21/09/2026
১৯ বছরের মরিয়ম—একটি চাকরির সুপারিশ থেকে মৃত্যু, মাঝখানে আসলে কী ঘটেছিল?
একটা প্রশ্ন দিয়েই আজকের গল্পটা শুরু করি—
মাত্র ১৯ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে ৭৫ বছর বয়সী একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের সম্পর্ক তৈরি হলো কীভাবে?
আমি এখানে বয়সের পার্থক্য নিয়ে কাউকে বিচার করতে চাই না। কিন্তু এই ঘটনায় বয়সের পাশাপাশি অর্থ, সামাজিক অবস্থান এবং ক্ষমতার যে বিশাল পার্থক্য ছিল—সেটা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
আর সেই প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মরিয়মের একটি বায়োডাটা সামনে আসার পর।
ঢাকা পোস্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২২ জুন তারিখের একটি বায়োডাটায় গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরের ওপরে সবুজ কালিতে লেখা—“জোর সুপারিশ করছি”।
আর এখানেই একটা অদ্ভুত বিষয়।
গাজী নজরুল দাবি করেছিলেন, ১৭ জুন পারিবারিকভাবে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন। অথচ তার মাত্র পাঁচ দিন পরের ওই বায়োডাটায় মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা লেখা ছিল—“অবিবাহিত”। �
dhakapost.com +1
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—
এই বায়োডাটা কোথায় জমা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল?
কেন একজন সংসদ সদস্য সেখানে জোর সুপারিশ করেছিলেন?
তাঁদের পরিচয় কি এই চাকরির সূত্রেই?
নাকি পরিচয় আগে থেকেই ছিল?
এগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
আর তাই আমি এটাও বলব না যে চাকরির বিনিময়ে কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ এমন দাবি প্রমাণ করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় আছে—ক্ষমতার অসমতা।
একদিকে ১৯ বছরের একজন তরুণী, অন্যদিকে বহু বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য।
তাই প্রশ্ন করতেই হয়—
মরিয়ম এই সম্পর্কের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীনভাবে নিতে পেরেছিলেন?
তাঁকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কি?
কোনো চাপ ছিল কি?
নাকি সত্যিই এটি ছিল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্পূর্ণ সম্মতিতে তৈরি হওয়া একটি সম্পর্ক?
আমরা জানি না। আর না জেনে কোনো উত্তর তৈরি করাও ঠিক হবে না।
তারপর জুলাই মাসে দুজনের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
গাজী নজরুল তখন প্রকাশ্যে দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম। �
BSS +1
এরপর ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও বড় হয়ে ওঠে।
২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জানায়, সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে “নৈতিক স্খলন” প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। �
Jagonews24
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি।
মাত্র দুই মাস পর—
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটের কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হলো ১৯ বছরের মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ।
পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট ঘটনাস্থলে যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে। �
BSS +1
এখন প্রশ্নটা আর শুধু একটি সম্পর্কের নয়।
প্রশ্ন—মরিয়মের শেষ কয়েক ঘণ্টায় আসলে কী ঘটেছিল?
তিনি নিজেই জীবন শেষ করেছেন কি না, যদি করে থাকেন কেন—নাকি মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে—এসবের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও ময়নাতদন্ত থেকেই আসতে হবে।
ঘটনার পর মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। �
The Daily Star +1
কিন্তু এখানেও একটা কথা পরিষ্কার—
মামলা হয়েছে মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে গেছে—এমন নয়।
কে দায়ী, আদৌ কেউ প্ররোচনা দিয়েছিল কি না—সেটা তদন্ত এবং আদালতের বিষয়।
কিন্তু আমার প্রশ্নটা আরও একটু পেছনে।
আমি জানতে চাই—
১৯ বছরের একটা মেয়ের জীবন এই জায়গায় এসে পৌঁছাল কীভাবে?
যে মেয়েটির বায়োডাটায় একদিন লেখা ছিল—“জোর সুপারিশ করছি”, কয়েক মাস পর সেই মেয়েটির মরদেহ কেন একটি সংসদ সদস্যের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হলো?
এই দুই ঘটনার মাঝখানের গল্পটাই আমাদের জানতে হবে।
সম্পর্কটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
বিয়ের পর কী ঘটছিল?
মরিয়ম মানসিকভাবে কেমন ছিলেন?
তিনি কি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন?
নাকি এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা আমরা এখনো জানিই না?
এসব প্রশ্নের উত্তর ফেসবুকের গুজব কিংবা রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের বক্তব্য দিয়ে পাওয়া যাবে না।
এর উত্তর দিতে হবে প্রমাণকে।
এর উত্তর দিতে হবে ফরেনসিক তদন্তকে।
এর উত্তর দিতে হবে আদালতকে।
আর এই ঘটনাটি আমাদের আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—
সম্পর্কে ক্ষমতা শুধু অর্থ দিয়ে তৈরি হয় না। বয়স, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক প্রভাব, চাকরি দেওয়ার বা সুপারিশ করার ক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েও একজন মানুষ অন্যজনের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারেন।
কিন্তু সেই ক্ষমতার অপব্যবহার এই সম্পর্কে হয়েছিল কি না, সেটাও প্রমাণ ছাড়া আমরা বলতে পারি না।
তাই মরিয়মের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তাঁর মৃত্যু কীভাবে হয়েছে সেটি জানা নয়।
জানতে হবে তাঁর গল্পের শুরুটাও।
একটি চাকরির বায়োডাটা,
একটি “জোর সুপারিশ”,
একটি বিতর্কিত সম্পর্ক,
একটি বিয়ের দাবি—
আর শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৯ বছর বয়সে একটি মৃত্যু।
এই ঘটনাগুলোর মাঝখানে যে অজানা অধ্যায়গুলো রয়েছে, সেগুলো সামনে আসুক।
কারণ মরিয়ম আর নিজের গল্পটা বলতে পারবেন না।
এখন সত্যটা বলার দায়িত্ব প্রমাণের।
Justice for Mariam.
সত্য প্রকাশ হোক।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।
— POWER OF WONDER WOMEN