19/07/2026
আজ অনেক্ষন এইখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আলো আধাঁরির মাঝে৷ শেষ পরীক্ষা দিয়ে একে একে সবাই যখন চলে গেল তারও অনেক পরে৷
অদ্ভুত এক হাহাকার এসে জড়ো হয়েছিলো যেন৷ নিজেকে ভীষণ একা মনে হলো। ভীষণ একা৷ গত দুইটা বছর আমাদের চিৎকার, চেঁচামেচি, হৈ হুল্লোড়ে যে জায়গাটা জমজমাট হয়ে থাকতো। সেই জায়গাটাকেই আজ মনে হলো শ্মশান। চারিদিকে হু হু বাতাস। যে বাতাসের ঝাপটায় বিষাদের সুর মিশে থাকে ঠিক তেমন৷ চোখ খানিকটা ঝাপসা হয়ে উঠছিলো। নিজেকে সংযত করে হনহন করে হাঁটা শুরু করে দিলাম৷ পেছনে পরে রইলো আমার এইটুকুনি জীবনের সবথেকে আনন্দময় এক অধ্যায়। সেরা সুখস্মৃতি।
ঢাকা শহর বরাবরই আমার কাছে তিক্ত অভিজ্ঞতার। তবু মাঝে মাঝে আসতাম। মজারুতে টুকটাক সময় দিয়ে আবার পালিয়ে যেতাম৷ এরই মাঝে ভর্তি হলাম আইইআরে। বুড়ো বয়সে বইখাতা নিয়ে পাঠশালায় যাওয়ার মতো৷ প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিলো৷ কিন্তু ক্রমেই অসাধারণ কিছু মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে এই জায়গাটাই হয়ে উঠলো আমার সবথেকে প্রিয়।
আমি আজন্ম আমুদে মানুষ। রসিকতা ছাড়া আমার এক রত্তিও ভালো লাগে না। লেখাপড়ার ফাঁকে না। বলতে হবে তুমুল আনন্দের ফাঁকে যৎসামান্য লেখাপড়া করেছি আমরা। সারাদিন হা হা হো হো। এই বুড়ো বয়সে কি না করেছি! স্যারের লেকচারের ফাঁকে কাগজের দলা ছুড়ে মারা, হঠাৎ করেই হেরে গলায় গান শুরু করে দেয়া, অন্যের খাবার চুরি করে খাওয়া! আরো কত কী! একেবারে কিন্ডারগার্টেনের বান্দর টাইপ ছেলেমেয়েদের মতো। মাঝে খানিক্ষণের বিরতি হলেই ক্যান্টিনে জমে ওঠে আড্ডা! আমাদের সঙ্গী হলো ভাপ ওঠা চা, গরম গরম সিংগারা আর ছোলা মুড়ি।
অদ্ভুত কিছু শিক্ষক পেয়েছি৷ শুরুতেই বলতে হয় খালাম্মার কথা৷ খানিকটা হিটলারি কায়দায় যিনি পড়ান৷ খুবই তিক্ত, বিরক্ত সবকিছু নিয়ে। কিন্তু নাজিফা আপার কাছের মানুষ হওয়াতে কিছু বলি নাই৷ যদিও খানিকটা মনোমালিন্য মাঝেমাঝে ঘটেছে৷ আশরাফ সাদিক স্যারের নিরেট রসিকতায় প্রাণভরে হেসেছি৷ সেরা দুজন শিক্ষককে পেয়েছি। আইয়ারে এটা একটা বিরাট অর্জন আমাদের। আহসান হাবীব স্যার আর সায়েরা ম্যাডাম। এই দুইজন মানুষের অসম্ভব আন্তরিকতা, সততা আর পরিশ্রমের কারণে সাইকোলজিকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাদের থেকে যতই জেনেছি ততই মুগ্ধ হয়েছে।
আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হলো প্রিয়৷ মোটা ফ্রেমের চশমায় হেলেদুলে আদুরে ভঙ্গিতে যখন কথা বলে তখন যে কি ভালো লাগে! এরপর লাল আপা। দেখা হলেই এক গাল হেসে দোয়া করে দেয়। সবসময় লাল বোরখা পরার কারনে তার এই নাম। শুনেছি অনেক স্যারেরাও তাকে এইনামে ডাকে! লামিয়ার সাথে মাত্রাতিরিক্ত মজা করেছি! যার কোন সীমানা নেই। হাসিমুখে সব মেনে নিয়েছে! মনীষীতা দিদির ক্ষেত্রেও তাই। এই মানুষটা যে কিভাবে আমাকে সহ্য করে তা পরমেশ্বরই জানে! এই তালিকায় আছে নিশাত। প্রতিনিয়ত ও আমার দ্বারা যে পরিমাণ বুলিং এর শিকার হয় তাও যে কেস করে না এই আমার ভাগ্য। বাবলু ভাই হলো অদ্ভুত চরিত্র৷ দেখা হলেই খাওয়াবে৷ খাওয়ানোর বায়না ধরবে৷ খুউউব খুশি হয়েছি যে তার সাথে জুড়ি বেধেছে অসম্ভব মিষ্টি মনের বান্ধবী সানজানা। খুউব ইচ্ছে আমাদের ক্যাম্পাদেই ওদের বিয়ের হলুদ বরণ আয়োজন হবে৷ ফাইজারের কিছু মহিলা বান্দর আমাদের সাথে লেখাপড়া করেছে। জান্নাত, মিম, মিথিলা, জুয়াইরিয়া, রিতা। এই দলটা সারাদিন খিলখিল করে যায়। পুরো ক্লাসে একটা আলাদা আমেজ আসে যখন ওরা আসে। আমি ওদের সাথে বাদরামি কম করিনি। ভীষণ স্নেহময় কিছু বড় আপা পেয়েছিলাম। শুরুতেই বলতে হয় লুবনা আপার কথা। একটা মানুষ কিভাবে যে এত মিষ্টি করে কথা বলে, এত সহজেই আপন করে নেয় - আপাকে না দেখলে হয়তো সেটা অজানা থেকে যেতো। এরপরে খালেদা আপার ভালোবাসা। লিপি আপার অপার স্নেহ আর অসম্ভব ট্যালেন্টেড স্নিগ্ধা আপা। এই সময়ে এসেও লেখাপড়ার প্রতি তার এই আন্তরিকতা মুগ্ধ করে। পপি দিদির কথা না বললেই না। এই মানুষটাও তারা অমায়িক ব্যবহার আচরণে আমাকে একেবারে কাছের ছোট ভাই বানিয়ে ফেলেছে। তার রসিকতায় আমিও হেসে কুটি কুটি হই। তাসদীদের কন্ঠের দোস্ত ডাকটায় মনটা ভরে যেত। মন ভরে যেন সুজন ভাইয়ের সাথে মশকরায়। খুব পছন্দের একটা জুটি হচ্ছে ফাল্গুনী ম্যাডাম আর রাফি স্যার। এদের তুই-তোকারি শুনে বোঝাই যাবে না যে এরা স্বামী-স্ত্রী। সারাদিন মিষ্টি খুনসুটি লেগেই আছে। কি যে ভালো লাগে এদের! ক্লাসে হয়তো আমি সবথেকে বেশি বুলিং শিকার হয়েছি সিরিয়ার কাছ থেকে! খানিকটা ভয়ও পেতাম ওকে। ঠাস ঠাস করে মুখের উপর কথা বলে দেয়। কিন্তু মেয়েটা ভালো। দিলরুবা..দিলরুবা.. বলেই গান গেয়ে ওঠা দিলরুবা। অসম্ভব পড়ুয়া এই মানুষটা বেশ ভালো। মীমনূরও ভীষণ মজার। এরপর জুবেরি স্যার, পিয়াস স্যারের সাথের আনন্দের দিনগুলা ভোলার না।
তবে আমার কাছে সব থেকে ভালো মনের মানুষ মনে হয়েছে মনিরা আপা, আকলিমা, সোনিয়া, ইয়াসমিনকে। ওদেরকে কখনো বলিনি। কিন্তু আজকে বললাম। এত শান্ত, স্নিগ্ধ, বিনয়ী, অমায়িক মানুষ পাওয়া বেশ ভার এই যুগে৷ একই সাথে নাজিম ভাই। এত বিনয়ী আর সৎ মানুষ আমার জীবদ্দশায় আমি দেখিনি! তার আন্তরিকতামাখা হাসি ভোলার না। কৃতজ্ঞ আলাউদ্দিন ভাইয়ের প্রতি। তার উৎসাহ আর প্রেরণাতেই এই লেখাপড়া। শেষের দিন খুউব মনে পড়ছে মীরা আপা, চাঁদনী, ইসরাত, সুপ্তিকে। একসাথে আমরা শুরু করেছিলাম। কিন্তু শেষ করা আর হলো না!
