19/02/2026
।।সময়ের বাইরে দুজন মানুষ।।
ড. রাধেশ্যাম সরকার
অবসরের পর থেকেই ফজলুর রহমান কিরনের দিনগুলো যেন একঅনন্ত দুপুরে থমকে গেছে। সকালের সূর্য ওঠে, পাখিরা ডাকাডাকিকরে, পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খোলে বন্ধ হয় যেন সব কিছু আগেরমতোই চলে, শুধু তিনি আর সেই প্রবাহের অংশ নন। এক সময়অফিসের ব্যস্ততা, মিটিং, ফাইল, ফোন কল, সহকর্মীদের কোলাহলসব মিলিয়ে জীবন ছিল সময়ের সাথে দৌড়ের মতো। এখন সময়অনেক, অথচ সেই সময় যেন তাঁর নয়।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জানালার পাশে বসে থাকেন। রাস্তায়মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, কেউ কাজে যাচ্ছে, কেউ ফিরে আসছে।সবাই ব্যস্ত, কেবল তিনিই নিস্তব্ধ। কোলে একটা পুরোনো ম্যাগাজিনরাখা, পাতাগুলো নড়ছে না, শুধু তাঁর আঙুলের ফাঁকে আলগা হয়েআছে।
স্ত্রী শরিফা বেগম সংসারে নিজস্ব ছন্দে ব্যস্ত। সব কাজ করেন, কারোসাহায্য লাগে না। কথাবার্তা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তবু তাঁরমুখে একটা নীরব ক্লান্তি লেগে আছে, যা সহজে চোখে পড়ে না কিন্তুঅনুভব করা যায়।
তিনি রান্নাঘর থেকে ডেকে বললেন,
— কী গো, এইভাবে চুপ করে বসে আছো যে!
কিরন সাহেব মাথা না তুলে বললেন,
— কী আর করব! করার কিছুই তো নেই।
শরিফা একটু হেসে বললেন,
— সত্যিই তো, কিইবা করবে? এই একটু টিভি দেখতে পারো, সিরিয়াল, নিউজ, গান, সিনেমা... সময় কাটবে।
— দূর, ভালো লাগে না। আজেবাজে সিরিয়াল! জীবনের সঙ্গে কোনোমিল নেই। আর গান? আমাদের সময়ের গান কেউ আর গায় না। সবকেমন কৃত্রিম, যান্ত্রিক।
— সেটাও ঠিক বলেছো। আচ্ছা, তাহলে কিছু খাবে? আলুর চপদেবো? চা, কফি, না কি বাদাম চানাচুর?
কিরন সাহেবের সবই খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু শরীরের বয়স আরঅনুমতি দেয় না। কিছু খেলেই হজমের ঝামেলা। আমতা আমতাকরে বললেন,�— ভয় হয়, হজম না হলে আবার সারারাত গ্যাস্ট্রিকের যন্ত্রণা!
— তাহলে এসো, দুজনে বাইরে হেঁটে আসি। একটু হাওয়া খেলেমনটাও ফুরফুরে হবে।
— আজ পায়ের ব্যথাটা একটু বেড়েছে। শরীরে আর তেমন শক্তিওনেই।
শরিফা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ হেসে বললেন,
— বেশ, তাহলে এসো দুজনে ঝগড়া করি!
কিরন সাহেব তাকিয়ে বললেন,
— ঝগড়া? কী নিয়ে ঝগড়া করব? কোনো কিছুর অভাব আছে নাকি!
তারপর দুজনেই হেসে উঠলেন। কিরন সাহেব বললেন,
— দেখো, লক্ষ কথার এক কথা, অভাব নেই। আগে কত কিছুইচাইতে তুমি; শাড়ি, গয়না, ছেলেমেয়ের জামা... আমি এনে দিতেপারতাম না, আর তুমি অভিমান করতে। এখন আর কিছুই চাও না, তাই ঝগড়াও হয় না। অভাবটা চলে গেছে, তাই জীবনে মজা নেই।
শরিফা মৃদু হেসে লম্বা শ্বাস নিলেন,
— সত্যিই, কী ছেলেমানুষীটাই না করতাম আমি! সামান্য শাড়িনিয়েও মান-অভিমান। ছেলেমেয়ে ছোট ছিল, সংসারে টানাপোড়েন, সবকিছু নিয়েই ঝগড়া হতো। এখন ওরা মানুষ হয়েছে, আমরা বুড়োহয়েছি, সংসার শান্ত।
— শান্তই বটে, তবে একটু বেশি শান্ত। মনে হয়, নীরবতার ভেতরেইবয়সের ভারটা টের পাই।
দুজনেই চুপ করে গেলেন। ঘরের ঘড়িতে টিকটিক শব্দ। বাইরে আলোধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে। শরিফা দৃষ্টি স্থির করে জানালার বাইরে তাকিয়েবললেন,�— তাহলে যাও, একটু ঘুমিয়ে নাও। পুঁটলি হয়ে বসে থেকো নাসারাক্ষণ।
— কত ঘুমাবো? এখন তো ঘুমও আসে না। রাতেও আধো ঘুমেকাটে।
— আচ্ছা, আজ বাবুর ফোন এল? আর মাম এর?
