বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধুর লড়াই। হিসাব চলে পরিসংখ্যানের; কেউ কেউ ইতিহাস ঘেঁটে খুঁজে আনেন জয় পরাজয়ের নানা ঘটনা। পাঁচ বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি ব্রাজিলের, আর্জেন্টিনার দুটি। হট ফেবারিট দুই দলকে নিয়ে আজকের রকমারি—
ডিফেন্ডার : ড্যানিলো (ম্যানসিটি), ফগনার (করিন্থিয়ানস), ফিলিপ লুইস (অ্যাটলেটিকো), পেদ্রো গারমোয়েল (গ্রেমিও), মার্সেলো (রিয়াল মাদ্রিদ), মারকুইনহস (পিএসজি), মিরান্ডা (ইন্টার মিলান), থিয়াগো সিলভা (পিএসজি)।
মিডফিল্ডার : কাসেমিরো (রিয়াল মাদ্রিদ), ফিলিপ কটিনহো (বার্সেলোনা), ফার্নান্দিনহো (ম্যানসিটি), ফ্রেড (শাখতার), পলিনহো (বার্সেলোনা), রেনাতো অগাস্তু (বেইজিং সিনোবো গুয়ান), উইলিয়ান (চেলসি)।
ফরোয়ার্ড : ডগলাস কস্তা (জুভেন্টাস), রবার্তো ফিরমিনো (লিভারপুল), গ্যাব্রিয়েল জেসুস (ম্যানসিটি), নেইমার (পিএসজি), টাইসন (শাখতার)।
আর্জেন্টাইন সৈনিক তারা
রাশিয়া বিশ্বকাপে ডি গ্রুপে খেলবে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল খেলবে ই গ্রুপে। নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হলেই ভক্তদের দারুণ এক ফাইনাল দেখার সুযোগ তৈরি হবে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হতে পারে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা। অবশ্য দুই দলকেই সব বাধা অতিক্রম করে ফাইনালে যেতে হবে।
কোচ : হোর্হে সাম্পাওলি
গোলরক্ষক : নাহুয়েল গুজমান (টাইগ্রেস), উইলি ক্যাবায়েরো (চেলসি), ফ্রাঙ্কো আরমানি (রিভার প্লেট)।
ডিফেন্ডার : গ্যাব্রিয়েল মারসেদো (সেভিয়া), নিকোলাস অতামান্দি (ম্যানসিটি), হাভিয়ের মাসকারেনো (হেবেই চীনা ফরচুন), ফেদেরিকো ফ্যাজিও (রোমা), মারকোস রোহো (ম্যানইউ), নিকোলাস তাগলিয়াফিসো (আয়াক্স), মারকোস আকুনিয়া (স্পোর্টিং সিপি), ক্রিস্টিয়ান আনস্লাদি (তুরিনো), এদুয়ার্দো স্যালভিও (বেনফিকা)।
মিডফিল্ডার : ম্যানুয়েল লানজিনি (ওয়েস্ট হ্যাম), ম্যাক্সিমিলিয়ানো মেজা (ইন্দিপেন্দিয়েন্তে), লুকাস বিগলিয়া (এসি মিলান), এভার বানেগা (সেভিয়া), জিওভানি লো সেলসো (পিএসজি), অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া (পিএসজি), ক্রিস্টিয়ান প্যাভন (বোকা জুনিয়র্স)।
ফরোয়ার্ড : পাওলো দিবালা (জুভেন্টাস),
লিওনেল মেসি, অধিনায়ক (বার্সেলোনা), সার্গিও আগুয়েরো (ম্যানসিটি), গঞ্জালো হিগুয়েন (জুভেন্টাস)।
দুই দলের হিসাব নিকাশ
ব্রাজিলের পঞ্চপাণ্ডব
ব্রাজিলের পাঁচ মহাতারকা নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব। গারিঞ্চা, ডিডি, পেলে, ভাভা ও মারিও জাগালো। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে এই তারকাদের মাঠে দেখা গিয়েছিল। ব্রাজিলের তো বটেই ইতিহাস বলছে, যে কোনো সময়ের ড্রিম টিম ছিল এটি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ দিয়ে যাত্রা শুরু এই পাঁচ লড়াকু সৈনিকের। মধ্যমাঠে ছিলেন ডিডি। জাগালো, পেলে, ভাভা ও গারিঞ্চা ছিলেন আক্রমণভাগে। প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত এই পাঁচ যোদ্ধার সম্মিলিত আক্রমণে। তাদের নিবিড় বোঝাপড়া মাথাব্যথার কারণ ছিল প্রতিপক্ষের। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপ নিজেদের করে নিয়েছিল পাঁচ তারকার সেই ব্রাজিল দল। দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপে দুটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি তাদের উপহার দিয়েছিল ইতিহাস। মধ্যমাঠ বাদ দিলে আর কখনই এত শক্তিশালী আক্রমণভাবে দেখেনি বিশ্ব। পেলে ও গারিঞ্চাকে এখনো ফরোয়ার্ড লাইনে দেখা সবচেয়ে আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়। কৌশলের দিক থেকেও পঞ্চপাণ্ডবে গড়া সেই ব্রাজিল দল বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ৪-২-৪ ফরমেশনে দল সাজিয়ে মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরের বিশ্বকাপে তারা মাঠে নামে ৪-৩-৩ ফরমেশনে। দুই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পাঁচ মহাতারকার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল প্রতিপক্ষ।
ম্যারাডোনার লালকার্ড
১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের ঘটনা। উত্তেজনায় ভরপুর সেই খেলায় মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের। ম্যারাডোনার লালকার্ড সেই ম্যাচের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। পেছন থেকে এসে পা দিয়ে বল কেড়ে নিয়ে সামনে এগোতেই ব্রাজিলের বাতিস্তার তলপেটে লাথি মেরে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ম্যারাডোনা। এই ঘটনা ভুলতে পারেননি তিনি। এক স্মৃতিচারণে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমি এক বছর পর বাতিস্তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম এবং ফ্যালকাওয়ের সঙ্গেও। ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে তারা আমাদের সঙ্গে মজা করছিল। আমি হারতে পছন্দ করি না। সে আমাকে বলেছে, ‘না, দিয়েগো। এটা শুধুই ফুটবল যা আমরা মাঠেই অনুভব করেছি।’ ‘কিন্তু আপনি কি জানেন? যদি আমি তিন গোলে এগিয়ে থাকতাম এবং ‘ওলে! ওলে! ওলে!’ বলে গান শুরু করতাম, তখন আপনিও কিছুটা পাগলাটে হয়ে যাবেন। যদি আপনার শিরার মধ্যে এতটুকু রক্ত থাকে, আপনি রাগে জ্বলে উঠবেন। কিন্তু হ্যাঁ, আমি ভুল খেলোয়াড়কে কিক মেরেছিলাম। অবিশ্বাস্য!’—যোগ করেন ম্যারাডোনা। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি তো বহু পরের ঘটনা। খেলায় কিন্তু আর্জেন্টাইন দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। দর্শকদের সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সহজ হবে না ব্রাজিলের লড়াই
ফিফা র্যাঙ্কিং : ২
কোচ : টিটে
তারকা : নেইমার
ফরমেশন : ৪-৩-৩
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ : ২১তম
বিশ্বকাপে সেরা ফল : চ্যাম্পিয়ন (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২)
রাশিয়া বিশ্বকাপে তুলনামূলক সহজ গ্রুপেই খেলার সুযোগ পেয়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ই গ্রুপে নেইমাররা মুখোমুখি হবেন সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা এবং সার্বিয়ার। একদিকে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন সিলেকাওরা। অন্যদিকে তিন প্রতিপক্ষের কেউই ফাইনাল দূরে থাক, কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিই পাড়ি দিতে পারেনি। অবশ্য সার্বরা সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অংশ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলেছে। চার দলের মধ্যে ব্রাজিল এককভাবেই ফেবারিট। নকআউট পর্বে ব্রাজিলের সঙ্গী হয় কারা, তাই দেখার বিষয়।