07/09/2026
একজন মানুষ অন্যদের তুলনায় একটু বেশি নারীত্বপূর্ণভাবে কথা বলে, হাঁটে, পোশাক পরে বা নিজেকে প্রকাশ করে—তাহলেই তাকে অপমান করা, “অস্বাভাবিক” বলা কিংবা ধর্মের নামে ঘৃণার লক্ষ্য বানানোর আগে একটি প্রশ্ন করা দরকার:
আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা যে বিষয়টির নিন্দা করছি সেটি সম্পর্কে বিজ্ঞান ও ধর্ম—দুটিই কী বলে?
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও gender-related traits কোনো একক সুইচ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মানুষের মস্তিষ্ক ও আচরণ গড়ে ওঠে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, prenatal biological factors, neurodevelopment এবং পরবর্তী বিকাশের জটিল পারস্পরিক প্রভাবে। তাই কোনো ব্যক্তির স্বভাব বা gender expression অন্যদের মতো নয় বলেই সেটিকে “ইচ্ছা করে বানানো” বা “শিখে নেওয়া” বলে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা দরকার।
Gender expression, gender identity এবং sexual orientation—তিনটি একই বিষয় নয়।
কোনো পুরুষের আচরণ বা প্রকাশভঙ্গি নারীত্বপূর্ণ হলেই তিনি নারী হতে চান—এমন নয়। আবার নারীত্বপূর্ণ আচরণ দেখালেই তিনি সমকামী—এমন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন মানুষের আচরণ দেখে তার যৌন অভিমুখিতা বা gender identity নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
এবার ধর্মীয় আলোচনায় আসা যাক।
ইসলামি সাহিত্যে “মুখান্নাস” (مُخَنَّث) শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। কিন্তু এটিকে সরাসরি আধুনিক transgender, gay বা অন্য কোনো contemporary identity-এর সঙ্গে এক-এক করে মিলিয়ে দেওয়া ইতিহাস ও পরিভাষা—দুই দিক থেকেই সমস্যাজনক।
কিছু classical Islamic discussion-এ এমন পুরুষের কথা আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে নারীত্বপূর্ণ স্বভাব বা আচরণ অনিচ্ছাকৃত/প্রকৃতিগতভাবে ছিল। অন্যদিকে এমন ব্যক্তির কথাও এসেছে, যে ইচ্ছাকৃতভাবে নারীর মতো আচরণ করত বা সেই অবস্থাকে ব্যবহার করে অনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করত।
অর্থাৎ অন্তত একটি মৌলিক প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ:
কোনো আচরণ মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন কি না—এবং সেই আচরণের সঙ্গে প্রতারণা, যৌন শোষণ বা অন্যের ক্ষতি জড়িত কি না—এই বিষয়গুলো কি বিবেচনা করা উচিত নয়?
যদি একজন মানুষ জন্ম থেকেই বা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়, তাহলে সেই বৈশিষ্ট্যের জন্য তাকে অপমান বা নির্যাতন করা নৈতিকভাবে কীভাবে ন্যায্য হয়?
আর সমকামিতা নিয়ে ধর্মীয় শাস্তির আলোচনা করতে গেলে আরও একটি বিষয় বাদ দেওয়া যায় না।
শরিয়াহর classical criminal jurisprudence-এ শাস্তি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয় ছিল না; প্রমাণ, বিচারিক কর্তৃত্ব, নির্দিষ্ট আইনগত কাঠামো এবং কঠোর evidentiary standards-এর প্রশ্ন ছিল। ফলে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে দেখে “এমন মানুষকে শাস্তি দেওয়া উচিত”—এই ধরনের বক্তব্যকে সরাসরি শরিয়াহর বিধান বলে উপস্থাপন করা গুরুতর সরলীকরণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
কোনো মানুষের স্বভাব পছন্দ না হলেই তাকে ঘৃণা করার অধিকার তৈরি হয় না।
আপনি কোনো আচরণকে ধর্মীয়ভাবে ভুল মনে করতে পারেন। কিন্তু সেখান থেকে কাউকে অপমান করা, হেনস্তা করা, মারধর করা বা তার অস্তিত্বকে মানবিক মর্যাদাহীন করে তোলার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।
ধর্মীয় নৈতিকতা যদি সত্যিই ন্যায়, সংযম ও জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়, তাহলে সেই নৈতিকতার প্রয়োগ নিজের আচরণেও হতে হবে।
দুর্বল কাউকে অপমান করা সবচেয়ে সহজ কাজ।
কঠিন কাজ হলো—নিজের রাগ, অহংকার ও পূর্বধারণার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা।
তাই কাউকে “অস্বাভাবিক” বলার আগে অন্তত তিনটি প্রশ্ন করুন—
১. বিজ্ঞান এ বিষয়ে আসলে কী বলে?
২. আমি যে ধর্মীয় বক্তব্য উদ্ধৃত করছি, তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রেক্ষাপট কী?
৩. আমি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চাই, নাকি শুধু আমার অপছন্দের মানুষটির ওপর সামাজিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাই?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর না জেনে ধর্ম ও বিজ্ঞানের নাম ব্যবহার করে অন্য মানুষকে অপমান করা—জ্ঞান নয়, বরং পূর্বধারণাকে যুক্তির পোশাক পরানো।