— না, এখনো আসেনি। কী জানি! ওদের ওখানে এখন কটা বাজে কেজানে! এখানে তো সন্ধ্যে ছ’টা বাজতে চলল।
— ওদের তো এখন সকাল। সকালবেলা সবাই ব্যস্ত থাকে, কাজেবেরোয়। ফোন করার সময় কোথায়?
— হুঁ, মিছে চিন্তা করে লাভ নেই। সময় পেলে ঠিকই ফোন করবে। ওরানিজের জায়গায় ভালো আছে, এটাই তো চাই।
শরিফা একটু থেমে বললেন,
— ঠিক বলেছো। তবু না, কখনো কখনো খুব শুনতে ইচ্ছে করে ওদেরকণ্ঠস্বরটা। যেন মনে হয়, ঘরটা আবার ভরে উঠল হাসিতে।
— জানি, আমারও তাই লাগে। কিন্তু সময় বদলায়, জীবনও বদলায়।
— আচ্ছা, তুমি চা খাবে?
— না, বিকেলে বারেকের দোকানে এক কাপ খেয়েছি। আচ্ছা, তোমারমনে আছে, কত কষ্ট করে ওদের মানুষ করেছি?
শরিফা কাছে এসে তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন।
— মনে থাকবে না কেন? তবে ওটাই তো আমাদের কর্তব্য ছিল গো।মানুষ না হলে কি আমাদের এই শান্তি মিলত?
কিরন সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
— ঠিক বলেছো। একজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার, মানুষের মতোমানুষ হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি একটু কম পড়ত, একটুবেশি মানবিক হতো, তাহলে হয়তো আমাদের পাশে থাকত!
শরিফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— দ্যাখো, স্বার্থপরের মতো কথা বলো না। আজকাল যারাবাবা-মাকে সঙ্গে রাখে, তারাও কি সুখে থাকে? সংসারে শান্তি থাকেক’জনের? আমি ভাবি, ওরা সুখে থাকলেই তো ভালো। তবু... কখনোকখনো মনে হয়, যদি পাশে থাকত, এক কাপ চা হাতে বসে গল্পকরত...
কথা শেষ হবার আগেই তাঁর চোখ ভিজে উঠল। কিরন সাহেব হাতবাড়িয়ে শরিফার হাত ধরলেন, ধীরে টেনে নিলেন পাশে।
— এই যে, আবার কান্না! আরে, আমি তো আছি নাকি? আমরাএকসাথে আছি, এই তো সবচেয়ে বড় সুখ। আর ওরা, যেখানেই থাক, আমাদের কথা নিশ্চয়ই মনে রেখেছে।
শরিফা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
— আচ্ছা, তুমি বসো, আমি চা করে আনছি।
— না না, দরকার নেই। এখানেই থাকো। চা পরে হবে। এসো, একটুকাছে বসো।
— কী হয়েছে তোমার আজ? শরীর খারাপ নাকি?
— না গো, শরীর ভালোই আছে। শুধু একটু বলতে ইচ্ছে করছে—শেষ সময়ে এভাবে পাশে থাকবে তো?
শরিফা হেসে তাঁর হাত চেপে ধরলেন,
— বোকা মানুষ! পাশে ছাড়া আর যাব কোথায় বলো!
কিরন সাহেবের কণ্ঠ মৃদু হয়ে এলো। চোখে আলো-ছায়ার খেলা। ধীরেধীরে গুনগুন করে গাইতে লাগলেন—
“যে মাধবী তলে দাঁড়ায়ে প্রথম বলেছিলে ভালোবাসি,
আজো সে লতায় ফুল ফোটে হায়,
এমনই বাজে গো বাঁশি... এমনই বাজে গো বাঁশি।”
গানটা শেষ হতেই ঘরে যেন এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাইরেসন্ধ্যার আলো নিভে গেছে, কিন্তু জানালার ওপারে আকাশে দেখাদিয়েছে এক টুকরো চাঁদ দুজন মানুষের জীবনের মতোই নরম, শান্ত, তবু অদ্ভুত উজ্জ্বল।