26/05/2026
অর্থঋণ ও জারি মামলায় তৃতীয় পক্ষের রিট: হাইকোর্টের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
মোঃ ফজলুর রহমান বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য
অর্থঋণ আদালতের মামলা ও জারি কার্যক্রমে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, কেবল ঋণগ্রহীতা, গ্যারান্টর বা মামলার প্রত্যক্ষ পক্ষগণই আদালতের প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো নিরীহ তৃতীয় পক্ষের বৈধ মালিকানা বা স্বত্ব যদি অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ে, তবে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সরাসরি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারবেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোঃ ফজলুর রহমান বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য মামলায়, যেখানে হাইকোর্ট বিভাগ Rule Absolute করে তৃতীয় পক্ষের স্বত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছেন। ব্যাংকিং আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এবং সাংবিধানিক প্রতিকার বিষয়ে কাজ করা আইনজীবী ও আইন শিক্ষার্থীদের জন্য রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মামলার সংক্ষিপ্ত ঘটনা (Facts of the Case)
২ নং রেসপন্ডেন্ট ব্যাংক মূল ঋণগ্রহীতা ৩ নং রেসপন্ডেন্টের বিরুদ্ধে ৩৮৩/১৯৯২ নং অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয় এবং ব্যাংক ১১,০৭,১১৭/- টাকা আদায়ের জন্য ৩৮/১৯৯৬ নং অর্থ জারি মামলা দায়ের করে।
দেনাদার বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৭) ধারার অধীনে মালিকানা সনদ (Ownership Certificate) গ্রহণ করে। পরবর্তীতে উক্ত সনদের ভিত্তিতে ব্যাংক “দৈনিক করতোয়া” পত্রিকায় বন্ধকী সম্পত্তি নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
কিন্তু রিট পিটিশনার মোঃ ফজলুর রহমান দাবি করেন যে, নিলামকৃত ৩৩.৭৫ ডেসিমেল সম্পত্তির প্রকৃত মালিক তিনি। তাঁর পিতা ও চাচার সম্পত্তি বাটোয়ারা মামলার ডিক্রির মাধ্যমে তিনি পৃথক অংশ হিসেবে লাভ করেন এবং পরবর্তীতে সর্বশেষ আর.এস খতিয়ান তাঁর নামে প্রস্তুত হয়। তিনি নিয়মিত খাজনা প্রদান ও দখলে ছিলেন।
আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, মূল ঋণগ্রহীতা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখেছেন।
আবেদনকারী কীভাবে সংক্ষুব্ধ (How Aggrieved)
রিট পিটিশনার আদালতে দেখান যে:
তিনি কখনো ঋণগ্রহীতা ছিলেন না;
অর্থঋণ মামলা বা জারি মামলার কোনো পক্ষও ছিলেন না;
তবুও তাঁর বৈধ সম্পত্তি নিলামে তোলা হয়েছে;
সর্বশেষ আর.এস রেকর্ড তাঁর নামে;
তিনি বৈধ মালিক ও দখলদার;
ব্যাংকের কার্যক্রম তাঁর সাংবিধানিক সম্পত্তির অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে।
আবেদনকারী আরও উল্লেখ করেন যে, পূর্ববর্তী এক নিলামে তিনি অংশ নিয়েছিলেন এবং ব্যাংক তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিল যে সম্পত্তিটি তাঁর কাছেই হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংক পুনরায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে তিনি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
রুল জারি ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ একটি Rule Nisi জারি করেন এবং প্রশ্ন তোলেন:
ব্যাংকের প্রকাশিত নিলাম নোটিশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না।
একইসাথে আদালত:
নিলাম নোটিশের কার্যকারিতা ৪ মাসের জন্য স্থগিত করেন;
আবেদনকারীকে ব্যাংকের মোট বকেয়া টাকা ৪ মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেন;
এবং নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে Rule discharged হবে বলে উল্লেখ করেন।
আবেদনকারীর পক্ষে মূল আইনি যুক্তি
আবেদনকারীর আইনজীবী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বলেন:
১. ৩৩(৯) ধারার কারণে জারি মামলা ইতোমধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(৯) ধারা অনুযায়ী, ৩৩(৫) বা ৩৩(৭) ধারার অধীনে মালিকানা সনদ ইস্যু হওয়ার সাথে সাথেই জারি মামলা আইনগতভাবে disposed of হয়ে যায়।
অতএব, নিলামের সময় কোনো কার্যকর “জারি মামলা” অস্তিত্বে ছিল না।
২. তাই ৩২ ধারার প্রতিকার প্রযোজ্য নয়
