01/05/2026
"আমি অনুভব করি যে, নায়কের ছাঁচে থাকা মানুষের তুলনায় রাস্তায় থাকা একটি সাধারণ মানুষকে বিষয় হিসেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাঁদের আংশিক অন্ধকার, অস্পষ্ট শব্দগুলোই আমি ধরতে চাই, আবিষ্কার করতে চাই।"
- সত্যজিৎ রায়
সিনেমায় আসার আগে সিগনেট প্রেসে বইয়ের কভার ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।সেখানে দুইটি অসামান্য বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করেন । একটি জিম করবেটের 'ম্যানইটারস অফ কুমায়ুন',আর অন্যটি জওহরলাল নেহেরুর 'ডিসকভার অফ ইন্ডিয়া'।ক্যালিগ্রাফিতে তাঁর দক্ষতার কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু তাঁর তৈরি রোমান ফন্টের কথা? চারটি রোমান ফন্ট ডিজাইনের পিছনেও রয়েছে এই মানুষটির কৃতিত্ব। ভারতীয় মোটিফ ও ক্যালিগ্রাফি দিয়ে তৈরি সেই ফন্টগুলির নাম রে রোমান, রে বিজার, ড্যাফনিস ও হলিডে স্ক্রিপ্ট। পথের পাঁচালিই প্রথম সিনেমা যা রিলিজের আগে একটি টিজারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপিত হয়। সেই প্রথম ভারতে কোনও সিনেমা বেরনোর আগে তার টিজার বেরোল। আর এই সকল কাজের মহিরুহ যে মানুষটি তিনি সত্যজিৎ রায়। যদি এমন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা বলা হয় যিনি পশ্চিমের চলচ্চিত্র পরিচালকদের প্রভাবিত করেছেন এবং এখনো করছেন, তবে তিনি অবিসংবাদিতভাবে সত্যজিৎ রায়। তিনি এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যিনি বাংলা চলচ্চিত্র তো বটেই এমনকি পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে বিবিসির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তালিকায় তিনি ১৩তম স্থান লাভ করেছিলেন। কিংবদন্তি এ মানুষটি হচ্ছেন সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের আজকের এ দিনে কলকাতা শহরে সাহিত্য ও শিল্প সমাজে খ্যাতনামা রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সুকুমার রায় এবং পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী যাদের দুইজনই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানার মসূয়া গ্রামে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের ছিল বহুমুখী সৃজনশীলতা। তার কাজের পরিমাণ বিপুল। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’—এই তিনটি চলচ্চিত্রকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। চলচ্চিত্র মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সংগীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্পনির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক।
বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছিল। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার সত্যজিৎ রায়কে সে দেশের বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস (অস্কার) তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ভারত সরকার তাকে ভারতরত্ন প্রদান করে। মৃত্যুর পর তাকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার প্রদান করা হয়।
কল্পবিজ্ঞানে তার রচিত “ফেলুদা” কিংবা ‘’প্রোফেসর শঙ্কু’ এর মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলো আজও বাংলার তরুণ সমাজের হৃদয়ে চির ভাস্বর। আজকে সত্যজিৎ রায়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী। জন্মবার্ষিকীর এ দিনে তার প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।