30/09/2023
'ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিলো আগন্তুক হিসেবে', নবীজি বলেন, 'এটা আবার আগের সেই রূপেই ফিরে যাবে।' বাস্তবিকই বর্তমান যুগের পশ্চিমাদের কাছে ইসলাম এক রকম বহিরাগত, আগন্তুক।
আমরা ইসলামকে বোঝাতে ইংরেজি 'religion' বা বাংলায় 'ধর্ম' শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু পশ্চিমাদের কাছে ইসলাম কোনো ধর্মের নাম নয়। Oxford English Dictionary-তে 'religion' তথা ধর্মের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে তা একজন মুসলিমের কাছে এলিয়েনসদৃশই বটে : 'জীবনের একটা অবস্থা যা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার বন্ধনে আবদ্ধ ; অর্থ্যাৎ একটি ধর্মীয় বিশ্বাসে একাত্মতা।' খেয়াল করে দেখুন—এই সংজ্ঞায় কোথাও পরকালীন জীবনের কোনো উল্লেখ নেই—অথচ
পরকালে বিশ্বাস ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাগুলোর একটি এবং এটা একজন মুমিনের প্রাত্যহিক জীবনে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি আক্বীদা। এর চেয়েও বড়ো ব্যাপার হলো এই সংজ্ঞায় নেই ওহি কিংবা নবীজির নবুয়্যতের মতো ইসলামের অনিবার্য স্বীকার্যসমূহের কোনো উল্লেখ।
ধর্মের সংজ্ঞা সম্পর্কে Oxford English Dictionary'র আরেকটি ব্যাখ্যায় superhumanতথা অতিমানবে বিশ্বাসের কথা আছে—এই ধারণাগুলো পশ্চিমের বস্তুবাদী মননে অনুরণন সৃষ্টি করতে পারে এবং করেছেও, কিন্তু মুসলিমের কাছে এসবের সামান্যই মূল্য আছে। এবং এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হাস্যকরও বটে! একজন মুসলিমের কাছে আল্লাহ কখনোই superhuman নন। আল্লাহ এমন এক অসীম অনন্ত সত্তা, যিনি এমনই একক কর্তৃত্ববান তাঁর সত্তা এবং ক্ষমতায়—যার সম্পূর্ণ অনুধাবন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু যুক্তিবাদী পশ্চিমা মন এটা মেনে নিতে রাজিই হয় না যে তার অনুধাবনের ক্ষমতা খুবই সীমিত। সে যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে বুঝে ফেলতে চায়৷ সে তার নিজস্ব ইতিহাস, সংজ্ঞা, প্রত্যাশা এবং প্রত্যয় ইসলামের উপর প্রয়োগ করে সেই ছাঁচে ইসলামকে বুঝতে চায়। ফলে তার সাথে ইসলামের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
ঐতিহাসিক Karen Armstrong লিখেছেন, 'ব্যাক্তিগত এবং পদ্ধতিগত সাধনা হিসেবে ধর্মের যে ধারণা তা ক্লাসিকাল গ্রিস, জাপান, মিশর, মেসোপোটেমিয়া, ইরান, চীন এবং ভারতে সম্পূর্ণরূপে অনপুস্থিত ছিলো।
তাহলে ইসলাম কী? কোথেকে এলো এসব পদ্ধতি, সংযম এবং সাধনা?
সংক্ষেপে ইসলাম হলো একটা জীবনব্যবস্থা যার তিনটা মূল বিশ্বাস রয়েছে : তাওহীদ, রিসালাত এবং আখিরাত। তাওহীদ: এক আল্লাহ-তে বিশ্বাস। মুসলিম মনে করে তার হায়াত-মওত-দৌলত সব কিছুর একমাত্র কর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। রিসালাত: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসালামকে আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসূল হিসেবে মেনে নেওয়া। আখিরাত: দুনিয়ার জীবনের কৃতকর্মের প্রতিদান প্রাপ্তির অনন্ত জগৎ।
ধর্মপ্রাণ মুসলিমের নিত্য জীবনযাপনে ইলাহি নির্দেশনার একটা স্পষ্ট ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। আল্লাহর ভালোবাসায় মুসলিম তার প্রতিটি কাজে নবীজিকে অনুকরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করে—কারণ নবীজি আল্লাহর সবচে প্রিয় পাত্র এবং তাঁকে অনুকরণেই মুসলিম-জীবনের সার্থকতা। নবীজির অনুকরণে মুসলিম যা করে সবই 'ইবাদাত' হিসেবে গণ্য হয়। এই ইবাদাতগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ইবাদাত আধুনিক বৌদ্ধিক, অজ্ঞেয়বাদী ইত্যাদি সাধনায় অভ্যস্ত অনেকের কাছে হয়তো ক্লান্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর নৈকট্যপ্রার্থীদের নিকট এগুলো মোটেও দুর্বহ কোনো ভার নয়।
মুমিন যখন ঘুম থেকে জেগে উঠে—রাত্রির ঘুমের পর একটি নতুন দিন পেয়ে তখন সে আল্লাহর শোকর আদায় করে। এরপর সারাটাদিন জুড়ে—দাঁড়িয়ে , সিজদায়, তিলাওয়াতে এবং আলহামদলিুলিল্লাহ বলার
সময়—মুসলিম চেষ্টা করে নবীজিকে পুঙ্খানপুুঙ্খভাবে অনুকরণ করতে। জুতো পায়ে দেয়ার সময় সে ডান পা আগে দেয়—কারণ নবীজি এভাবে জুতো পায়ে দিতেন। বাথরুমে প্রবেশের সময় বাম পা আগে দিয়ে প্রবেশ করে, দাঁত ব্রাশ করার সময় ডান থেকে বামে ব্রাশ করে, মসজিদে ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করে এবং সালাতে কা'বা মুখী হয়ে দাঁড়ায়। তার হালাল ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে আধুনিক কাপড়-পছন্দ সবকিছুই ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত। যা কিছু কোরআনের ব্যাখ্যা এবং নবীজির সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত তার সবকিছুই সে খুশি মনে গ্রহণ করে। এবং বাকি সব কিছু বাদ দেয়। এরকম প্রতিটি কাজের মধ্যেই সে বিশ্বাসের অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করে এবং সে আরো অনুভব করে যে তার আত্মা শান্তির বাগানের পানে কদম কদম এগিয়ে চলেছে। একজন বস্তুবাদী কিংবা নাস্তিক কখনোই ইলাহি আদেশের সামনে এভাবে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। এবং কার্যত তার মনোদৈহিক প্রশান্তি মুমিনের তুলনায় নগণ্যই হয়।
ইসলাম শব্দটি আরবি 'ইসতিসলাম' (যার অর্থ আত্মসমর্পণ) থেকে আগত, যার অন্য একটি ব্যুৎপত্তিগত সহোদর শব্দ হলো'সালাম' যার অর্থ শান্তি। অর্থ্যাৎ আল্লাহর নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই কেবল মানবাত্মা তার কাঙ্ক্ষিত শান্তির সন্ধান পায়।
Ed Husain এর সুবিখ্যাত The House Of Islam : A Global History গ্রন্থের What is islam? প্রবন্ধের প্রথম কয়েক প্যারার অনুবাদ।
©Mohammad Taa-seen