18/05/2026
আপনার দৈনন্দিন অভ্যাস কি আপনার ফার্টিলিটি কমিয়ে দিচ্ছে?
জেনে নিন ৫টি সাধারণ ভুল
(একটি মানবিক, বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ আলোচনা)
আমরা অনেকেই ভাবি, সন্তান আসবে তো একদিন “হঠাৎ করেই”। কিন্তু ব্যস্ত এই জীবনে আমরা প্রতিদিন অজান্তেই এমন কিছু কাজ করি, যেগুলো আমাদের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দটাকে নিঃশব্দে পাল্টে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের চোখ দিয়ে দেখলে, বন্ধ্যত্বের পেছনে বড় কোনো রহস্য নয়, বরং আমাদের এই ছোট ছোট দৈনন্দিন ভুলগুলোই বড় ভূমিকা রাখছে। আসুন, দোষারোপ বা ভয় নয়, বরং সচেতনতা দিয়ে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য পাঁচটি সাধারণ ভুল সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলি।
১. “পকেটেই রাখি, কোলে নিয়েই কাজ করি” – তাপমাত্রার অজানা খেলা
অফিস হোক বা বিছানা, ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করা পুরুষদের কাছে খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। কিন্তু অণ্ডকোষের সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন শরীরের তুলনায় একটু কম তাপমাত্রা। লম্বা সময় ধরে ল্যাপটপের তাপ সরাসরি লাগলে শুক্রাণুর উৎপাদন ও গুণগত মান কমে যেতে পারে। একইভাবে, গরম পানিতে অনেকক্ষণ গোসল, সনা বাথ, এমনকি খুব টাইট অন্তর্বাস পরাও ধীরে ধীরে পুরুষের প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে? তীব্র তাপ সরাসরি ডিম্বাণুতে আঘাত না করলেও, শরীরে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার জন্ম দিতে পারে।
২. “রাত জেগে সিরিজ, দিনে ঘুম” – শরীরের ঘড়িকে অবহেলা
জীবন এখন স্ক্রিনকেন্দ্রিক। রাত দুটো পর্যন্ত প্রিয় ওয়েব সিরিজ দেখা, তারপর ভোরবেলা ঘুম—এই অনিয়ম শুধু চোখের নিচে কালি ফেলে না, সরাসরি আঘাত করে আমাদের হরমোন চক্রে। মেলাটোনিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনের নিঃসরণ রাত-দিনের ছন্দের ওপর নির্ভরশীল। ঘুমের ছন্দ বিগড়ে গেলে নারীদেহে ডিম্বস্ফুটন বা ওভ্যুলেশন অনিয়মিত হয়ে পড়ে, পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে এবং শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই মধ্যরাতের ‘আর মাত্র একটা এপিসোড’ অভ্যাসটা ভাবনার বিষয় বটে।
৩. “স্ট্রেস তো আছেই, এটাই তো জীবন!” – মানসিক চাপ যেভাবে শরীরে বাসা বাঁধে
‘স্টেজ ফ্রাইট’ বা পরীক্ষার চাপের মতো আকস্মিক মানসিক চাপে শরীর সাময়িকভাবে সাড়া দেয়, কিন্তু অফিসের রোজকার টেনশন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বা শুধু ‘সবকিছু ঠিকঠাক করতে হবে’—এই দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা শরীরে কর্টিসল নামক হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। টানা উচ্চ মাত্রার কর্টিসল ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কাজকে ধীর করে দেয়, ডিম্বাণু নিঃসরণের সময় এলোমেলো করে দেয়, আর পুরুষের শুক্রাণুর ঘনত্ব ও গতিশীলতা কমিয়ে দেয়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, প্রেগন্যান্সির জন্য যত বেশি চেষ্টা করতে থাকেন, মানসিক চাপ ততই বাড়ে—এ যেন এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়া।
৪. “ডায়েট কোক আর ফাস্ট ফুডে দিন কাটছে” – পাতে কী রাখছেন?
সকালে দোকানের গ্লুকোজ-ভর্তি জুস, দুপুরে ঝাল-তেলে ভাজা প্রসেসড ফুড, রাতে তাড়াতাড়ি সারতে পাউরুটি-চিজ—মুখের স্বাদ মেটালেও শরীর পায় না প্রয়োজনীয় পুষ্টি। ফাস্ট ফুড ও চিনিজাতীয় খাবারে ভরপুর ট্রান্স ফ্যাট এবং হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের দিকে ঠেলে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)-এর মতো সমস্যায়, যা নারী বন্ধ্যত্বের অন্যতম বড় কারণ। অন্যদিকে জিংক, সেলেনিয়াম, ফোলেটের অভাব পুরুষের শুক্রাণু উৎপাদনকেও দুর্বল করে। শুধু মোটা হওয়া নয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রোগা হওয়াও কিন্তু ডিম্বাণু নিঃসরণ বন্ধ করে দিতে পারে।
৫. “ব্যায়াম মানেই তো ভালো, যত বেশি তত ভালো?” – আধিক্যও যে ক্ষতি
শরীরচর্চা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়াম শরীরে বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি ওয়ার্কআউট (যেমন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্ডিও) শরীরে এনার্জি ব্যালান্স এতটাই নেতিবাচক করে তোলে যে মস্তিষ্ক প্রজননতন্ত্রকে ‘বন্ধ করে দেওয়ার’ সংকেত পাঠায়। ফলে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পুরুষেরাও তীব্র ব্যায়ামের ধকল সহ্য করতে গিয়ে শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাময়িক কমিয়ে ফেলতে পারেন। তাই বডি মাস রেট (BMI)-এর মতোই, শারীরিক সক্রিয়তার মাত্রাটাও হতে হবে “বেশি না, কম না”।
অপরাধবোধ নয়, হোক সচেতন পথচলা
এই ভুলগুলো পড়ার পর নিজেকে দোষারোপ করা যাবে না। আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার ফাঁদেই এগুলো জড়িয়ে আছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আজ থেকে ছোট ছোট বদল আনা—হয়তো ল্যাপটপটা টেবিলে রাখা, ঘুমানোর আগে ফোনের আলো থেকে দূরে থাকা, রান্নাঘরে একটু টাটকা শাকসবজি ফেরানো, আর সঙ্গীর সঙ্গে মনখুলে হাসার সময় বের করা। আপনি যদি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সফল না হন, তবে এই অভ্যাসগুলো নিয়েই খোলাখুলি একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শরীর আপনার কথা শোনে, আপনাকেও তার ভাষা বুঝতে হবে—একটু যত্ন আর ধৈর্যের অপেক্ষা মাত্র।