06/08/2026
ঢাকাস্থ শৈলকূপা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সূচনালগ্নের ইতিহাস:
মোঃ আসাদুজ্জামান
আইনজীবি ও রাজনৈতিক কর্মী
১১ আগস্ট, ২০২৩।
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক জীবনে অস্বাভাবিক ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ইতিমধ্যেই খবর পেতে শুরু করলাম যে শৈলকুপা থেকে যে সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তারা অনেকেই হলে সিট পাচ্ছে না। বিষয়টি প্রথম আমার সাথে আলোচনা করলেন আমার আজন্মের সতীর্থ, সুহৃদ, শুভার্থী ফজলু ভাই। ফজলু ভাই শৈলকুপা কল্জে আমার আগের ব্যাচের ছাত্র, বানিজ্য বিভাগে পড়তেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র, থাকতেন স্যার এ এফ রহমান হলে। ফজলু ভাই বলার পর আমি বললাম, তাহলে আমরা শৈলকুপা ছাত্রকল্যান সমিতি নামে একটি সংগঠন তৈরী করি? ফজলু ভাই রাজি হলেন, প্রস্তাব নিয়ে গেলাম জিয়া হলে মান্নান ভাই’র কাছে। মান্নান ভাই শুনে বললেন, শৈলকুপা থেকে অনেকেই ভর্তি পরীক্ষা দিতে কাকরাইল মসজিদে থেকেছে, অনেকেই হলে সীট না পাওয়ায় আশেপাশে মসজিদে রাত যাপন করে। এই সব শুনে একে একে অনেকের সাথে আলাপ করলাম। এভাবেই রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনের দিকে এগিয়ে গেলাম। সবাই মিলে
সেপ্টেম্বর ‘৯০ এ একটি দিন ঠিক করলাম টিএসসির ভিতরের মাঠে বসার জন্য। নির্দিষ্ট তারিখ মনে নেই। একে একে ঊনআশিজনের মত শৈলকুপার ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত হলো, সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা ‘ঢাকাস্থ শৈলকুপা ছাত্র কল্যান সমিতি’ নামে একটি সংগঠন করলাম। সভাপতি পদে ভোটাভুটি হলো, ৭৯ ভোটের মধ্যে আমি ৭৭ ভোট পেয়ে সভাপতি হলাম। অন্য কোন পদে ভোট হয়নি, ফজলু ভাই হলেন ঐ কমিটির সাধারন সম্পাদক।আমাদের প্রথম শর্তই ছিলো দলবল বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় নির্বিশেষে আমরা সকলে সকলের পাশে দাঁড়াবো। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের দায়িত্বপালন করাকালীন আমরা কোন দলীয় বৃত্তের আঁচড় লাগতে দেইনি। আমরা কাজ শুরু করলাম, প্রথম কাজই ছিলো বিভিন্ন হলে যে সকল শৈলকুপার ছাত্রছাত্রীরা এ্যাটাচড, তাদের তালিকা তৈরী করা, তাদের মধ্যে যারা হলে উঠতে চায় অথচ উঠতে পারে নাই তাদের উঠানোর ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি, যাদের টিউশনি করা প্রয়োজন তাদের জন্য টিউশনি খুঁজে দেওয়া। আমাদের সমিতির অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন এসএম হলের সুজা ভাই, যাকে আমি এখনো বস বলে ডাকি। সমিতি গঠনের ফলে আমাদের কল্যানকর কাজ অনেক এগুলো, আমরা শৈলকুপার ছাত্রছাত্রীরা ঐক্যবদ্ধ হলাম, আমরা হৃদয়ের কাছাকাছি এলাম, হৃদয়ের প্রতিবেশী হলাম, শৈলকুপার ঢাবিয়ান হলাম। আমাদের সেইদিনের সেই ক্ষুদ্র প্রচেস্টার আলো শৈলকুপাতে ছড়িয়ে পড়েছিলো, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর শৈলকুপার শতশত ছাত্রছাত্রী পড়ে, আজ তারা ঐক্যবদ্ধ, একে অপরের পাশে দাঁড়ায় এমন কথা যখন শুনি, তখন বুকের মধ্যে এক চিলতে রোদেলা হাসি ঝিলিক দেয়, মনে হয় ফজলু ভাইয়ের একটি উদ্যোগ আমাদের শৈলকুপার ঢাবিয়ানদের আজ সঠিক পথেই নিয়ে যাচ্ছে!
রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি অন্চলভিত্তিক এইসব সামাজিক সংগঠনে আমার নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা সময় দেওয়াটা দল পছন্দ করছিলো না। রোকন ভাই একদিন ডেকে বললেন, আন্চলিক সামাজিক সংগঠনগুলোতে তোমার অংশগ্রহন কমানো উচিত। ব্যাস, আমি বুঝে গেলাম কি করতে হবে। তাই আস্তে আস্তে নেপথ্যে চলে এলাম, ঐ সব সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে থাকলো পরবর্তী প্রজন্মের এক ঝাঁক তরুন, যাঁদের মধ্যে মাহফুজ, আলম, জাফরদের মত আত্মপ্রত্যয়ী দক্ষ সংগঠকদের দিয়ে এই সমস্ত সংগঠন তৈরী এবং মেরামত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পরবর্তী দিনগুলিতে শৈলকুপা ছাত্রকল্যান সমিতি গঠনের পটভূমি, প্রেক্ষিত, এবং সাফল্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা সমিতি, ঝিনাইদহ ছাত্রকল্যান সমিতি, বৃহত্তর যশোর ছাত্রকল্যান সমিতির মত সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম। নিস্প্রভ বৃহত্তর যশোর সমিতিকেও সিন্ডিকেট মুক্ত করেছিলাম।
দিন যত গড়াচ্ছিলো রাজনৈতিক মাঠ ততটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিলো। এরই মধ্যে ১০ অক্টোবর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সচিবালয় ঘেরাও করার দিন ধার্য হলো। ঐ কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে সব ছাত্র সংগঠনে সাঁজ সাঁজ রব। আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত একজন ক্ষুদে কর্মী, তারপরও থ্রিল অনুভব করতে লাগলাম। প্রতিদিন মিছিল মিটিং, হলে হলে কর্মীসভা, পাড়ায় মহল্লায় কর্মীসভা, সারা দেশ থেকে সকল ছাত্রসংগঠনের নেতা কর্মীরা আসবে, সে এক মহা উৎসবের মত। ছোট্ট রাজনৈতিক জীবনে এতটা উত্তাপ-উৎসাহ-উন্মাদনা দেখিনি আগে। মনে হতে লাগলো এরশাদের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরকম উত্তাল দিনগুলিতে ভুলেই গিয়েছিলাম ক্লাস করার কথা কিংবা অন্য কোন মানুষ কিংবা মানবীর কথা। ক্লাসে না গেলেও যোগাযোগ থাকতো ফয়সাল এবং শাকিলের সাথে, ক্লাসের ফিমেল ক্লাসমেট এর সাথে তেমন কোন সখ্যতা গড়ে উঠেনি কখনো। আর তখন আমার সাথে কেউ কথা বলবে এমন প্রত্যাশা করাটাও ছিলো বোকামি, কারন, আমি তো ক্লাসের থেকে মধুর ক্যান্টিনেই সময় কাটাতাম বেশী, এমন কোন ক্লাসমেট এর সাথে কেউ কথা বলবে সেই প্রত্যাশাও ছিলো না। তবে, ক্লাসমেটদের মধ্যে ছাত্রদল করা বন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান মামুন, সৈয়দ আজাদ সুবহানী, সুমন, মুকুল এবং ছাত্রলীগ করা বন্ধু সৈয়দ তানভীর, জহিরদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠতে লাগলো, কারন, ওরাও মধুর ক্যান্টিনে স্ব স্ব সংগঠনের মিছিলে আসতো, দেখতাম, দিনে দিনে বন্ধুত্বটা ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। পাশাপাশি ক্লাসমেটদের মধ্যে শফিক, হুমায়ুন, আঃ রহমান প্রমুখেরা জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার কারনে তাঁদের সাথে সখ্যতা বাড়তে থাকে। এছাড়াও ছাত্রমৈত্রী করতো শুভ এবং সুমাইয়া ওরাও হয়ে উঠে মিছিলের সাথী, বন্ধু, সহযোদ্ধা। এভাবে একে একে সব ক্লাসমেট হয়ে উঠে আমার প্রিয় বন্ধু, আমাদের একে অন্যের হৃদয়ের প্রতিবেশী।