28/08/2026
DUSAP Cultural Fest 2026 💘
বই পর্যালোচনা
সানজিদা আক্তার (সমাজবিজ্ঞান)
১. বইয়ের নাম : স্বপ্নডানা (আকাশ ছোঁয়ার গল্প)
লেখকের পরিচিতি: নাম: বাদল সৈয়দ
• জন্ম ১৯৬৮। সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ লেখেন বাদল সৈয়দ নামে।
• পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে। পেশা: চাকরি।
• প্রকাশিত বই উপন্যাস: জন্মজয়, জলের উৎস, আমার মুক্তি ওই আকাশে।
• মৌলিক থ্রিলার: ছায়াসন্ধান, বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে। গল্পগ্রন্থ: অলৌকিক আঙুল, মাটির পিঞ্জিরার মাঝে, সাক্ষী ছিল পক্ষী সকল।
• মোটিভেশনাল বই: রোজ্জাবেল মা তোকে বলছি, আমার বিশ্বাসগুলো, সাধুসঙ্গ ১ ও সাধুসঙ্গ ২।
২. বইয়ের সংক্ষিপ্তসার:
The woods are lovely, dark and deep, But I have promises to keep, And miles to go before I sleep, And miles to go before I sleep.
অনুপ্রেরণা এক মহাশক্তির নাম। নিজের স্বপ্নকে কেনা যায় এটি দ্বারা। হাজারো কষ্টের মাঝেও এই অনুপ্রেরণা যেন আমাদের সামনে যাওয়ার পথ দেখায়। উপরের কবিতার চরণগুলি বাদল সৈয়দ স্যারের এই বইয়ের মধ্যে থাকা ছোট ছোট গল্পগুলোর মধ্যে কোনো একটির শিরোনাম থেকে নেওয়া, যদিও এগুলো বাদল সৈয়দ স্যারের কবিতার চরণ নয়, তবে তিনি তার গল্পের মাধ্যমে এই কবিতার চরণগুলো চমৎকার ভাবে বুঝিয়েছিলেন, যা মন ছুঁয়ে গেল। স্বপ্ন যেন আরো একটু শক্ত হলো। বাধা তো থাকবেই, পথ তো অন্ধকার হবেই, সফল হওয়া কি এতই সহজ? কখনোই না, তাই আমাদের প্রয়োজন কিছুটা সাহস, যা 'স্বপ্নডানা'র মতো অনুপ্রেরণামূলক বইগুলো আমাদের দেয়। 'স্বপ্নডানা'র যদি সংক্ষিপ্তসার দিতে চাই তাহলে বইয়ের শেষে কভার পেজে থাকা বাক্যগুলো দিতে ইচ্ছে করে-
"প্রতিটি মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অমিত শক্তি। সেই শক্তি আবিষ্কার করতে পারলে পুরো দুনিয়াই পাল্টে দেওয়া সম্ভব। সবার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলাদিনের দৈত্যটিকে বের করে আনা খুব কঠিন নয়, শুধু চেষ্টার অপেক্ষা।
আকাশ ছোঁয়ার এমন কিছু গল্প নিয়ে বাদল সৈয়দের স্বপ্নডানা।"
৩. লেখকের শৈলী এবং বিষয়বস্তুর গভীরতা নিয়ে আলোচনা:
"ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের অধ্যাপক বব ফার্নান্দেজ অক হয়ে বাক্সটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বুঝতে পারছেন না ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে সুন্দর র্যাপিং করে খালি একটি চকোলেটের বাক্স কেন তাঁকে উপহার দিলো তাঁর ছাত্র সাইফুদ্দিন? কিন্তু জিজ্ঞেস করে তাকে বিব্রত করতে ইচ্ছে করছে না। সাইফুদ্দিনই নীরবতা ভাঙালো, স্যার, চকোলেটের খালি বাক্স দেখে আপনি নিশ্চয় অবাক হয়েছেন? হ্যাঁ, হয়েছি, হওয়ারই কথা, তাই না? স্যার, বাক্সটা কিন্তু খালি বাক্স দেখোনয়। মানে? এই বাক্স আমার ভালোবাসায় পূর্ণ। অধ্যাপক কিছুই বুঝতে পারছেন না। স্যার, ছয় বছর আগে বাবা হারিয়ে নিঃসম্বল অবস্থায় নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে আমি মালয়েশিয়া আসি। আমার রেজাল্ট ছিল খুব ভালো, কিন্তু টাকার অভবেদাসত্ব বরণ করতে হয়েছিল। কুলিগিরি করতাম কাঁদতে কাঁদতে। সময় পেলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াতাম। আহা! যদি এখানে পড়তে পারতাম! তারপর আপনার সঙ্গে পরিচয়, সবা শুনে আপনি আমাকে ভর্তি করালেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তিও দিলেন। আজ আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আপনার জন্য বাক্সভর্তি ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো উপহার আনা মানায়?"
