13/04/2024
৮ রাকাআত তারাবীর হাদিসটির বিচার-বিশ্লেষণ
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يوسف، عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ قَالَ: أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيماً الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً.
মুহাম্মদ বিন ইউসূফের বর্ণনায় সায়েব বিন ইয়াযিদ রা. বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. হযরত উবাই ইবনে কা’ব ও তামীমে দারী রা.কে নির্দেশ করেন, যেন তারা লোকদের নিয়ে ১১ রাকাআত পড়েন। মুয়াত্তা মালেক।
পর্যালোচনা
হাদীসটিতে আহলে হাদিস ভাইদের ধারণা মতে ৩ রাকাআত বিতর এবং ৮ রাকাআত তারাবীহ, মোট ১১ রাকাআত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। হাদীসটি প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে সহীহ। কিন্তু হাদীস বিশারদগণ এ হাদীসটির জবাবে দুটি পন্থা অবলম্বন করেছে।
প্রথমত:
এ বর্ণনাটিকে ভুল আখ্যায়িত করে বিশ রাকাআতের বর্ণনাটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা এ হাদীসটি সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন তার তিনজন ছাত্র।
এক. ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা।
দুই. হারেস বিন আবূ যুবাব।
তিন. মুহাম্মাদ বিন ইউসূফ।
প্রথম ছাত্র ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা, তার থেকে তার তিন ছাত্র হাদীসটি একই রকম বর্ণনা করেছেন।
১. মুহাম্মাদ বিন আবূ যিব, তার সনদে হাদীসটি ইমাম বুখারী রাহ.-এর উস্তাদ আলী ইবনুল জা’দ রাহ. (মৃত্যু ২৩০ হি.) স্বীয় ‘মুসনাদে’ বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন। ইবনুল জা’দ থেকে ইমাম বাইহাকী ‘আস-সুনানুল কুবরায়’ বর্ণনা করেন। এতে বিশ রাকাআত তারাবীহর কথা উল্লেখ হয়েছে।
২. মুহাম্মাদ বিন জাফর, তার সনদে হাদীসটি ইমাম বাইহাকী ‘মা’রেফাতু সুনান’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন। এতে ২০ রাকাআত তারাবীহর বর্ণনাই এসেছে। বর্ণনা দুটি এ বইয়ের শুরুতে উল্লেখ হয়েছে।
৩. ইমাম মালেক ২০ রাকাআত তারাবীহর কথা বর্ণনা করেছেন। (ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার)
দ্বিতীয় ছাত্র হারেস বিন আবূ যুবাবের হাদীস ২৩ রাকাআত বা ৩ রাকাআত বিতর ব্যতীত ২০ রাকাআত তারাবীহ, যা তার ছাত্র আসলামী থেকে ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে’ বর্ণিত হয়েছে।
তৃতীয় ছাত্র মুহাম্মদ বিন ইউসূফ। তার থেকে হাদীসটি তার ছাত্ররা তিন রকম বর্ণনা করেছেন।
১. ইমাম মালেক ১১ রাকাআত। (মুয়াত্তা মালেক)। এভাবে আব্দুল আজীয বিন মুহম্মাদ ও ইয়াহয়া বিন সাঈদ আল-কাত্তান ১১ রাকাআত বর্ণনা করেছেন। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর ও মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ)
২. মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক, তার সনদে হাদীসটি ইমাম মারওয়াযী ১৩ রাকাআত বর্ণনা করেন। (কিয়ামুল লায়ল)
৩. দাউদ ইবনে কায়স, তার সনদে হাদীসটি ইমাম আব্দুর রাজ্জাক ২১ রাকাআত বা ১ রাকাআত বিতর ব্যতীত ২০ রাকাআত বর্ণনা করেছেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক)