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল ব্রাজিল। বিশ্বকাপের সব আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দল। এই দলে যুগে যুগেই খেলেছেন কিংবদন্তিরা। পেলে, গ্যারিঞ্চ, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, জিকো, রোনাল্ডো, রিভালদো, রোমারিওদের মতো কত তারকা গায়ে জড়িয়েছেন হলুদ জার্সি। একে একে ৫টা বিশ্বকাপ জিতেছে সিলেকাওরা। রাশিয়া বিশ্বকাপের কয়েক মাস বাকি। এর মধ্যে ব্রাজিল নিজেদের আরও একবার ফেবারিট হিসেবে প্রমাণ করেছে। ল্যাটিন অঞ্চলের বাছাই পর্বে দুর্দান্ত খেলেছে দলটা। টিটের দল টানা ম্যাচ জিতে চলেছে। গত জুনে আর্জেন্টিনার কাছে পরাজয়ের পর সাত ম্যাচ অপরাজিত ব্রাজিল। দলে নেইমার ছাড়াও তারকাখ্যাতি পাওয়া জেসাস, পলিনহো, কটিনহো, আলভেসরা আছেন। দুর্দান্ত এই দলটা গ্রুপ পর্বে তো বটেই, বিশ্বকাপেরই ফেবারিট। রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিল ষষ্ঠবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। এমন সম্ভাবনাই জাগিয়ে তুলেছেন নেইমাররা। বর্তমান ফুটবলে মেসি এবং রোনালদোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের তালিকায় নেইমার সবার উপরে। জাতীয় দলের জার্সিতে এরই মধ্যে ৫৩ গোল করেছেন নেইমার। পেলে আর রোনাল্ডো যুগের পর আরও একবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল।
কঠিন গ্রুপে আর্জেন্টিনা
ফিফা র্যাঙ্কিং : ৫
কোচ : হোর্হে সাম্পাওলি
তারকা : লিওনেল মেসি
ফরমেশন : ৩-৪-৩
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ :
১৭তম
বিশ্বকাপে সেরা ফল : চ্যাম্পিয়ন (১৯৭৮ ও ১৯৮৬)
রাশিয়া বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসিরা গতবার ফাইনাল খেললেও জার্মানদের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যায়। এবার বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব পাড়ি দিয়েছে বহু কষ্টে। তবে রাশিয়ায় লিওনেল মেসিরাই ফেবারিট। অবশ্য ব্রাজিল, জার্মানি আর ফ্রান্সের নামও উচ্চারিত হচ্ছে সমান্তরালে। তবে আর্জেন্টিনার জন্য গ্রুপ পর্ব পাড়ি দেওয়াটা সহজ হবে না। ডি গ্রুপে আলবেসিলেস্তদের মুখোমুখি হতে হবে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৭ নম্বরে থাকা ক্রোয়েশিয়া এবং ২২ নম্বরে থাকা আইসল্যান্ডের। গত ইউরো কাপে সবাইকে চমকে দিয়েছিল আইসল্যান্ড। তাছাড়া এই গ্রুপে সুপারইগলখ্যাত নাইজেরিয়াও রয়েছে।
দিয়েগো ম্যারাডোনা যুগের পর আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দূরে থাক, ফাইনালটাই খেলতে পারেনি। অবশেষে লিওনেল মেসি এসে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেন। তবে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসিরা অপ্রতিরোধ্য জার্মানদের প্রতিরোধ করতে পারেনি। কিন্তু সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। রাশিয়া বিশ্বকাপে মেসি হবেন ৩১ বছরের। একজন ফুটবলারের সবচেয়ে পরিণত বয়স। লিওনেল মেসি কী রাশিয়া বিশ্বকাপে ম্যাজিক্যাল ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা উপহার দিতে পারবেন! ভক্তরা আশা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। বর্তমান কোচ হোর্হে সাম্পাওলি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়েছেন বেশিদিন হয়নি, তবে দলটাকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন। মেসিকে কেন্দ্র করে চারপাশে জড়ো করছেন সেরা আর্জেন্টাইনদের। সার্জিও আগুয়েরো, পাওলো দিবালা, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়াদের নিয়ে দারুণ একটা আক্রমণভাগ রয়েছে আর্জেন্টিনার। ডিফেন্স লাইনেও অতামান্দিদের মতো তারকা রয়েছে আলবেসিলেস্তদের। ১৯৭৮ আর ১৯৮৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা আরও একবার বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি স্পর্শ করতে প্রস্তুত। মেসিরা পারবেন কি এবার ভক্তদের স্বপ্ন পূরণ করতে!