নিজের কিছু কথা দিয়ে 'স্বপ্নডানা'র বিষয়বস্তুর গভীরতা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই গল্পগুলোর কাছে বআমি ব্যর্থ। কি চমৎকার গল্প, যেখানে প্রতিটা লাইনেই অনুপ্রেরণা, সেখানে গভীরতার কথা আলাদাভাবে বলা যেন গুরুত্ব হারায়। বাদল সৈয়দ স্যার তার স্বপ্নডানায় একরাশ উৎসাহ, উদ্দীপনা, সাহস এবং সবচেয়ে মূল অনুপ্রেরণা, এগুলো ছড়িয়েছেন। পাঠক যেন সামনে থাকা অন্ধকার পথ দেখে দমে না যায়, তিনি তার প্রতি নজর দিয়েছেন, এগুলো যেন বাদল সৈয়দ স্যারের শৈলী গুণ প্রকাশ করেছে।
৪. বইটি ভালো লাগার কারণ:
স্বপ্নডানা সম্পর্কে আমার কোনো উন্নতির পরামর্শ নেই বরং এই বই সম্পর্কে যে, আমি পর্যালোচনা করতে পারছি, সেটাই আমার জন্য সৌভাগ্য ও আনন্দের বিষয়। স্বপ্নডানা ভালো লাগার কারণ হলো তার মধ্যে থাকা ছোট ছোট পার্টগুলো, স্বপ্নডানার ছোট ছোট গল্পগুলো, যা আমার মন ছুঁয়েছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, স্বপ্ন সত্যি হবে এটা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো এর পেছনে থাকা চেষ্টাগুলো। স্বপ্নডানার সকল পার্ট বা গল্পগুলোর সবই আমার মনে ভালো লাগা জন্মালেও সব তো উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই কিছু তুলে ধরলাম:
বল কি তোমার ক্ষতি
জীবনের অথৈ নদী
পার হয় তোমাকে ধরে দুর্বল মানুষ যদি
সিলেটে আজ আমার শেষ কর্মদিবস, একটু পর আমি অফিস থেকে বিদায় নেব।
যাওয়ার আগে এ পাহাড়ি শহরের অসাধারণ মানুষগুলোর কাছে একটি জিজ্ঞাসা, কেউ কখনো কি বলেছে, আপনাদের প্রত্যেকের চেহারায় একধরনের জ্যোতি খেলা করে? পবিত্র জ্যোতি!
আমাকে এ পবিত্র আলোয় সিক্ত করার জন্য আমি সারাজীবন আপনাদের কাছে ঋণী হয়ে থাকব।
এরপর সিলেটে আমার যেসব তরুণ বন্ধু আছে, যেসব ছেলেমেয়েরা আমাকে বাবা ডাকে, তাদের কয়েকটি কথা বলব। সেইসব কথা, যার চর্চা যদি আমি ঠিকমতো করতে পারতাম, তবে অনেক পরিশীলিত মানুষ হতাম। যদিও এগুলো খুব সাধারণ কথা, কিন্তু তবু আবার বলছি, এগুলো বারবার বলা যায়। বাবা কিংবা ভাই সে অধিকার রাখেন।
১. কখনোই শুধু নিজেকে সুখী করার চেষ্টা করবে না, অন্যকে সুখী করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল সুখ। তোমার স্মরণে যদি অন্য কেউ আনন্দিত হয়, তার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছুতে নেই।
২. হিংসা করবে না। এটা তোমাকে কোনো কিছু দেবে না। হিংসা গুণনাশিনী।
৩. যখন অন্য কারো সঙ্গে খেতে বসবে, অবশ্যই তার পাতে আগে খাবার তুলে দেবে। তারপর নিজে নেবে। এটা অনেক বড় বিনয়। মনে রাখবে, পরম করুণাময় বিনয় পছন্দ করেন।
