18/06/2025
ছেলে! একটু খেয়ে নে… দুই দিন ধরে তুই কিছু খাসনি।"
মায়ের অসহায় কণ্ঠস্বর ছেলের কাছে আর্তি জানাচ্ছে।
"দেখ মা, আমি তো বলেছিলাম দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার পরে সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক চাই। বাবা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আজ আমার শেষ পরীক্ষা। তুমি দিদিকে বলে দিও, আমি পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বেরোতেই যেন টাকা নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার বন্ধুর পুরোনো বাইক আজই নিতে হবে। আর হ্যাঁ, যদি দিদি টাকা নিয়ে না আসে, আমি আর বাড়ি ফিরব না।"
এক গরিব পরিবারের একমাত্র ছেলের জেদ এবং অসহায় মায়ের লড়াই যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
"বাবা তোর বাইক কিনে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মাসখানেক আগে একটা দুর্ঘটনা…"
মা কথা শেষ করার আগেই ছেলে বলে ওঠে, "আমি কিছু জানি না… আমার বাইক চাই-ই চাই!"
এ কথা বলে মোহন তার মা-বাবাকে অভাবের গভীরে ফেলে রেখে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
পাঠশালার বিশেষ পরীক্ষা
দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার পর ভাগবত স্যার একটি অনন্য পরীক্ষা নিতেন। তার বিষয় ছিল গণিত, তবে ছাত্রদের জীবনের "গণিত"ও শেখাতেন।
এই বছরের পরীক্ষার বিষয় ছিল “আমার পারিবারিক ভূমিকা”।
মোহন পরীক্ষার হলে ঢুকে প্রথম প্রশ্ন পড়ল।
১. আপনার পরিবারের প্রত্যেকে দিনে কত ঘণ্টা কাজ করেন? বিশদে লিখুন।
মোহন লিখতে শুরু করল।
বাবা সকাল ছ’টা থেকে অটো নিয়ে বের হন এবং রাত ন’টায় ফেরেন। ফ্র্যাকচারের পরও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মোট ১৫ ঘণ্টা।
মা ভোর চারটায় উঠে বাবার টিফিন তৈরি করেন, পরে সেলাইয়ের কাজ করেন। রাতের খাবারের পর বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি শুতে যান। প্রায় ১৬ ঘণ্টা।
দিদি সকালে কলেজে যায়, বিকেলে পার্টটাইম কাজ করে। রাতে মাকে সাহায্য করে। প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা।
আমি সকালে উঠে স্কুলে যাই, দুপুরে খেয়ে ঘুমাই। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করি। রাতে পড়াশোনা করি। প্রায় ১০ ঘণ্টা।
এ উত্তর লিখতে গিয়ে মোহন বুঝতে পারল, তার কাজে অন্যদের তুলনায় অবদান খুব কম।
২. মাসে পরিবারের মোট আয় কত?
উত্তর: বাবার ১০ হাজার টাকা। মা ও দিদির ৫ হাজার। মোট ১৫ হাজার।
৩. আপনার মোবাইল রিচার্জ প্ল্যান, পছন্দের তিনটি সিরিয়ালের নাম এবং শহরের সিনেমা হলের নাম লিখুন।
এ প্রশ্নের উত্তর সহজেই লিখল মোহন।
৪. এক কেজি আলু, ভিন্ডি, চাল, গম এবং তেলের দাম লিখুন। আপনার বাড়ির গম পিষতে যে আটা মিলে যান, তার নাম ও ঠিকানা লিখুন।
মোহন থেমে গেল। সে বুঝল, পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের বিষয়ে তার কোনও ধারণাই নেই।
৫. বাড়িতে কখনও খাবার নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ, আলু ছাড়া অন্য তরকারি হলে আমি রাগ করি এবং খাওয়া ছেড়ে উঠে যাই।
(মোহন মনে পড়ল, মায়ের গ্যাসের কষ্টের কথা, যা সে অবজ্ঞা করত। তার জেদের কারণে পরিবার কতটা কষ্ট পায়, আজ সে বুঝল।)
৬. আপনার পরিবারের প্রতি আপনার সর্বশেষ জেদের কথা লিখুন।
মোহন উত্তর লিখল: "বাইক কেনার জন্য আমি দুই দিন খাওয়া বন্ধ করেছি। বলেছি, টাকা না দিলে বাড়ি ফিরব না।"
---
পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর লিখতে গিয়ে মোহনের চোখ ভিজে গেল। তার মধ্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে লাগল।
১০. এই ছুটিতে কীভাবে পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন?
এ প্রশ্নে তার কলম থেমে গেল। উত্তর না লিখে সে ভাবল, এ প্রশ্নের উত্তর তাকে জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।
বাস্তবের পরীক্ষা
পরীক্ষা শেষে দিদি বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে।
"এই নে, আট হাজার টাকা। মাকে বলেছিস, বাইক না পেলে বাড়ি ফিরবি না। তাই মা-বাবা মিলে টাকা জোগাড় করেছেন।"
মোহন বলল, "কোথা থেকে এই টাকা এলে?"
দিদি উত্তর দিল, "আমার আগাম বেতন, মায়ের সেলাইয়ের কাজ থেকে ধার আর পকেটমানির জমানো টাকা থেকে।"
বন্ধু বাইক নিয়ে হাজির হল। মোহন বাইকের দিকে তাকাল এবং বলল,
"দোস্ত, বাইক অন্যকে দিয়ে দে। এখন আমার দরকার নেই।"
পরিবর্তন
বাড়ি ফিরে মা-বাবাকে বলল, "সরি মা! এখন থেকে বাবা অটো চালাবেন না। আমি চালাব। আর আজ রাতে সবাই মিলে পছন্দের খাবার খাব।"
মায়ের চোখ ভিজে গেল। ভাগবত স্যার বাড়িতে ঢুকে বললেন,
"মোহন, তুমি পরীক্ষায় সবার আগে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ আজ তুমি শিখলে।"
মোহন বলল, "স্যার, এই পাঠ সারা জীবন মনে রাখব।"
এ গল্প জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ বোঝায়। ছেলেমেয়েদের এই গল্প পড়ার সুযোগ দিন, কারণ এটি তাদের জীবনের দায়িত্ব ও সম্পর্কের গুরুত্ব শিখতে সাহায্য করবে। (সংগ্ৰহকৃত)।