লক্ষ্য করুন! এ হাদীসটি সাহাবী সায়েব বিন ইয়াযীদ রা. থেকে তার তিনজন ছাত্র বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা ও হারেস বিন আবূ যুবাব দুই ছাত্রের সকল তথা চারটি সূত্রে একই রকম অর্থাৎ ২০ রাকাআত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় ছাত্র মুহাম্মদ বিন ইউসূফের সূত্রে কেউ ২০ রাকাআত, কেউ ১৩ রাকাআত, আবার তিন জন ১১ রাকাআত বর্ণনা করেছেন। আর শেষটাকেই আহলে হাদীস বন্ধুরা গ্রহণ করেছেন।
পাঠক আপনিই বলুন, যার দুই ছাত্রের বর্ণনা একই রকম, তা গ্রহণ করবেন? নাকি যার আরেক ছাত্র থেকে তিন রকম বর্ণনা পাওয়া যায়, তা থেকে একটি গ্রহণ করবেন? নিশ্চয় দুই ছাত্রেরটাই গ্রহণ করবেন। কাজেই ২০ রাকাআতের বর্ণনা প্রাধান্য পাবে।
বরং এখানে যদি দ্বিতীয় ছাত্র হারেস বিন আবূ যুবাবকে বাদ দিয়ে উভয় দিকে এক ছাত্রই রাখা হয়, তারপরও বিশ রাকাআতের বর্ণনা প্রাধান্য পায়। কেননা তখনও প্রথম ছাত্র ইয়াযীদ থেকে তিনটি সূত্রে হাদীসটি একই রকম তথা ২০ রাকাআত পাওয়া যায়। অন্যদিকে তৃতীয় ছাত্র মুহাম্মদ বিন ইউসূফ থেকে হাদীসটি তিনটি সূত্রে তিন রকম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে আবার একটি সূত্রের বর্ণনা বিশ রাকাআতের সাথে মিলে যায়।
এতে দুই দিক থেকে বিশ রাকাআতের হাদীসটি প্রাধান্য পায়।
১. প্রথম ছাত্রের তিনটি বর্ণনাতে কোন ভিন্নতা নেই। কিন্তু তৃতীয় ছাত্রের তিনটি বর্ণনাতেই মতভেদ রয়েছে।
২. প্রথম ছাত্রের সকল বর্ণনা এবং তৃতীয় ছাত্রের একটি বর্ণনা বিশ রাকাআতের পক্ষে। কিন্তু আট রাকাআতের পক্ষে শুধু তৃতীয় ছাত্রের বর্ণনা। কাজেই দুইয়ে একে বলুন কিংবা একে একে ধরুন, সর্বাবস্থায় ২০ রাকাআতের হাদীসটিই প্রাধান্য পায় এবং সর্বাধিক বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়।
উল্লেখ্য, এই আলোচনা শুধু সাহাবী সায়েব বিন ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণিত সূত্রগুলোর মাঝে প্রাধান্যতা এবং তাঁর থেকে বর্ণিত বিশ রাকাআতের হাদীসটির সর্বাধিক বিশুদ্ধতা প্রমাণে করা হয়েছে। এর সাথে যদি হযরত উমর রা.-এর যুগের আমলের বিবরণ সম্বলিত অন্য বর্ণনাগুলো যোগ করা হয়, তাহলে ১১ রাকাআত (৩ রাকাআত বিতর ও ৮ রাকাআত তারাবীহ) পড়ার বর্ণনাটি ভুল সাব্যস্ত হয়।
কেননা বিশিষ্ট তাবেয়ী আবুল আলিয়া (মৃত্যু ৯০ হি.) রাহ., তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে রূমান (মৃত্যু ১৩০ হি.), আব্দুল আজীজ ইবনে রুফাই (১৩০ হি.), হাসান বসরী (১১০), ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (১৯৮) ও মুহাম্মদ ইবনে কা’ব কুরাযী (১২০) রাহ. প্রমুখ থেকে হযরত উমর রা.-এর যুগে রমযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়ার কথা প্রমাণিত হয়। (দেখুন, মারিফাতুস সুনান, বায়হাকী ৫৪১১; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ৭৭৬৪, ৭৭৬৬; আবু দাউদ ১৪২৯; সিয়ারু আলামিন নুবালা, যাহাবী ১/৪০০; জামিয়ুল মাসানীদ, ইবনে কাসীর ১/৮৬; রাকাআতে তারাবীহ, আযমী পৃ. ৮০।)
এ কারণেই ইমাম ইবনে আব্দিল বার মালেকী রাহ. বলেছেন,
أَنَّ الْأَغْلَبَ عِنْدِي فِي إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً الْوَهْمُ.