৪. কোনো কিছু ভাগ করার দায়িত্ব যদি তোমাকে দেওয়া হয়, সেরাটা কখনো নিজে নেবে না। অপেক্ষাকৃত খারাপটা নিজের জন্য রেখে বাকিগুলো অন্যদের দেবে, শেষ বিচারে তুমি ঠকবে না।
৫. নিজের জ্ঞান অন্যদের সাথে শেয়ার করবে। এটা না করা অন্যায়।
৬. টাকার পেছনে ছুটবে না। মনে রাখবে, যে মুহূর্তে তুমি টাকার পেছনে ছোটা শুরু করবে, সে মুহূর্তে টাকা মরীচিকা হয়ে যাবে। তুমি যত ছুটবে, টাকা তত দূরে সরে যাবে, সেই সঙ্গে সরে যাবে জীবনের সুখ।
৭. অহংকার সকল সর্বনাশ আর অভিশাপের মূল, এটা মনে রাখবে।
৮. আমাদের সব বন্ধু-আত্মীয়-স্বজন সমান নন, কিন্তু তুমি সবাইকে সমান বিচার করবে, তফাত করবে না।
৯. যে প্রতিশ্রুতি রাখা যায় না, সে প্রতিশ্রুতি দেবে না।
১০. ডাবল ফেইস খুব ঘৃণ্য ব্যাপার। মুখে এক, মনে আরেক—এর চেয়ে খারাপ আর কিছুই নেই, স্বয়ং আল্লাহতালা এদের অপছন্দ করেন।
১১. কখনো নিজের প্রশংসা করবে না। মনে রাখবে, 'আমি' শব্দটা দুনিয়ার সবচেয়ে বিষাক্ত শব্দ। তোমার কথা যাতে অন্যরা বলেন, সেভাবে কাজ করো।
"আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা।
আলো নয়ন-ধোয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা॥"
আমার সহজ সাধারণ বাবা যা বলতেন,
১. তুমি রিকশা চালক হও আমার আপত্তি নাই কিন্তু তোমাকে শহরের সেরা রিকশাচালক হতে হবে।
২. সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকলে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
৩. সবসময় সাধ্যমতো যাদের দরকার তাদের আর্থিক সাহায্য করবে, কিন্তু তা যেন নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নষ্ট না করে।
৪. হাতের কাছে সবসময় একটা বই রাখবে।
৫. একজন বাবার সবচেয়ে বড় গর্ব হলো যখন তিনি তাঁর সন্তানের পরিচয়ে পরিচিত হন। একইভাবে সন্তান যদি বাবার পরিচয়ে পরিচিত হয় তখন সে অসফল মানুষ।
৬. মানবিক গুণ ছাড়া প্রার্থনার কোনো মূল্য নেই।
৭. জীবনসঙ্গিনীকে শুধু ভালোবাসবেই না, শ্রদ্ধাও করবে।
৮. নিজের সমস্যার কথা পারতপক্ষে অন্য কাউকে বলবে না, এতে লোকজন তোমাকে পরিত্যাগ করবে।
৯. সব সুড়ঙ্গ শেষ হয় আলো দিয়ে।
১০. নিয়মিত পড়াশোনা ছাড়া ভালো ছাত্র হওয়া সম্ভব নয়।
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।
'সুড়ঙ্গের অপর পারে আলো আছে', এ কথাটা যত বেশি বলা যায় ততই ভালো।
আচ্ছা, চলুন আজ জীবনের আনন্দ নিয়ে বলি। আমরা শুধু হতাশ হই, কিন্তু আমাদের অনেক কিছু আছে যা অমূল্য। এগুলো চিন্তা করলেই আমরা দেখব কত ভাগ্যবান আমরা!
