22/05/2025
গড়পড়তায় বাঙালির প্রশংসা কিংবা নিন্দার কোনটাকেই খুব একটা গুরুত্ব দেয়া উচিৎ না। ওসবের সার কিছু নেই, সস্তা, ফালতু।
বাঙালি যখন প্রশংসা করে, তা করে না বুঝেই করে। আবার যখন নিন্দা করে, তাও করে না বুঝে। তার এই মনোভাব যেন গা-ভাসানো হুজুগে অংশ নেওয়ার মতো— কেউ প্রশংসা করেছে, টেলিভিশনে দেখিয়েছে, পত্রিকায় লিখেছে, তাই তাকেও করতে হবে, বলতে হবে— এই তো তার বিচারবোধ। এর পরিমাণ বাড়ায়/কমায় হয়তো তার নিজের হিংসা, আক্রোশ, কিংবা স্বার্থ দিয়ে গুন করে। নিজে চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে কিছুর মূল্যায়ন করা তার স্বভাবে নেই, মুরোদও নাই।
বাঙালি পড়ার গুরুত্ব বোঝে না। শিক্ষিত কাকে বলে জানে না। সুগঠিত মন ও মনন চেনে না। অক্ষর চিনে পড়তে পারা বা মুখস্থ করে ডিগ্রি নেয়া লোককে সে শিক্ষিত ভাবে। মুখস্থ তোতাপাখিকে জ্ঞানী ভাবে। বই প্রকাশ হওয়া মাত্রই লেখক ভাবে। অথচ লেখার চেয়েও পড়ার কাজটি যে অনেক বেশি কষ্টসাধ্য— এটা সে অনুধাবনই করতে পারে না।
এই জাতি এমনকি বাংলা ভাষার সবচেয়ে উজ্জ্বল বাতিঘরদেরও গালি দেয়, তুচ্ছ করে — কেবল আক্রোশ থেকে। রবীন্দ্রনাথের যুগে তাকে যারা গালি দিয়েছিল, সেই অধ্যাপকরা আজ বিস্মৃত; নজরুলকে কাফের বলা মৌলবিরা কবরে বিলীন; রোকেয়ার বিরুদ্ধে বিষ ছড়ানো শকুনেরা আজও শকুনই রয়ে গেছে— ঈগল হয়ে উঠতে পারেনি।
রবীন্দ্রনাথ নিজে রবীন্দ্রনাথ হতে পেরেছিলেন কারণ বাঙালির প্রশংসা বা নিন্দানকে তিনি শেষ পর্যন্ত সিরিয়াসলি নেননি।
লেখাপড়ায়, শিক্ষায়, ভাবনায়, চিন্তায়, প্রজ্ঞায়, জ্ঞানে আমরা অত্যন্ত গরিব ও ছোটলোক। আমাদের দেশের লেখক ও বুদ্ধিজীবীরাও আমাদের মতই গরিব ও দুর্বল। তারাও অন্যের পাশাপাশি নিজের মূল্যায়ন করতে জানেন না। তারা চেয়ে থাকে পত্রিকার স্বীকৃতি, টেলিভিশনের দৃষ্টি, মন্ত্রীর প্রশ্রয় কিংবা জনস্রোতের বাহবা— সহমতভোগী ছাগলের দলে। এটি এক অদ্ভুত রকমের দারিদ্র্য— ‘আ ভেরি ইউনিক পোভার্টি’।
শরীরের বা ঘরের গরিবি হয়তো টাকায় ঘোচানো সম্ভব, অপুষ্ট শরীরও পুষ্ট হতে পারে খাবার খেয়ে, কিন্তু আত্মার এই গরিবি— একে দূর করবে কী দিয়ে?