুমিনগণ! ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না।"
এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো — কাফির ও মুশরিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুকরণ করা থেকে মুসলিমরা দূরে থাকবে। পহেলা বৈশাখের অনেক আচার হিন্দু সংস্কৃতি থেকে নেওয়া — যা এই নির্দেশের পরিপন্থী।
সূরা আল-আনআম (৬:১৫৩)
وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۔ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ
"এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এই পথে চলো এবং অন্য পথে চলো না, কারণ সে পথগুলো তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।"
আল্লাহর নির্ধারিত পথ ছেড়ে অন্যদের উৎসব ও জীবনধারা অনুসরণ করা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুতির কারণ।
দ্বিতীয় দলিল — সুন্নাহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ কী বলেছেন?
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৩১ (সহিহ)
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمِ فَهُوَ مِنْهُمْ
"যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই একজন।"
এই হাদিসটি ইসলামের মূল নীতি স্থির করে দেয়। মুশরিক বা হিন্দু সংস্কৃতির বিশেষ উৎসব পালন করা, তাদের পোশাক ও আচার অনুকরণ করা — এসবই এই হাদিসের আওতায় পড়ে।
সহিহ বুখারি ও মুসলিম
إِنَّ لِكُلِّ قَوْمِ عِيدًا وَإِنَّ هَذَا عِيدُنَا
"প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব আছে, আর এটি (ঈদ) হলো আমাদের উৎসব।"
মদিনায় হিজরতের পর রাসূল ﷺ দেখলেন সাহাবারা দুটো জাহেলি উৎসব পালন করছেন। তিনি বললেন — আল্লাহ এর পরিবর্তে তোমাদের দুটো উত্তম দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এটি প্রমাণ করে মুসলিমদের উৎসব নির্দিষ্ট — অতিরিক্ত উৎসব তৈরি করা বা পালন করা বৈধ নয়।
সহিহ বুখারি (হাদিস নং ৩৪৫৬) — আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বর্ণিত
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرْ وَذِرَاعًا بِذِرَاعْ
"তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পথ অনুসরণ করবে, বিঘত বিঘত, হাত হাত করে।"
এটি রাসূল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং সতর্কবার্তা — অমুসলিমদের সংস্কৃতি অন্ধভাবে অনুকরণ করার বিপদ সম্পর্কে। আজকের বাস্তবতায় এই ভবিষ্যদ্বাণী যেন হুবহু মিলে যায়।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মুখোশ, পশুর প্রতিকৃতি ও হিন্দু পৌরাণিক প্রতীকগুলো এককথায় মুশরিক আচারের সাথে সম্পৃক্ত। 'মঙ্গল' শব্দটি নিজেই হিন্দু বিশ্বাসে মঙ্গলগ্রহ ও মঙ্গলময়তার ধারণা থেকে নেওয়া।
● প্রাণীর ভাস্কর্য ও মূর্তি তৈরিতে অংশ নেওয়া — রাসূল ﷺ মূর্তি নির্মাতাদের সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
● 'মঙ্গল' কামনার জন্য যে আচার — এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির কাছে কল্যাণ প্রার্থনার ধারণার সাথে সংশ্লিষ্ট।
● হালাল-হারাম মিশ্রিত পরিবেশে থাকলে গুনাহের শরিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
● মেলায় বেপর্দা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সংগীত ও মদ্যপান — এগুলো সুস্পষ্ট হারাম পরিবেশ তৈরি করে।
তৃতীয় স্তম্ভ — আলেমদের মতামত
বিদ্বান আলেমগণ কী বলেছেন?
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃ. ৭২৮ হি.)
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম'-এ তিনি বিস্তারিত প্রমাণ করেছেন যে, কাফিরদের উৎসবে অংশগ্রহণ করা, তাদের বিশেষ দিনগুলো পালন করা এবং সেই উপলক্ষে তাদের সাথে আনন্দ ভাগ করা — মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। তিনি বলেন: 'যে ব্যক্তি তাদের উৎসব পালন করে, সে যেন কুফরকে সম্মান দেখাল।'
ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়্যা রহ. (মৃ. ৭৫১ হি.)