১. প্রথম সৌভাগ্য হচ্ছে, আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি। পরম করুণাময় ইচ্ছে করলে আমাদের এমনকি মাকড়সা করেও পৃথিবীতে পাঠাতে পারতেন। তা না করে তিনি আমাদের মানুষের জীবন দিয়েছেন। শুধু এই সৌভাগ্যের জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করতে পারব না।
২. আমরা, বাংলাদেশিরা, এখনো মমতা মাখা মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, খালা-খালু, মামা-মামি, কাজিন এদের মাঝে বড় হই। অনেক দেশের ছেলে-মেয়েরা এত আত্মীয়ের আদর তো দূরের কথা, মা-বাবাকেই ঠিকমতো পায় না।
৩. আমরা স্কুল থেকে উঠলে রান্নাঘর থেকে রুটি কিংবা সুজির গন্ধ ভেসে আসে। অনেকেই আছেন, যারা জানেনই না সকালে মায়েরা রুটি বানাতে জানেন, সুজির হালুয়া তাঁদের হাতে অপূর্ব হয়।
৪. আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে খেতে গেলে কোনো না কোনো উপলক্ষ খুঁজে কোনো বন্ধুর পকেট কাটি, একবার ও আরেকবার সে। এভাবে কেউ না কেউ বিল দিয়ে দেয়। দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশে বন্ধু তো দূরের কথা, স্বামী-স্ত্রীও যার যার খাবার বিল নিজেই দেন।
৫. আমাদের এক ভাই বিদেশে কাজ করতে গেলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করে আমাদের আরামের জন্য টাকা পাঠান। সে টাকায় আমরা পড়াশোনা করি, জামা-কাপড় কিনি, পকেট খরচ করি। আপনি আরেকটা দেশ দেখান, যেখানে এক ভাই দূর দেশে রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, নিজে ঠিকমতো না খেয়ে, না ঘুমিয়ে দেশের স্বজনদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার জন্য টাকা পাঠান।
৬. আপনি আরেকটি মানবকুল দেখান, যেখানে ফ্যামিলির কেউ দেশের বাইরে যাওয়ার সময় দলবেঁধে এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে যান। একটি উদাহরণ দেখান, যেখানে পরিবারের কেউ বাইরে থেকে ফিরে এলে এয়ারপোর্টে একই ভিড় হয়।
৭. আপনি কী জানেন, আপনি হোস্টেল থেকে যখন বাড়ি ফিরে যান, তখন আপনার মা কিংবা বোন যে স্পেশাল রান্না করেন, তা জগতের কোনো হোটেলে আপনি পাবেন না!
৮. আপনি কী জানেন, আমাদের দেশে আধো-আলোর ভোরে বাবার রুম থেকে ভেসে আসা টুকরো-কান্না-মিশ্রিত প্রার্থনার পবিত্র সুর 'ফাবি আইয়্যি আলা-ই রব্বি কুমা তুকাজ্জিবান' এই মধুর সুর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত মূর্ছনায়ও আপনি খুঁজে পাবেন না। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, একইভাবে মাকে সন্ধ্যায় ফুল হাতে ঠাকুরের কাছে অবনত হওয়ার অসাধারণ দৃশ্য দেখার ভাগ্যও বেশিরভাগ মানুষের হয় না। কিন্তু আমাদের হয়।
৯. আপনি কী জানেন আমাদের কন্যা বিদায়ের সময় যে কান্নার রোল পড়ে তা আর কোথাও পড়ে না!
১০. আচ্ছা বলুন তো যত রাতেই বাড়ি ফেরেন না কেন, প্রিয়জন না খেয়ে অপেক্ষা করার এমন অপূর্ব ভালোবাসা আপনি কোথায় পাবেন?
১১. সামান্য জ্বর হলে মাথার পাশে সারারাত বসে থাকার মতো সোলমেট আপনি কোথায় পাবেন, বলুন তো?
১২. দুনিয়ার আর কোথাও কি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে মিষ্টির দোকান খালি হতে দেখেছেন?
১৩. প্রাণ হাতে নিয়ে আমাদের দেশের মানুষেরা ঈদে-পার্বণে স্বজনদের কাছে গ্রামে ফিরে যান। আর যারা খুব সুখে আছেন ভাবি তারা ক্রিসমাস কার্ড পাঠিয়ে বলেন, "পাপা বা মম আই লাভ ইউ", কোনটা বেশি আনন্দ দেয় বলুন তো?
১৪. আমাদের দেশে ওল্ড হোম নেই, কারণ আমরা বাবা-মাদের নিজেরাই দেখাশুনা করি। কাছে থাকি আর না থাকি, কী চমৎকার, তাই না?
১৫. আমাদের বেশিরভাগ পরিবারে সব ভাই-বোন এক টেবিলে বসে পড়ালেখা করি। কারণ অধিকাংশ বাবা-মার সবার জন্য আলাদা টেবিল কিনে দেয়ার সামর্থ্য নেই, এক টেবিলে একজন আরেকজনের ঘামের গন্ধ ভাগাভাগি করে পড়ার এই স্বর্গীয় দৃশ্য আর কোথাও কি দেখবেন? মনে হয় না।
১৬. আমাদের দেশে হাসপাতালে রোগীর রুমের বাইরে ভিজিটরদের যত সেন্ডেল-জুতো দেখা যায়, অনেক দেশে কেউ কেউ পুরো জন্মবলয়েই এত জুতো দেখেননি। কী মমতা তাই না?
