14/05/2026
# # পদের নাম: স্ট্র্যাটেজিক ইনোভেশন হেড
সালেহ সাহেবের ইদানীং খুব ‘হেড’ আর ‘স্ট্র্যাটেজি’ শব্দ দুটোর শখ হয়েছে। অফিসের পুরনো পিয়ন রহিম মিঞা যখন এক কাপ চা দিয়ে যায়, সালেহ সাহেব তখন তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করেন যেন ওটা কম্পিউটারের স্ক্রিন নয়, বরং দেশের ভাগ্যরেখা।
নতুন পদের বিজ্ঞাপন দিলেন— "স্ট্র্যাটেজিক ইনোভেশন হেড"।
আমি বললাম, "স্যার, সহজ বাংলায় যাকে ‘মাথা খাটানো লোক’ বলে, তাকে কেন এত প্যাঁচানো নাম দিলেন?"
সালেহ সাহেব তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, "আরে ভাই, এখন কি আর মাথা খাটানোর দিন আছে? এখন হলো ‘ইনোভেশন’। দিনকাল বদলাচ্ছে না?"
আমি মনে মনে বললাম, দিনকাল বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের অফিসের বাথরুমের কলটা যে গত তিন মাস ধরে চুইয়ে পানি পড়ছে, সেটা তো আর ‘ইনোভেশন’ দিয়ে ঠিক হবে না।
# # ইন্টারভিউর সেই দিন
প্রথম ক্যান্ডিডেট আরিয়ান। নীল শার্ট, চোখে এমন এক ফ্রেমের চশমা যেটার দাম দিয়ে আমাদের অফিসের তিনজনের বেতন হয়ে যাবে। বসার আগেই সে পকেট থেকে একটা সুগন্ধি রুমাল বের করে টেবিলটা মুছল।
সালেহ সাহেব মুগ্ধ হয়ে বললেন, "দেখছেন? একেই বলে হাইজিন কনশাস।"
আমি বললাম, "স্যার, এটা হাইজিন না, এটা হচ্ছে ভাব।"
আরিয়ান কথা বলা শুরু করতেই মনে হলো আমরা কোনো বাংলা অফিসে নেই, লস অ্যাঞ্জেলেসের কোনো স্টুডিওতে বসে আছি।
"স্যার, আপনাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন ‘ফ্ল্যাট’ হয়ে আছে। উই নিড টু ডিসরাপ্ট দ্য মার্কেট। আমাদের গোল হবে হাইপার-গ্রোথ।"
সালেহ সাহেব যেন স্বর্গসুখ পেলেন। তিনি মাথা দোলাচ্ছেন আর আমি ভাবছি, হাইপার-গ্রোথ দিয়ে কি আর আমাদের গুদামের ওই ইঁদুরগুলোকে তাড়ানো যাবে?
# # অভিজ্ঞ বনাম স্মার্টনেস
পরের জন শফিক সাহেব। বয়স হয়েছে, মাথার চুলগুলো রুপালি। অভিজ্ঞতার ফাইলে হাত দিলে বোঝা যায় কতগুলো রোদ-বৃষ্টি পার করে এসেছেন এই মানুষটি।
সালেহ সাহেব প্রশ্ন করলেন, "শফিক সাহেব, আপনি আমাদের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন নিয়ে কী ভাবছেন? মানে ধরুন ‘ক্লাউড সলিউশন’?"
শফিক সাহেব একটু হাসলেন। খুব মায়া মাখানো হাসি। বললেন, "বাবা, ক্লাউড মানে তো মেঘ। আমি শুধু জানি আমাদের যে কাঁচামালগুলো বন্দরে আটকে আছে, সেগুলো ছাড়াতে না পারলে সামনের মাসে কারখানায় তালা পড়বে। আমি ওটা নিয়ে ভাবতে চাই।"
সালেহ সাহেব বিরস মুখে আমার দিকে তাকালেন। বিড়বিড় করে বললেন, "একেবারে সেকেলে। ভিশন নেই।"
# # চার মাস পরের দৃশ্য
আরিয়ান এখন আমাদের স্ট্র্যাটেজিক ইনোভেশন হেড। তার আলাদা কেবিন। সেখানে কাঁচের ওপর মার্কার দিয়ে সে সারাদিন অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি করে। কোনটা তীর চিহ্ন, কোনটা ত্রিভুজ—কেউ বোঝে না।
সবাই মিটিংয়ে গেলে আরিয়ান ‘মাইন্ড ম্যাপ’ দেখায়। সে বুঝাতে চায় যে আমরা সবাই একটা ইকোসিস্টেমের অংশ।
রহিম মিঞা পাশে এসে ফিসফিস করে বলল, "ভাইজান, ইকোসিস্টেম মানে কী? স্যার কি আমাদের পুকুরের মাছের সাথে তুলনা করতাছে?"
আমি হেসে বললাম, "না রে রহিম ভাই, স্যার বুঝাইতে চায় আমরা সবাই একই বিপদে আছি।"
আরিয়ান মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন পায়, কিন্তু অফিসের প্রোডাকশন গত তিন মাসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে গেছে। কারণ সে সারাদিন ইনোভেশন নিয়ে ভাবে, কিন্তু কাজ করার জন্য যে মানুষগুলো দরকার, তাদের সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই।
# # শেষ দৃশ্য
সেদিন বিকেলে সালেহ সাহেব খুব বিষণ্ণ মনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আরিয়ান আজ সকালেই ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে। তার নাকি আরও বড় ‘চ্যালেঞ্জ’ দরকার।
সালেহ সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, "বুঝলেন শরিফ সাহেব, ওই আরিয়ান ছেলেটা কিন্তু খুব স্মার্ট ছিল। যাওয়ার সময় বলে গেল আমাদের ‘লিডারশিপে গ্যাপ’ আছে।"
আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম, "স্যার, লিডারশিপে গ্যাপ নেই, গ্যাপ আছে আমাদের চোখে। আমরা চকচকে মোড়ক দেখে ভেতরের পচা মাল কিনে ফেলি। ওই যে শফিক সাহেব ছিল, সে আমাদের সমস্যাটা জানত। কিন্তু আপনি চাইলেন এমন একজনকে যে শুধু সমস্যা নিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারে।"
সালেহ সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু নিচের রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অফিসের সিঁড়িতে রহিম মিঞা তখন গুগুন করে গান গাইছে। তার কোনো ইনোভেশন নেই, স্ট্র্যাটেজি নেই। শুধু আছে দিনশেষে শান্তিতে ঘরে ফেরার তাগিদ।
মাঝে মাঝে মনে হয়, এই কর্পোরেট সার্কাসের চেয়ে রহিম মিঞার জীবনটাই অনেক বেশি মানুষের মতো। যেখানে ‘পারফরম্যান্স রিভিউ’ এর চেয়ে এক কাপ গরম চায়ের দাম অনেক বেশি।