01/05/2026
যাদের আমরা প্রতিদিন ভুলে যাই
আজ ১লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস— যাদের শ্রমে আমাদের প্রতিদিনের জীবন চলে, তাদের কথা স্মরণ করার দিন।
শহরের ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা যখন নিজের লক্ষ্য নিয়ে ছুটে চলি, তখন একদল মানুষ নিঃশব্দে আমাদের পথ চলা সহজ করে দেন।
তারা কোনো কর্পোরেট মিটিংয়ে থাকেন না, কিংবা সংবাদপত্রের শিরোনামেও আসেন না।
তবুও অফিসের পিয়ন, ডেলিভারি বয়, লিফটম্যান কিংবা সিকিউরিটি গার্ড—এই মানুষগুলোর উপস্থিতি ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল।
তারা যেন অন্ধকার ঘরের সেই প্রদীপ, যারা নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেন।
আমরা কি কখনো তাদের দিকে একটু মানবিক চোখে তাকিয়েছি, খোঁজ নিয়েছি তাদের? এই মে দিবসে আজ কথা হোক তাদের নিয়ে; বিশেষ করে, যখন আমরা শ্রমের মর্যাদা নিয়ে কথা বলি তখন তাদের কথা না বললেই নয়
আজকের দিনে আসুন আমরা সেই মানুষগুলোর দিকে একটু আলাদা করে তাকাই—
১. অফিসের পিয়ন:
অফিস খোলার আগেই যার দিন শুরু হয়। ধুলোবালি পরিষ্কার, ফাইল গোছানো থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব কাজে তিনি যুক্ত থাকেন। যিনি সবার চা-চিনির হিসাব জানেন, কিন্তু তার নিজের খোঁজ আমরা কতটা রাখি?
২. ডেলিভারি বয়:
রোদ, বৃষ্টি, রাত—সব উপেক্ষা করে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা মানুষটি আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজন পূরণ করেন। আমরা সময় নিয়ে অভিযোগ করি, কিন্তু তার দৌড়ের গল্পটা কখনো ভাবি না।
৩. লিফটম্যান:
একটি ছোট ঘরের ভেতর সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাসের খবরও সবসময় পান না। তবুও তার কাজ ছাড়া বহুতল ভবনের জীবন থেমে যায়।
৪. সিকিউরিটি গার্ড:
রাতের শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তিনি জেগে থাকেন। মশার কামড়, ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতার মাঝেও তিনি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, অথচ তার ক্লান্তি আমরা খুব কমই দেখি।
৫. পরিচ্ছন্নতা কর্মী:
আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখার পেছনে সবচেয়ে বেশি শ্রম দেন তিনি। অথচ অনেক সময় তার পাশ দিয়েই আমরা অযত্নে মুখ ফিরিয়ে চলি।
৬. নির্মাণ শ্রমিক:
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা শহরের দালান গড়ে তোলেন, তাদের নিজের মাথার ওপরই অনেক সময় স্থায়ী ছাদ থাকে না। নতুন ভবনের সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু তাদের ঘামের গল্প ভুলে যাই।
৭. বাসের হেল্পার:
চলন্ত বাসে সারাদিন যাত্রী ডাকাডাকি, ওঠানামা সামলানো—তার কাজের শেষ নেই। দিনের শেষে তার সব কিছুর হিসাব সীমিত কয়েকটা টাকার মধ্যেই থেমে যায়।
৮. গার্মেন্টস কর্মী:
রাত জেগে মেশিনের শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে যারা পোশাক তৈরি করেন, তাদের শ্রমেই আমাদের পোশাক তৈরি হয়। অথচ নিজের জন্য একটু ভালো পোশাক কেনাও অনেক সময় তাদের জন্য কঠিন।
৯. রিকশাচালক:
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্যাডেল ঘুরিয়ে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। ভাড়ার দরদাম করতে গিয়ে আমরা তার ক্লান্ত শরীরের কথা ভুলে যাই।
কেন আমরা তাদের খেয়াল করি না?
মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমের মর্যাদা, কিন্তু বাস্তবে আমরা কি সেই শিক্ষা ধারণ করি?
আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যেখানে আমরা সেবা নিই, কিন্তু সেবাদাতাকে মানুষ হিসেবে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলি নি।
তাই আমাদের করণীয়—
১. ন্যায্য পারিশ্রমিক দিন অযথা দরাদরি না করে প্রাপ্য সম্মানী দিন।
২. ভদ্র ভাষা ও সম্মান বজায় রাখুন।
৩. ধৈর্য ধরুন; দেরি বা সমস্যা হলে শান্ত থাকুন।
৪. সময়ের মূল্য দিন অপ্রয়োজনে দেরি করাবেন না।
৫. পরিষ্কার নির্দেশনা দিন কাজ সহজ ও ভুলমুক্ত হয়।
৬. মানবিক সহায়তা করুন ছোট সাহায্যও বড় পার্থক্য গড়ে।
৭. কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
৮. ভুল হলে ক্ষমাশীল হন।
৯. ভালো কাজের প্রশংসা করুন।
১০. সবার সাথে সমানভাবে আচরণ করুন।
১১. সন্তানদের তাদের সম্মান করতে শেখান।
১২. সমস্যায় পাশে থাকুন।
আমাদের সমাজটা আসলে একটা বিশাল ঘড়ির মতো, যেখানে প্রতিটি ছোট-বড় অংশ সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই মানুষগুলো সেই অদৃশ্য গিয়ার,
যাদের ছাড়া পুরো ব্যবস্থাই থেমে যাবে।
একটু মানবিকতা, একটু সম্মান—এই ছোট পরিবর্তনই তাদের জীবনে বড় আলো হয়ে ফিরতে পারে।
প্রতিজ্ঞা হোক— শ্রমের মর্যাদা শুধু এক দিনের নয়, হোক প্রতিটি দিনের চর্চা।