আমাদের সমস্যা আছে, থাকবে, কার নাই বলুন?
আছে বলেই তো খ্যাতির চূড়ায় থাকা মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাই হতাশাজনিত কারণে অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যান।
সমস্যা আছে বলেই তো প্রিন্সেস ডায়ানা 'কুইন অব সায়রো' উপাধি পান।
সমস্যা আছে বলেই তো জাপানে ফুজি পাহাড়ের নিচে ঘন জঙ্গলে প্রতি বছর শত শত মানুষ আত্মঘাতী হন।
হতাশা আছে বলেই তো শিল্পী ভ্যান গগ "The sadness will last forever." লিখে নিজের বুকে নিজেই মরণঘাতী গুলি চালান।
আছে বলেই তো সারাদুনিয়া বিষাক্ত মাদককে মক্তিখোঁজেন। খ
তাই একটু ভাবুন, দেখুন, আসলে আপনি-আমি কত ভালো আছি! শত সমস্যার মধ্যেও অনেক ভালো আছি।
অ...নে...ক ভা...লো...।
বলুন 'ধন্যবাদ'। বারবার বলুন।
"ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান,
হে আমার নাথ, এই তো তোমার দান"
অপরাহ উইনফ্রে-কে আমরা সবাই চিনি। দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপিকা। উত্তর আমেরিকার প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান বিলিয়নার। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে গিয়ে তাঁর যে পরিচিতিটি মানুষ যুগ যুগ মনে রাখবে তাহলো, আমেরিকায় কালোদের ইতিহাসে তাঁকেই সবচেয়ে বড় মানবতাবাদী বলে সম্মান করা হয়। মিসিসিপির অতিদরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়া এ ভদ্রমহিলা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালীদের একজন। তিনি একটি বই লিখেছেন। এটি গত ক'দিন আমাকে ঘোেরর মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বইটির নাম: What I Know For Sure. এ বইতে তিনি বলেছেন—
১. ধন্যবাদ দেয়ার চাইতে বড় প্রার্থনা খুব কম আছে।
২. আমি যে আচরণ করব, আগামীকাল সে আচরণই আমার কাছে ফিরে আসবে।
৩. তোমাকে যদি বলা হয়, বসো অথবা দৌড়াও আমি বলব, বসো না, দৌড়াও। নাচার আনন্দে দৌড়াও।
৪. বন্ধুর সাথে টেলিফোনে গলা খুলে হা হা হাসতে পারছ, ওটাই হচ্ছে 'ফাইভস্টার' আনন্দ।
৫. সকালে ঠিকঠাক ঘুম থেকে উঠছ, হেঁটে বাথরুমে যেতে পারছ, নিজের কাজ নিজে করতে পারছ, এটাও ফাইভস্টার।
৬. তোমার জীবন শুরু হতে পারে লাফ দিয়ে উঠে সাহসী পদক্ষেপ দিয়ে, এভাবেই তা পেতে পারে পূর্ণতা, এভাবে শুরু করবে কিনা তা তোমার সিদ্ধান্ত।
৭. প্রতিদিনই নতুন সুযোগের দিন, সম্ভাবনার দিন।
৮. তোমার ছবি, তোমার ছায়া, আসলে কত বড় তুমিই কেবল দেখতে পারো আর কেউ নয়।
৯. জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় থেকেও হিরণ্ময় শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে।
১০. দুঃসময় সবার জীবনে অনিবার্য, প্রশ্ন হচ্ছে তুমি তা থেকে বেরিয়ে আসবে কি না? না তাতেই আটকে থাকবে?
১১. দুনিয়ার সেরা জিনিস, বাড়ি-গাড়ি থাকা মানে সফল জীবন নয়, এগুলোর লোভ ছাড়তে পারাই সেরা জীবন।
১২. ভালোবাসা জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ, আমাদের জন্মই হয়েছে ভালোবাসার জন্য।
১৩. কী পেয়েছ তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কী দিয়েছ, তাই গুরুত্বপূর্ণ। কিপ গিভিং, গোয়িং।
১৪. আজ অন্যের কথা শুনে পিছিয়ে যাচ্ছ? কয়েকবছর পর মনে হবে, ইশ! ওদের কথা না শুনলে যদি না এগোতাম!
