12/05/2026
স্মৃতি, সংগ্রাম ও এক অমর আলোর দিশারি অনন্ত বিজয় দাশ
----------------------------
অনন্ত বিজয় দাশ শুধু একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহসী মুক্তচিন্তার প্রতীক, মুক্তবুদ্ধির এক নির্ভীক প্রতিধ্বনি।
আজ ১২ মে, ২০২৬। ২০১৫ সালের এই দিনেই, সকালে নিজের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সিলেট নগরীতে ইসলামি সন্ত্রাসীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হত্যাস্থলটি তাঁর বাসা থেকে খুব দূরে ছিল না। আজ সেই অমানবিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর পূর্ণ হলো।
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি তাঁর চিন্তা, কাজ ও সাহস আজও জীবন্ত এবং ভীষণ প্রাসঙ্গিক।
অনন্ত বিজয় দাশের চিন্তার পথচলা শুরু হয়েছিল কৌতূহল থেকে, অদম্য জানার ইচ্ছা থেকে। তিনি শুধু জানতে চাননি, নিজের চারপাশের জগৎকে গভীরভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন। দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা এবং মানুষের সাংস্কৃতিক ও মনোজগতের পরিবর্তন, সবকিছুই ছিল তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়।
পদার্থবিজ্ঞান তাঁকে শিখিয়েছিল মহাবিশ্বের নিয়ম, আর বিবর্তনতত্ত্ব তাঁকে দেখিয়েছিল জীবনের দীর্ঘ যাত্রা। এই দুই জগতের সংযোগস্থলেই গড়ে উঠেছিল তাঁর চিন্তার ভিত্তি। সেখানে প্রশ্ন ছিল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু, আর যুক্তি ছিল মুক্তির পথের দিশারি।
অনন্ত বিজয় দাশ বিশ্বাস করতেন জ্ঞানের বই পড়ায়, সেই জ্ঞান আত্মস্থ করায় এবং লেখালেখির মাধ্যমে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ায়। তিনি এমন বইয়ের কথা ভাবতেন, যা মানুষের জীবনে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে, চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনবে এবং মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলবে।
এই চিন্তা থেকেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো, যেমন জীববিবর্তন: সাধারণ পাঠ, জীববিবর্তন তত্ত্ব: নানা জিজ্ঞাসা, পার্থিব, ডারউইন: একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব: লিসেঙ্কো অধ্যায়। এই বইগুলো শুধু তথ্য দেয় না, এগুলো চিন্তার খোরাক জোগায় এবং পাঠকের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
তাঁর লেখার বড় শক্তি ছিল গভীরতা ও সহজবোধ্যতা। তিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে বিভিন্ন বয়স ও পটভূমির পাঠক তা বুঝতে পারে। একই সঙ্গে তিনি মানুষের মনে জাগিয়ে তুলেছেন জগত ও জীবনের মৌলিক প্রশ্ন: আমরা কারা, কোথা থেকে এসেছি, ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি কতটা যুক্তিসংগত, বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের চিন্তা ও সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের জন্য এই প্রশ্নগুলো ছিল অপরিহার্য।
অনন্ত বিজয় দাশের চিন্তার সাহস ও সামাজিক ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বৈপ্লবিক চিন্তা-আন্দোলনের প্রতিনিধি।
যুক্তি পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের প্রচার করেছেন। মুক্তমনা ব্লগে লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ। অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তিনি যুক্তির পর যুক্তি তুলে ধরেছেন এবং বিজ্ঞানের দর্শনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তরুণদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে তিনি সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং সমাজের সামনে তার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা বলিষ্ঠ, স্পষ্ট, নির্ভীক এবং দায়িত্বশীল।
২০১৫ সালের ১২ মে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর সিলেটে তাঁকে পেছন দিক থেকে এসে চাপাতির আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি ছিল মুক্তচিন্তার বুকের ভেতর এক গভীর আঘাত। এই আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চার উজ্জ্বল ধারা, আর বাংলাদেশ হারিয়েছিল জ্ঞানের আলোর এক সূর্যসন্তানকে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন জ্ঞানসাধক ও মানবিক মানুষের মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল মুক্তচিন্তা, যুক্তি ও বিজ্ঞানের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করার এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মুক্তচিন্তাকে হত্যা করা যায় না। একজন মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহস ও আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বরং তা আরও বহুগুণ শক্তি নিয়ে মানুষের মনে ফিরে আসে।
আজ ১১ বছর পরও অনন্ত বিজয় দাশ আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন তাঁর একনিষ্ঠ কাজ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং অসামান্য সাহসের জন্য। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর প্রতিটি বইয়ের পাতায়, প্রতিটি যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনায় এবং প্রতিটি তরুণের প্রশ্ন করার সাহসে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কোনো কিছু অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নয়; নিজের বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করা, প্রশ্ন করা এবং সত্যকে বোঝার চেষ্টা করাই মানুষের মর্যাদার পথ।
শেষ কথা, একজন মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চিন্তাশক্তি ও ক্ষুরধার বৈজ্ঞানিক চেতনার ধারণাকে হত্যা করা যায় না। অনন্ত বিজয় দাশ আমাদের শিখিয়ে গেছেন প্রশ্ন করতে, যুক্তি খুঁজতে এবং সত্যের পাশে দাঁড়াতে। তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর পরও তাঁর আলো নিভে যায়নি; বরং তা আরও বিস্তৃত হয়েছে, আরও গভীরে পৌঁছেছে বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক ও মনোজগতে।
আজ এই বেদনাদায়ক দিনে অনন্ত বিজয় দাশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি রইল।
অনন্ত বিজয় দাশ, তুমি আছো, থাকবে মানুষের জীবনে অনন্তকাল।
--------------------------
লিখেছেন: বকশালিক