13/04/2026
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লা।
কিছু লেখা কিছু কাহিনি মনকে নাড়া দেয়।
আমি একটি বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ সেই বাড়ির ভেতর থেকে একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। শিশুটির কণ্ঠে এতটা কষ্ট ছিল যে, ভেতরে গিয়ে কেন সে কাঁদছে তা জানার জন্য নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
ভেতরে গিয়ে দেখলাম, এক মা তার দশ বছরের ছেলেকে আস্তে আস্তে মারছে এবং নিজেও তার সঙ্গে কাঁদছে। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপা, আপনি এই ছোট্ট বাচ্চাটিকে কেন মারছেন, যখন আপনি নিজেও কাঁদছেন?”
তিনি উত্তর দিলেন, “ভাই সাহেব, এর বাবা মারা গেছেন এবং আমরা খুবই গরিব। উনার চলে যাওয়ার পর আমি লোকের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে সংসার ও এর পড়াশোনার খরচ চালাই। আর এই হতভাগা প্রতিদিন স্কুলে দেরিতে যায় এবং প্রতিদিনই দেরিতে বাড়ি ফেরে।
পথে কোথাও খেলাধুলায় মেতে ওঠে, পড়াশোনার দিকে একটুও মন দেয় না। যার কারণে প্রতিদিন তার স্কুলের ইউনিফর্ম নোংরা করে ফেলে।”
আমি কোনোভাবে মা ও ছেলেকে একটু বুঝিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।
এই ঘটনার কয়েক দিন পর, একদিন সকালে আমি সবজি বাজারে গেলাম। হঠাৎ আমার নজর সেই দশ বছরের ছেলেটির ওপর পড়ল, যে প্রতিদিন বাড়িতে মার খেত। আমি দেখলাম, সে বাজারে ঘুরছে এবং দোকানিরা যখন তাদের দোকানের জন্য সবজি কিনে বস্তায় ভরছিল, তখন কিছু সবজি মাটিতে পড়ে গেলে সে সেগুলো দ্রুত কুড়িয়ে নিজের ঝোলায় ভরে নিচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম ব্যাপারটা কী। আমি চুপিচুপি ছেলেটির পিছু নিলাম। যখন তার ঝোলা সবজিতে ভরে গেল, তখন সে রাস্তার পাশে বসে জোরে জোরে ডেকে সেই সবজি বিক্রি করতে লাগল। মুখে ময়লা, নোংরা ইউনিফর্ম আর চোখে পানি—এমন একজন দোকানদার জীবনে প্রথম দেখলাম।
হঠাৎ এক দোকানি, যার দোকানের সামনে সে বসেছিল, উঠে এসে জোরে লাথি মেরে তার ছোট্ট দোকানটি ছড়িয়ে দিল এবং ছেলেটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
ছেলেটি চোখে পানি নিয়ে চুপচাপ আবার সবজি কুড়াতে লাগল এবং কিছুক্ষণ পর অন্য একটি দোকানের সামনে ভয়ে ভয়ে বসে পড়ল। সৌভাগ্যবশত, সেই দোকানি তাকে কিছু বলল না।
অল্প সবজি ছিল, তাও অন্যদের তুলনায় কম দামে। তাই দ্রুত বিক্রি হয়ে গেল। এরপর ছেলেটি উঠে একটি কাপড়ের দোকানে গেল, দোকানদারকে টাকা দিয়ে তার স্কুল ব্যাগটি নিয়ে নিল এবং কিছু না বলেই স্কুলের দিকে রওনা দিল। আমিও তার পিছু নিলাম।
পথে সে মুখ ধুয়ে স্কুলে ঢুকল। তখন সে এক ঘণ্টা দেরি করে ফেলেছিল। তার শিক্ষক তাকে লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করলেন। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে বললাম, “একে মারবেন না, সে তো ছোট্ট শিশু।”
শিক্ষক বললেন, “এ প্রতিদিনই দেড় ঘণ্টা দেরিতে আসে। আমি প্রতিদিনই শাস্তি দিই, যাতে ভয়ে সময়মতো আসে। অনেকবার তার বাড়িতেও খবর পাঠিয়েছি।”
যাই হোক, মার খাওয়ার পর সে ক্লাসে বসে পড়তে লাগল। আমি শিক্ষকের মোবাইল নম্বর নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়িতে এসে বুঝলাম, যে কাজের জন্য বাজারে গিয়েছিলাম, তা তো ভুলেই গেছি। সেই নিরীহ শিশুটি বাড়ি গিয়ে আবার মায়ের কাছে মার খেল। সারারাত আমার মাথা ঘুরতে লাগল।
পরদিন সকালে আমি শিক্ষকের কাছে ফোন করে বললাম, “যে করেই হোক আজ বাজারে আসবেন।” তিনি রাজি হলেন।
সকাল হলো, ছেলেটির স্কুলে যাওয়ার সময় হলো, কিন্তু সে সোজা বাজারে তার ছোট্ট দোকানের ব্যবস্থা করতে গেল। আমি তার বাড়িতে গিয়ে মাকে বললাম, “আপা, আপনি আমার সঙ্গে চলুন, আমি আপনাকে দেখাব আপনার ছেলে কেন স্কুলে দেরি করে।”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে রেগে বলতে বলতে আমার সঙ্গে চললেন, “আজ ওকে ছেড়ে দেব না।”
বাজারে শিক্ষকও এসে গিয়েছিলেন। আমরা তিনজন তিন জায়গায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে দেখতে লাগলাম। আজও সে অনেকের বকুনি আর ধাক্কা খেল, তারপর সবজি বিক্রি করে কাপড়ের দোকানের দিকে গেল।
হঠাৎ দেখলাম, তার মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আমি শিক্ষকের দিকে তাকালাম, তিনিও কাঁদছেন। মনে হচ্ছিল, তারা যেন বুঝতে পেরেছেন, তারা একটি নিরীহ শিশুর উপর কতটা অন্যায় করেছেন।
মা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে গেলেন, শিক্ষকও কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে ফিরে গেলেন। ছেলেটি দোকানদারকে টাকা দিল, আর দোকানদার তাকে একটি লেডিস স্যুট দিয়ে বললেন, “বাবা, আজ পুরো টাকা হয়ে গেছে, এটা নিয়ে যাও।”
ছেলেটি সেটি ব্যাগে রেখে স্কুলে গেল।
আজও সে এক ঘণ্টা দেরি করেছিল। সে সরাসরি শিক্ষকের কাছে গিয়ে ব্যাগ রেখে হাত বাড়িয়ে দাঁড়াল—যেন মার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
শিক্ষক উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে এত জোরে কাঁদতে লাগলেন যে, আমিও নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই ব্যাগের স্যুটটা কার জন্য?”
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার মা ধনীদের বাড়িতে কাজ করে। তার কাপড় ছেঁড়া, ভালো কোনো জামা নেই। তাই আমি তার জন্য এটা কিনেছি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আজই কি এটা মাকে দেবে?”
তার উত্তরে যেন আমাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে বলল, “না, ছুটির পর দর্জির কাছে সেলাই করতে দেব। প্রতিদিন কাজ করে একটু একটু করে সেলাইয়ের টাকাও জমিয়েছি।”
আমরা দু’জনই কাঁদতে লাগলাম, ভাবতে লাগলাম—আমাদের সমাজে দরিদ্র আর বিধবাদের সঙ্গে আর কতদিন এমন হবে? তাদের সন্তানরা কি এভাবেই বঞ্চিত থাকবে?
ঈশ্বরের আনন্দে কি এদের কোনো অধিকার নেই? আমরা কি আমাদের আনন্দের সময় থেকে কিছুটা অর্থ বের করে সমাজের অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে পারি না?
আপনারাও একবার ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখুন।
আর হ্যাঁ, যদি চোখে পানি এসে থাকে, তবে তা আটকাবেন না…
সম্ভব হলে এই লেখাটি সকল সামর্থ্যবান মানুষের কাছে পৌঁছে দিন, যাতে তাদের হৃদয়ে গরিবদের প্রতি সহানুভূতি জাগে, এবং এই ছোট প্রচেষ্টা কোনো দরিদ্র পরিবারের হাসির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
— সংগৃহীত