১৫. বন্ধু হে আমার, আমি জানি, হেরে যাওয়ার জন্য তুমি জন্ম নাওনি, তুমি জন্মেছ গোলাপের মতো ফুটে ওঠার জন্য।
"সময় গেলে সাধন হবে না।
দিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না
তুমি কেন জানলে না
সময় গেলে সাধন হবে না।"
বিশ বছর বয়সটি ফিরে পেলে যে কাজগুলো করতাম—
১. শুনতাম বেশি, বলতাম কম।
২. পড়তাম বেশি, পড়ার ভান করতাম কম।
৩. সময়টা কাজে লাগাতাম বেশি, ঘুমাতাম কম।
৪. বন্ধুত্বই শুধু করতাম, হিংসা কখনোই নয়।
৫. মা-বাবাকেই সবচেয়ে বড় বন্ধু ভাবতাম।
৬. লেখালেখি সিরিয়াসলি নিতাম।
৭. স্কুলের সাগরদের বেশি বেশি দেখতে যেতাম।
৮. সে বয়সে ভয়ংকর রাগী ছিলাম। সময়টা ফিরে পেলে কখনোই রাগ করতাম না।
৯. বাবার পাশে বসে থাকতাম, তাঁর গায়ের গন্ধ নেওয়ার জন্য।
১০. টিউশনির টাকায় দাদু আর মায়ের জন্য পান-সুপারি কিনতাম।
১১. বৃক্ষের উত্তাপ কমিয়ে মানুষকে অনেক বেশি সম্মান করতাম।
১২. ভালো রান্না না হলে রাগ করতাম, খেতেই চাইতাম না। আবার বিশ বছর বয়স ফিরে পেলে মধ্যবিত্তের কাঁচাবাজার কত কষ্টের টাকায় হয়, তা বুঝতাম, অবশ্যই বুঝতাম।
১৩. বয়স্ক মানুষ, যেমন দাদা-দাদু-নানু এদের বেশি সময় দিতাম। বুঝতাম, এদের বেশিদিন পাব না।
১৪. কলোনির বাসায় মাঝে-মাঝে পানি আসত না, আব্বা ফজরের নামাজ পড়েই নিচের চাপাকল থেকে বালতিভর্তি পানি এনে ড্রাম ভর্তি করে রাখতেন, যাতে ঘুম ভাঙার পর আমাদের সমস্যা না হয়। বিশবছর বয়স ফিরে পেলে আমি একদিনের জন্যও আমার বাবাকে তিনতলা অব্দি পানির বালতি টানতে দিতাম না। কখনোই নয়।
১৫. বিশবছর বয়স যদি ফিরে পেতাম, তাহলে এ আফসোসগুলো যাতে বেদনার কারণ না হয়, সেদিকে মন দিতাম।
বিশ বছর বয়স হচ্ছে ভালোবাসা মেলে দেয়ার বয়স, সমতার কুঁড়ি মেলার সময়, দায়িত্ব বোঝার বয়স, শিক্ষা নেয়ার বয়স।
বিশবছর পাল্টে যাওয়ার সময়।
আহা! যদি তা ফিরে পেতাম!!
৫. আমার পাঠ অভিজ্ঞতার ব্যক্তিগত দিক:
বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া সেই মেয়েটি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' অনেক বড় একটা আবেগ ছিল, আল্লাহ দিয়েছেনও।
বাইরে যখন বাবাকে কেউ জিজ্ঞেস করে মেয়ে কোথায় পড়াশোনা করে, তখন বাবা গর্বের সহিত উত্তর দেন যে আমার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
হ্যাঁ, আমি সানজিদা আক্তার; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। জীবনে যা চেয়েছি তার চেয়ে আল্লাহ অনেক বেশি দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু এখন তো একটা বড় জায়গায় এসেছি, স্বপ্নটাও আরো বড় হয়েছে। বাবা-মা যখন গর্ব করে বলেন, আমার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মনে একটু ভয় পায়, তাদের সুখের হাসি ধরে রাখতে পারব তো! আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব তো!
যখনই হতাশ হয় তখনই বাদল সৈয়দ স্যারের এই 'স্বপ্নডানা' বইয়ের কথা মনে পড়ে, যা আমাকে খুব অনুপ্রেরণা দেয় ও সাহস জোগায়; আর এটাই আমার পাঠ অভিজ্ঞতার ব্যক্তিগত দিক।