আমার প্রবল ধারণা ১১ শব্দটি ভুল।
তিনি উমর রা.-এর যুগের ২০ রাকাআত তারাবীহর বিবরণ সম্বলিত কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন,
وَهَذَا كُلُّهُ يَشْهَدُ بِأَنَّ الرِّوَايَةَ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً وَهْمٌ وَغَلَطٌ وَأَنَّ الصَّحِيحَ ثَلَاثٌ وَعِشْرُونَ وَإِحْدَى وَعِشْرُونَ رَكْعَةً وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
এ সকল বর্ণনা এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, ১১ রাকাআত পড়ার বর্ণনাটি সন্দেহ ও ভুল। সঠিক বর্ণনা হচ্ছে, (তিন রাকাআত বিতর সহ) ২৩ রাকাআত এবং (এক রাকাআত বিতর সহ) ২১ রাকাআত। (আল ইসতিযকার ৫/১৫৪, ১৫৬ তাহকীক, আব্দুল মু’তী।)
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ বলেন, আমার নিকট ইবনে আব্দিল বার রাহ-এর কথাই সঠিক মনে হচ্ছে। কেননা অধিকাংশ বর্ণনায় ২০ রাকাআত তারাবীহর কথা এসেছে। (আওজাযুল মাসালিক ২/৫২৮।)
তবে হ্যাঁ, উক্ত ভুল কার থেকে প্রকাশ পেয়েছে- এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্দিল বার রাহ. যদিও বলেছেন ইমাম মালেক থেকে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সঠিক কথা হল, এ ভুলটি তৃতীয় ছাত্র মুহাম্মদ বিন ইউসূফ থেকে হয়েছে। (আওজাযুল মাসালিক ২/৫২৮।)
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
দ্বিতীয়ত:
অনেক ইমাম আট ও বিশ রাকাআতের দুই বর্ণনার মাঝে সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, প্রথম প্রথম যখন কেরাআত খুব দীর্ঘ পড়া হত, তখন আট রাকাআত পড়া হত। পরে কেরাআত কিছুটা হালকা করে রাকাআত বাড়িয়ে বিশে উন্নীত করা হয়েছিল। তখন থেকেই বিশ রাকাআত পড়ার ধারা অব্যাহত থাকে।
ইবনে হাবীব মালেকী (মৃত্যু ২৩৮ হি.), হাফেজ দাউদী (মৃ. ৪০২ হি.) ও ইমাম বায়হাকী (মৃ. ৪৫৮ হি.) রাহ. মনীষীগণ এরূপ সমন্বয়ের পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। (তুহফাতুল আখয়ার পৃ. ১৯২- সূত্রে রাকাআতে তারাবীহ পৃ.৬৮; আস-সুনানুল কুবরা ২/৬৯৯; শরহে বুখারী, ইবনে বাত্তাল ৪/১৪৮।)
এদের মধ্যে আবার দাউদী রাহ. এ কথাও বলেছেন যে, যখন থেকে উমর রা.-এর ব্যবস্থাপনায় বিশ রাকাআত পড়া শুরু হয়, তখন থেকে মুআবিয়া রা. (মৃ. ৬০ হি.)-এর যুগ পর্যন্ত বিশ রাকাআত পড়া অব্যাহত থাকে।
আরো যারা এভাবে সমন্বয় করা পছন্দ করেছেন, আবুল ওয়ালীদ বাজী (মৃ. ৪৭৪ হি.) ‘আল-মুনতাকা’তে, ইবনে রুশদ (৫২০ হি.) ‘আল-বয়ান ওয়াত তাহসীল’এ, তকীউদ্দীন সুবকী (৭৫৬ হি.) ‘আল-ইবতিহাজ’এ, ওলীউদ্দীন ইরাকী (৮২৬ হি.) ‘তরহুত তাসরীব’এ, বদরুদ্দীন আইনী (৮৫৫ হি.) ‘নুখাবুল আফকার’এ, ইবনুল হুমাম (৮৬১ হি.) ‘ফাতহুল কাদীর’ গ্রন্থে, সুয়ূতী (৯১১ হি.) ‘আল-মাসাবীহ’তে, কাসতাল্লানী (৯২৩ হি.) ‘ইরশাদুস সারী’তে, শা’রানী (মৃ. ৯৭৩ হি.) ‘কাশফুল গুম্মাহ’তে, মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হি.) ‘মিরকাতুল মাফাতীহ’ গ্রন্থে, যুরকানী (১১২২ হি.) ‘মুয়াত্তা মালেকের ব্যাখ্যা’য় ও আব্দুল হাই লখনভী রাহ. (১৩০৪ হি.) ‘আত-তা’লীকুল মুমাজ্জাদ’ গ্রন্থে।
সুতরাং একথা প্রমাণিত হল যে, আহলে হাদীস বন্ধুদের দলীল হিসেবে হযরত উমর রা.-এর যুগে আট রাকাআত তারাবীহর যে বর্ণনা এসেছে, তা প্রথম প্রথম কিছু দিনের আমল ছিল; যা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু বিশ রাকাআতের যে বর্ণনা এসেছে, তা উমর রা.-এর যুগের শেষ ও স্থায়ী আমল। ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী, ইবনুল হুমাম, শা’রানী, মোল্লা আলী কারী, আব্দুল হাই লখনভী, শায়খ আব্দুল হক দেহলভী ‘মা সাবাতা বিস সুন্নাহ’তে ও আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী ‘ফয়যুল বারী’তে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, বিশ রাকাআত তারাবীহর উপরই আমল স্থির ও স্থায়ী হয়েছে।
আর ইতিহাস ও যুগ যুগ ধরে আমলও একই কথা বলছে। কেননা হযরত আলী রা.-এর যুগে বিশ রাকাআত পড়া হত। তাঁর বিশেষ ছাত্র শুতাইর, আব্দুর রহমান, সাঈদ ইবনে আবীল হাসান, আলী ইবনে রাবীআহ, হারেছ ও সুয়াইদ রাহ. প্রমুখ স্ব স্ব স্থানে বিশ তারাবীহ রাকাআত পড়তেন ও পড়াতেন। এভাবে তাবেয়ী আতা ইবনে রাবাহ, হাসান বসরী, ইবনে আবী মুলায়কা ও ইব্রাহিম নাখায়ী রাহ.-এর বর্ণনাসমূহে সাহাবা ও তাবেয়ীদের বিশ রাকাআত পড়ার কথা প্রমাণিত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে বিশ রাকাআত পড়ার আমল চলে আসছে। বিস্তারিত জানতে আমার "বিকৃতি ও বিভ্রান্তির কবলে তারাবির নামায" বইটি পড়ুন অথবা কমপক্ষে কমেন্ট বক্সের লেখাটি পড়ুন।
কাজেই আহলে হাদীস বন্ধুরা এমন দলীল নিয়ে বসে আছেন, যা ভুল যেমনটি ইবনে আব্দিল বার রাহ. বলেছেন। অথবা (সঠিক হলে) প্রথম কিছু দিনের অস্থায়ী আমল ছিল, যা পরবর্তী সময়ে বাদ হয়ে গেছে।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে এমন দলীল গ্রহণ করা থেকে হেফাজত করুন। আমীন!