আইনের ৩২ ধারায় “উদ্ভূত জারি মামলায়” আপত্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো জারি মামলাই বিচারাধীন ছিল না। ফলে আবেদনকারীর জন্য ১০% টাকা জমা দিয়ে Miscellaneous Case দায়েরের সুযোগও ছিল না।
৩. দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXI প্রযোজ্য নয়
যেহেতু নিলামটি আদালতের মাধ্যমে নয়, বরং ব্যাংক নিজেই পরিচালনা করছিল, তাই CPC-এর Order XXI Rule 58 বা Rule 90-এর আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
৪. রিটই ছিল একমাত্র কার্যকর প্রতিকার
যখন কোনো কার্যকর বিকল্প প্রতিকার বিদ্যমান নেই, তখন সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিটই একমাত্র remedy।
ব্যাংকের পক্ষে যুক্তি
ব্যাংকের আইনজীবী যুক্তি দেন:
আবেদনকারী মূল মামলার পক্ষ নন;
তাঁর locus standi নেই;
ব্যাংক তাঁর কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়;
আবেদনকারীর উচিত ছিল দেওয়ানি আদালতে যাওয়া;
মালিকানা ও জালিয়াতির প্রশ্ন সাক্ষ্যপ্রমাণসাপেক্ষ বিষয়, যা রিটে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।
হাইকোর্ট বিভাগের পর্যবেক্ষণ
মহামান্য হাইকোর্ট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
১. বিকল্প প্রতিকার কার্যকর ছিল না
আদালত বলেন, যেহেতু নিলামের সময় কোনো জারি মামলা বিচারাধীন ছিল না, তাই:
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩২ ধারা,
অথবা CPC Order XXI-এর বিধানসমূহ
কোনোটিই এখানে প্রযোজ্য নয়।
ফলে রিট পিটিশনই ছিল একমাত্র কার্যকর remedy।
২. আবেদনকারীর মালিকানার prima facie প্রমাণ রয়েছে
আদালত লক্ষ্য করেন:
আবেদনকারী আর.এস খতিয়ান দাখিল করেছেন;
বাটোয়ারা মামলার ডিক্রি দাখিল করেছেন;
ব্যাংক কোনো Counter-affidavit দিয়ে তা খণ্ডন করতে পারেনি।
ফলে আদালতের দৃষ্টিতে আবেদনকারীর prima facie title প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৩. ব্যাংকের আচরণ “অযৌক্তিক”
আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন:
আবেদনকারী আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যাংকের মোট পাওনা পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং পে-অর্ডারও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক তা গ্রহণ করেনি।
আদালতের ভাষায়, যখন প্রকৃত মালিক ব্যাংকের জনঅর্থ (public money) পরিশোধ করতে আগ্রহী, তখন ব্যাংকের তা প্রত্যাখ্যান করা ছিল “very unreasonable”.
চূড়ান্ত রায় (Judgment)
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগ রুল Absolute করেন এবং নির্দেশ দেন:
ব্যাংক আবেদনকারীর দাখিলকৃত পে-অর্ডারের টাকা ১ মাসের মধ্যে গ্রহণ করবে;
ব্যাংকের অতিরিক্ত কোনো দাবি থাকলে তা আবেদনকারীর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবে।
আদালত আরও বলেন:
“Accordingly, the Rule is made absolute.”
রায়ের আইনগত গুরুত্ব
এই রায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে:
১. Third Party-র Locus Standi স্বীকৃত
অর্থঋণ ও জারি মামলার পক্ষ না হয়েও, যদি কারও বৈধ স্বত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তিনি রিট করতে পারবেন।
২. ৩৩(৭) ধারার Ownership Certificate ইস্যুর পর Ex*****on Case শেষ হয়ে যায়
এটি অর্থঋণ আদালত আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।
৩. ৩২ ধারার প্রতিকার সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
যদি কোনো জারি মামলা বিচারাধীন না থাকে, তাহলে ৩২ ধারা invoke করা যাবে না।
৪. ব্যাংকের ক্ষমতা সীমাহীন নয়
Ownership Certificate পেলেই ব্যাংক যে কোনো সম্পত্তি নির্বিচারে বিক্রি করতে পারে না। প্রকৃত মালিকের স্বত্ব আদালত রক্ষা করবেন।
উপসংহার
বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমে প্রায়ই দেখা যায়, প্রকৃত মালিক বা তৃতীয় পক্ষ জটিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিকারহীন অবস্থায় পড়েন। এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, আইনের প্রক্রিয়া কোনো নিরীহ ব্যক্তির সাংবিধানিক ও বৈধ সম্পত্তির অধিকার বিনষ্ট করতে পারে না।
ব্যাংকিং আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও সাংবিধানিক প্রতিকার বিষয়ে কাজ করা আইনজীবীদের জন্য এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে।