07/10/2026
তাকওয়ার অসাধারণ এক ব্যাখ্যা!
-----------------------------
তাকওয়া মানে কী?
—নোমান আলী খান
তাকওয়া মানে নিজেকে রক্ষা করা। কিন্তু কিসের থেকে রক্ষা? এই প্রশ্নের উত্তর আলেমরা নানাভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। আল্লাহকে অখুশি করা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করা। হাশরের মাঠে অপমানিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা। নিজের অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা। আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
অর্থাৎ, মূল কথা একটাই—রক্ষা, রক্ষা এবং রক্ষা।
এ কারণেই অনেকে তাকওয়ার অর্থ করেছেন ‘ভয়’। মানুষ বলে, ‘ইত্তাকুল্লাহ’—ভাই, আল্লাহকে ভয় করুন! আমি তখন বলি, আরবিটা তো ‘খাফুল্লাহ’ নয়। ‘খাফুল্লাহ’ মানে আল্লাহকে ভয় করো। কিন্তু বাক্যটা হলো ‘ইত্তাকুল্লাহ’। আর ‘ইত্তাকু’ মানে নিজেকে রক্ষা করো।
কেউ যখন দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়, তখন সে নিজেকে রক্ষা করছে। কেন করছে? কারণ, সে ভয় পাচ্ছে। তাহলে কাজটা আসলে ভয় নয়, কাজটা হলো প্রতিরক্ষা। কিন্তু সেই প্রতিরক্ষার পেছনে কী আছে? ভয়। এ জন্যই তাকওয়ার অর্থ করা হয় ভয়। ভয় না থাকলে কেউ নিজের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করে না। তবু ‘ভয়’ এর আসল অনুবাদ নয়; আসল অনুবাদ হলো নিজেকে রক্ষা করা।
সুতরাং তাকওয়া অবলম্বন করা মানে ভয় পাওয়া নয়; ভয় থেকে আপনি যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করেন, সেটারই নাম তাকওয়া।
তাকওয়ার সম্পর্ক নিজেকে রক্ষা করার সঙ্গে। কারণ, আপনি কাকে রক্ষা করছেন? নিজেকে। অন্যকে রক্ষা করার ধারণা বোঝাতে তাকওয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয় না; তার জন্য আলাদা শব্দ আছে।
অনেক সময় মানুষ অন্যদের নিয়ে অতিরিক্ত ভাবে। তারা প্রশ্ন তোলে—আল্লাহ কেন ওই মানুষটার এমন পরিণতি দিলেন? অমুককে কেন মারা যেতে হলো? অমুক লোকটা কেন এত কষ্ট পাচ্ছে? আল্লাহ কেন আমাদের এভাবে পরীক্ষা করছেন?
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে নিজের দিকে তাকান। আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করছেন। আমারও উচিত নিজের দিকে তাকানো, কারণ আল্লাহ আমাকেও পরীক্ষা করছেন। আমাকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। নিজের ঈমান ঠিক রাখতে হবে। যেসব বিষয় আমার ঈমান ধ্বংস করে দেয়, সেগুলো থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে।
কারও তাকওয়া আছে মানে—সে যেন ঘরে ঢুকে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। ধরুন, বাইরে প্রচুর বালু, আর তখনই ঝড় উঠল। অথচ ঘরের দরজা-জানালা সব খোলা। আপনি দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন, একটার পর একটা জানালা বন্ধ করলেন। কারণ, আপনি চান না ধুলাবালু ঘরে ঢুকুক। সব বন্ধ করার পরও দেখলেন, একটা জানালার ফাঁক দিয়ে কিছু বালু ঢুকছে। আপনি তখন তাড়াতাড়ি সেই ফাঁকটাও বন্ধ করে দিলেন।
তাকওয়া মানে—আমার ঈমান ঘরের ভেতরের বাতাসের মতো নিরাপদ। কিন্তু যদি সেই বাতাসে ধুলাবালুর অস্তিত্ব টের পাই, তাহলে প্রশ্ন—লিকটা কোথায়? আমাকে সেই লিক বন্ধ করতে হবে। সব দরজা, সব জানালা বন্ধ করতে হবে, প্রতিটি ছিদ্রে টেপ লাগাতে হবে। ছিদ্রগুলো খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, নিজেকে রক্ষা করার তাড়না থাকলে আপনি ঠিক এটাই করবেন।
আপনি ভাববেন, আমি তো ভালোই ছিলাম, গুনাহটা হয়ে গেল কীভাবে? কোন পথ দিয়ে গুনাহটা আমার ভেতরে ঢুকল? ও, ওই পথে! ঠিক আছে, আমি আর ওই গর্তে পা দেব না। ওই পথে আর পা বাড়াব না।
এরই নাম তাকওয়া।
প্রশ্ন হতে পারে, তাকওয়া ছাড়াও কি কেউ আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করতে পারে? যেমন কেউ নামাজে দাঁড়াল, কোরআন তিলাওয়াত শুনে তার অন্তর নরম হলো, সে কাঁদলও। নামাজ শেষে অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হলো, আল্লাহর কাছে ক্ষমাও চাইল।
কিন্তু যে দরজা দিয়ে সে পাপে জড়িয়েছিল, সেই দরজাটা সে কখনো বন্ধ করেনি। খোলাই রেখে দিয়েছে, কিংবা বন্ধ করলেও ভালোভাবে করেনি। ফলে বালু এখনো ঢুকছে। আপনি তো সমস্যার সমাধান করেননি। তাই আবারও সেই একই পাপে জড়িয়ে পড়বেন। কারণ, আপনি নিজের ঈমানকে রক্ষা করেননি।
ঠিক এই কথাটাই আল্লাহ সুরা আলে ইমরানের ১৭৯ নম্বর আয়াতের শেষে বলেছেন—
وَاِنۡ تُؤۡمِنُوۡا وَتَتَّقُوۡا فَلَـكُمۡ اَجۡرٌ عَظِيۡمٌ
‘যদি তোমরা ঈমান আনো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।’
লক্ষ করুন, প্রথমে বলা হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রবেশ করো—অর্থাৎ ঈমান আনো। এরপর তাকওয়া অবলম্বন করো, মানে নিজেকে রক্ষা করো। তখনই তোমাদের জন্য থাকবে মহাপুরস্কার।
আর মহাপুরস্কার বলতে আমি শুধু পরকালের পুরস্কার বুঝি না। আমি বিশ্বাস করি, এই দুনিয়াতেও তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
-- 92. Ali ' Imran Aayah 179
-- বায়্যিনাহ