'আহকামু আহলিদ যিম্মাহ' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: কাফিরদের উৎসবে মুসলিমদের উপস্থিত হওয়া, তাদের সাথে আনন্দে শরিক হওয়া এবং তাদের উৎসবের পোশাক পরা — এটি সালফে সালেহিনের কাছে চরম অপছন্দনীয় ছিল এবং তাঁরা এটিকে কুফরির দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ বলে গণ্য করতেন।
শাইখ ইউসুফ আল-কারযাভী রহ. (মৃ. ২০২২)
'আল-হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম' গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট বলেছেন: অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে যোগ দেওয়া, সেখানে আনন্দ প্রকাশ করা বা উপহার আদান-প্রদান করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। পহেলা বৈশাখের বর্তমান রূপ ইসলামি শর্ত পূরণ করে না।
মুফতি তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ (বর্তমান)
তিনি বলেন: হিন্দু ও অন্য ধর্মের উৎসবে অংশগ্রহণ করা মুসলিমের জন্য জায়েজ নেই, বিশেষত যখন সে উৎসবে মূর্তি, পৌরাণিক প্রতীক বা হারাম বিনোদন থাকে। 'মেলায় যাওয়া' বলে নিছক সংস্কৃতির দোহাই দেওয়া যথেষ্ট নয় — কারণ মুসলিমের সংস্কৃতি নির্ধারণ করে ইসলাম।
আপনার জন্মের আগেই আল্লাহ আপনাকে মুসলিম করে পাঠিয়েছেন — এটি কত বড় নেয়ামত, কত বড় সম্মান। একজন মুসলিমের পরিচয় শুধু নামে নয়, তার জীবনযাপনে, তার উৎসবে, তার পোশাকে — সবকিছুতে ইসলাম ঝলমল করে ওঠে।
আপনি হয়তো ভাবছেন — সবাই যায়, আমিও যাব। কিন্তু কিয়ামতের দিন 'সবাই করেছে' এই কথা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সেদিন প্রতিটি মানুষ একা দাঁড়াবে। আপনার ঈমান, আপনার আমল — সেটাই আপনার পরিচয়।
বাঙালি হওয়া ও মুসলিম হওয়া — দুটোই আল্লাহর দান। কিন্তু যখন দুটো পরিচয় সংঘর্ষে পড়ে, একজন মুমিন জানে কোনটি আগে — আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াওয়ালা।
আপনার সন্তান আপনাকে দেখে শিখছে। আপনি যদি আজ তাকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় নিয়ে যান, মুখোশ পরান, হারামের মেলায় নিয়ে যান — তাহলে সে কি ইসলামকে তার জীবনের কেন্দ্রে রাখতে শিখবে? আগামী প্রজন্মের দায়িত্ব আপনার কাঁধে।
এই একটি দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেলায় না যাওয়াটা কি খুব কঠিন? একটু অস্বস্তি হয়তো হবে, বন্ধুরা হয়তো হাসবে — কিন্তু আল্লাহ দেখছেন। তিনি জানেন তাঁর জন্য আপনি কী ছেড়ে দিলেন। এই ত্যাগের মূল্য তিনি দেবেন — দুনিয়ায় নয়তো আখিরাতে।
মুসলিম কী করতে পারে?
● বাংলা নববর্ষের দিনে বেশি বেশি দোয়া করুন — আল্লাহর কাছে নতুন বছরের কল্যাণ, সুস্বাস্থ্য ও রিজিকের ফিকির করুন।
● পরিবারের সাথে সময় কাটান, আত্মীয়স্বজনের সাথে যোগাযোগ করুন — সিলাতুর রাহিম পালন করুন।
● হালাল উপায়ে বাংলাদেশি খাবার রান্না করুন, ঘরে আনন্দ করুন — ইসলামি পরিবেশে।
● ইসলামি বইমেলা, দারসুল কুরআন বা জ্ঞানচর্চার কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিন।
● গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করুন — নববর্ষকে দানের মাধ্যমে স্মরণীয় করুন।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনে অংশ নেওয়া — বিশেষত মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলার হারাম পরিবেশ ও অমুসলিম আচার অনুকরণ — কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একজন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। এটি সংস্কৃতির মোড়কে আসলেও, ইসলামের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, হেদায়েত দিন এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর অবিচল রাখুন।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۔ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
"হে আমাদের রব! আপনি হিদায়াত দেওয়ার পরে আমাদের অন্তরকে বাঁকা করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহান দাতা।" (সূরা আল-ইমরান: ৮)