20/07/2026
অসুস্থতার চিকিৎসা নয়, সুস্থতায় বিনিয়োগ চাই
— মো. আরিফ শাহারিয়া আকন্দ
বাংলাদেশে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চিকিৎসা অবকাঠামো বাড়ছে। হাসপাতাল বাড়ছে, চোখধাঁধানো ডায়াগনস্টিক সেন্টার হচ্ছে, ওয়ান-স্টপ ফার্মেসি কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও দৃশ্যমান। কিন্তু প্রতিদিন সকাল হলেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে কিংবা চিকিৎসকের চেম্বারে যে উপচে পড়া ভিড় আমরা দেখি, তা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে মানুষের অসুস্থতা কমার কথা, তাহলে মানুষ দিন দিন এত অসুস্থ হচ্ছে কেন?
আসলে আমরা স্বাস্থ্যকে এখনও কেবল ‘রোগের চিকিৎসা’ হিসেবে দেখি। অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে যাওয়া, ওষুধ কেনা কিংবা অস্ত্রোপচার করাকে আমরা ভাবি স্বাস্থ্যসেবা।
অথচ স্বাস্থ্য আসলে শুরু হয় হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিছানায় নয়; স্বাস্থ্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে আমাদের ঘরের খাবারের টেবিল, ফুসফুসে নেওয়া বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের অভ্যাস থেকে।
অলক্ষ্যে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের মহামারি:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি এখন ঘটছে অসংক্রামক রোগ (NCD) যেমন—হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের কারণে। ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ২৮.৮ শতাংশই এখন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে একজন বাংলাদেশির অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ১৯.২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে একজন অকালেই ঝরে যাচ্ছেন এসব প্রতিরোধযোগ্য রোগে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণাও নিশ্চিত করেছে, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এ দেশের মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের গড় আয়ু (Healthy Life Expectancy) আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাকের ব্যবহার এবং অতিরিক্ত ওজন—এই চারটি মূলত পরিবর্তনযোগ্য অভ্যাসই অধিকাংশ অসংক্রামক রোগের মূল কারণ। অর্থাৎ, আমরা যদি একটু সচেতন হতাম, তবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে ভিড় করতে হতো না।
ইট-কাঠের উন্নয়ন বনাম জনস্বাস্থ্য:
আমাদের জাতীয় উন্নয়নের আলোচনায় সবসময় রাস্তাঘাট, সেতু কিংবা বহুতল ভবনের কথা আসে। কিন্তু স্বাস্থ্যকর নগর পরিকল্পনা, পরিকল্পিত সবুজায়ন, নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ কিংবা শিশুদের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠের কথা খুব কমই উচ্চারিত হয়। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে প্রতিদিন লাখো মানুষ বায়ুদূষণ, তীব্র যানজট, দাবদাহ আর মানসিক চাপের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। শিশুদের খেলার মাঠ কমছে, বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো পার্ক হারিয়ে যাচ্ছে।
অথচ একটি গাছ, একটি ছায়াময় ফুটপাত কিংবা একটি নিরাপদ পার্ক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যেকোনো দামি ওষুধের মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগ এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এগুলো আমাদের স্থায়ী স্বাস্থ্যসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে এখন আর আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের সময় এখনই
আমরা হাসপাতাল নির্মাণে যতটা বিনিয়োগ করছি, তার একটি অংশ যদি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি শিক্ষা, হাঁটার উপযোগী শহর, সবুজায়ন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতায় ব্যয় করতাম, তাহলে হয়তো আগামী এক দশকে অসংক্রামক রোগের এই বিশাল বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।
আমাদের এখন একটি নতুন ‘স্বাস্থ্যদর্শন’ প্রয়োজন—যেখানে চিকিৎসালয় হবে আমাদের শেষ ভরসা, প্রথম নয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ ও মানসিক সুস্থতার চর্চাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই রূপান্তরে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের যুবসমাজ। আজকের তরুণরা যদি স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সচেতনতায় নেতৃত্ব দেয়, ধূমপান ও মাদককে বিদায় জানিয়ে শারীরিক পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ হয়, তবে তারা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যেতে পারবে।
শেষ কথা,
সবুজ ছাদ, একটি সচেতন পরিবার, কিংবা পাড়ার একটি ছোট সামাজিক উদ্যোগ থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি অসুস্থতার পেছনে প্রতি বছর বিপুল অর্থ অপচয় করব, নাকি সুস্থ থাকার জন্য সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করব?
একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বড় বড় বহুতল ভবন কিংবা বিলাসবহুল হাসপাতাল নয়, তার সুস্থ মানুষ। কেবল সুস্থ মানুষই পারে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, একটি টেকসই সমাজ এবং একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। সুস্থ মানুষের বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের চিন্তার ও অভ্যাসের পরিবর্তনই হবে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সকলের মুখে একটি স্লোগান,
"অসুস্থতার চিকিৎসা নয়, সুস্থতার বিনিয়োগ চাই"।