এত্ত মানুষের ভীড়েও আমাদের ছোট্ট একটা কোরাম ছিল! আমি, আসাদ ভাই, প্রিয়া আর নাজিফা। আসাদ ভাই সেই ছোটবেলা থেকেই আমার আইডল। তার থেকে কথা বলা শিখেছি, আবৃত্তি শিখেছি, সৃজনশীলতা শিখেছি। এখনো শিখছি৷ একটা মানুষ এত্ত সুন্দর করে গুছিয়ে কিভাবে বলে, কিভাবে বোঝাই ভেবে পাই না৷ প্রিয়া হলো সেই 'প্রিয়া প্রিয়া ও প্রিয়া প্রিয়া..।' গানের সেই প্রীতি জিনতার মতোই। একেবারে ঝলমলে কিশোরী। খানিকটা বান্দর হলেও মেয়েটা ভালো৷ আর সর্বশেষ নাজিফা আপা। এই মানুষটা একেবারেই অন্যরকম ভালোমানুষ। এত অল্প সময়ে আমাদের সবাইকে এত্ত আপন করে নিয়েছে তা ভেবে পাই না। ভীষণ ট্যালেন্টেড আর ভীষণ ভালো এই দুই গুণ একসাথে অর্জন করেছে এই মানুষটা৷ আমাদের সবাইকে নিয়ে এই করা সেই করা নিয়েই আছে৷ তার থেকে সব থেকে বেশি ভালোবাসা আর আন্তরিকতা পেয়েছি। যেটা সারা জীবন মনে থাকবে।
আজকে দেখলাম নাজিফা আপা আড়ালে কাঁদছে। মনটা ভীষণ নরম হয়ে গেল। কপট হাসি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করলাম। আসাদ ভাইয়ের মতো মানুষও ফ্যাকাশে একটা হাসি দিয়ে বললো, আদনান আমাদের সব শেষ হয়ে গেল না? আর একসাথে হওয়া হবে না। আমি এই যে এখনো যখন লিখছি বুকের ভেতরটায় মোচর দিয়ে উঠলো। এই আলো ঝকমলে হাসি মুখগুলোকে একসাথে আর দেখা হবে না! ঝুম বর্ষায় আমাদের দোতলায় দাঁড়িয়ে গাছেদের ভিজে যাওয়া দেখা হবে না। আহসান হাবীব স্যার মিষ্টি হাসি দিয়ে আর ক্লাসে আসবে না। হেরে গলায় আমাদের গান গাওয়া হবে না। পরীক্ষার হলে চুরি করে অন্যের বিস্কুট খাওয়া হবে না। একসাথে একরুমে প্রাণের এই স্ফুলিঙ্গ আর দেখবো না! আহারে!
আমার জীবনের এই দুইটা বছর আনন্দময় করার জন্য তোদের কাছে আমি ঋণী। আমার পাগলামি, ছাগলামি তোরা হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিস এজন্য তোদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কিভাবে লিখে তোদের প্রতি আমি আমার এই ভালোবাসা প্রকাশ করব সেই ভাষা জানা নেই।
তোরা যে যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস, আলোয় থাকিস। পরম করুনাময়ের জোছনা জলে তোরা ভিজে থাকিস সারা বেলা।
© Ali Adnan