29/06/2024
নিত্যদিনের নানা কর্মকান্ডের মতন বাউল সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও অত্যাচার রীতিমত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবারো এক বাউল পরিবারের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ফকির লালন সাঁই-এর পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ায়। সবচেয়ে কুৎসিত ব্যাপারটি হচ্ছে এলাকার একদল উগ্র ধর্মান্ধ রীতিমত মসজিদে মাইকিং-এর মাধ্যমে লোক জড়ো করে উন্মত্তের মতন হামলে পড়েছে এক অসহায় বৃদ্ধার ভিটায়। অদ্ভুত হলেও সত্য, এই ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া তো দূরে থাক, পত্রিকার খবর অনুযায়ী স্থানীয় থানার ওসি মূল অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছেন।
চায়না বেগম এবং তার স্বামী মৃত গাজির উদ্দিন ফকির লালন সাঁই-এর অনুসারী সাধু। স্বামীর কবরটা নিজের বসতভিটার পাশে করেছিলেন চায়না বেগম। বাউল ঘরানার সাধু সমাজের এই মানুষেরা কারো সাতে-পাচে থাকেন না, নিজেদের মতন বাউল সাধনা আর গান-বাজনা নিয়েই মেতে থাকেন। এতেই গাত্রদাহ হয়েছে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার টাকিমারা গ্রামের উগ্র ধর্মান্ধ কীটদের। ৯০ বছর বয়সী চায়না বেগম বলেন, “আমার স্বামী মৃত্যুর আগে বলে গেছেন, কোথাও জায়গা নাহলে তুমি আমার কবরের পাশেই থাকবা। প্রতিবছর বাতাসার সিন্নি হলেও করবা। তার কথা রাখতেই ঘরখানা তৈয়ার করি।” অথচ সেই ঘরের উপর ধর্ম ব্যবহার করে চরম আক্রোশ চালিয়েছে এই ধর্মান্ধের দল।
সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে তারা এই ঘৃণ্য কাজটি করেছে এলাকার মসজিদে মাইকিং-এর মাধ্যমে জঘন্য ধর্মীয় উস্কানি ছড়িয়ে। মসজিদ মুসলমানদের ধর্মীয় প্রার্থনার জায়গা, এখানে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা আসেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ইবাদত করতে। এই বর্বর উগ্র ধর্মান্ধ জালিমের দল সেই মসজিদে দাঁড়িয়ে আজানের বদলে মাইকিং করেছে একজন অসহায় বৃদ্ধার উপর হামলা চালাবার জন্য। ঘটনা জানতে পেরে প্রতিবাদ করে হামলার শিকারও হয়েছেন বৃদ্ধা। চায়না বেগমের দাবি, বাড়ি ভাঙার প্রতিবাদ করায় এলাকায় নতুন বাড়ি করা একজন লেবাসধারী হুজুর তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এমনকি রাতের আঁধারে সেখানে তাকে পেলে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দিয়েছেন অভিযুক্তরা। এরচেয়ে ভয়াবহ অধর্ম আর কি হতে পারে?
আর এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে বা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপর হবার কথা ছিল, দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা এখানে পক্ষ নিয়েছে এই ধর্মান্ধ জালিমদের। কুষ্টিয়া সদর থানায় এই ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন চায়না বেগম। অভিযোগে ওই এলাকার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এনামুল হক, মাতব্বর মোশারফ হোসেন, আনার মণ্ডল ও সাইদুল হাজির নাম উল্লেখসহ ৪৫-৫০ জনকে আসামি করা হয়। অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার বদলে থানায় ওসি ঘটিয়েছেন এক অদ্ভুত ঘটনা।
শুক্রবার বিকেল চারটায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি মিটিং হয়। মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা চায়না বেগমের ভাই আয়াত আলী বলেন, ওসি আমাদের বলেছেন আপাতত ওই জায়গায় ঘর করে থাকা যাবে না, অন্য যেকোনো জায়গায় থাকতে হবে। তবে এলাকাবাসী ঘর ভেঙে যে ক্ষতি করেছে সেই ক্ষতিপূরণ প্রশাসনের মাধ্যমে দেয়া হবে।
মানে এই জঘন্য ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা হচ্ছে ভুক্তভোগীকে ঐ স্থান উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দেয়া এবং প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। গরু মেরে জুতা দানও বোধহয় এরচেয়ে সম্মানজনক ছিল। বাংলাদেশের বাউল সম্প্রদায় যারা আবহমানকাল ধরে এই ভূখন্ডকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ করে আসছে, তাদের অবস্থা যেন কীট-পতঙ্গের চেয়েও অধম। হামলা চালানো অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বদলে তাদের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভুক্তভোগীদের হুমকি দিয়ে বলছে যে তারা ঐ স্থানে ঘর করতে পারবে না। এমনকি ক্ষতিপূরণটাও দিতে হবে জেলাপ্রশাসনকে! ছিঃ!
কুষ্টিয়া সদর থানার টাকিমারা গ্রামের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করার নির্দেশ দেয়া হোক। একইসাথে কেন থানার ওসি অভিযুক্তদের পক্ষ নিলেন, তার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হোক। অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে বৃদ্ধার ঘর নতুন করে তৈরি করে দেবার ব্যবস্থা নেয়া হোক। বাংলাদেশ লালন ফকিরসহ হাজারো বাউল ফকির এবং সাধকদের দেশ। বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতির তীর্থভূমি এই ভূখন্ড। এই বাংলাদেশে কখনই উগ্র ধর্মান্ধ পিশাচদের ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি বরদাশত করা হবে না।