৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা হয়। এটি ছিলো যুদ্ধাপরাধের মামলার দ্বিতীয় রায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এতে ফুঁসে ওঠে তরুণ সমাজ। যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তারা জড়ো হয় রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক শাহবাগে। দাবি ওঠে য
ুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ঘোষণার। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেয় দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত শাহবাগ না ছাড়ার।
মাত্র কয়েকজন তরুণের ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা সবার প্রাণের দাবি হয়ে ওঠে। একদিনের মধ্যেই শাহবাগের হাতেগোণা তরুণদের জমায়েত পরিণত হয় হাজারো লোকের সমাবেশে। ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালে শাহবাগে আয়োজিত প্রথম মহাসমাবেশে জমায়েতের পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় কয়েক লক্ষ। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, দেশাত্ববোধক গান আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শাহবাগ। কয়েকদিনের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনে সমর্থন জানাতে থাকে।
তীব্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন তৎকালীন মহাজোট সরকার বাধ্য হয় এ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ তৈরী করতে। সূচীত হয় আন্দোলনের প্রথম বিজয়।
কিন্তু যুদ্ধাপরাধীরা এবং তাদের দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রদানকারীরা থেমে থাকেনি। ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩-তে আরেক যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলোওয়ার হোসেন সাঈদীর মামলায় ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দিলে আনন্দে ফেটে পড়ে দেশ ও বিশ্বজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে আসা কর্মীরা। কিন্তু এই রায় প্রত্যাখ্যান করে সারা দেশে ভয়ংকর নাশকতা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির-এর কর্মীরা।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, সীতাকুণ্ড, সাতক্ষীরা, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, খুলনা, এবং আরো অনেক জেলায় মূলতঃ হিন্দু সম্প্রদায় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীদের ওপর নির্বিচার হামলা চালায়। চাঁদে সাঈদীকে দেখা যাওয়ার মতো একটা উদ্ভট গুজব ছড়িয়ে সরকারি অফিস-আদালতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, পুড়িয়ে দেয়া হয় হিন্দুদের মন্দির, বাড়িঘর।
শাহবাগ আন্দোলনের শুরু থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ও জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে ওতপ্রোতভাবে কাজ করা কয়েকজন তরুণ-তরুণী একমত হয় এ নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করার। শাহবাগ আন্দোলনে আরো অনেক সামাজিক সংগঠন থাকলেও সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে কাজ করার কোন বিশেষায়িত সংগঠন না থাকায় তার প্রয়োজন অনুভব করে নতুন একটি সংগঠন গঠন করার। এরই প্রেক্ষিতে ৩রা মার্চ, ২০১৩ সালে ঘোষিত হয় ‘Amra-আমরা’ এর নাম।
এর পর থেকে এই সংগঠনের কর্মীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর পাওয়া মাত্র চষে বেড়িয়েছে সারা বাংলাদেশ। শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, নির্যাতিত মানুষের পাশে শারীরিকভাবে দাঁড়ানো, সত্যিকার ঘটনা তুলে আনা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইকে জোরদার করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ‘Amra-আমরা’। ‘বাংলার প্রতি প্রান্তে জাগ্রত, জনতার সাথে’ স্লোগান নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘Amra-আমরা’-এর তহবিলের প্রধান উৎস সচেতন জনগণের কষ্টোপার্জিত অর্থ।
পরবর্তীতে ‘Amra-আমরা’ সাম্প্রদায়িক হামলা ছাড়াও ২২শে মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্ণেডোতে ক্ষতিগ্রস্তদের এবং ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিহত-আহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের নিয়েও কাজ করে।
পরবর্তীতে ‘Amra-আমরা’-এর কার্যনির্বাহী পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়, প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুতি এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাকে যেকোন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে ‘Amra-আমরা’।