29/09/2026
ইসলামী ব্যাংকের সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষক নিয়োগ ও আর্থিক সুশাসন: ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অডিট রিপোর্ট পুনঃবিবেচনার যৌক্তিকতা
বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদন | অর্থ ও ব্যাংকিং বিভাগ
ঢাকা:
দেশের সর্ববৃহৎ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBL)-এর যৌথ সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষক (Joint Statutory Auditors) হিসেবে ‘এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস’ এবং ‘মাহফেল হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস’—এর স্থান পাওয়ার বিষয়টি ব্যাংক খাত ও আর্থিক বিশেষজ্ঞমহলে ব্যাপক পর্যালোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের অন্যতম পুরোনো দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, অতীতে পুঁজিবাজার ও কর্পোরেট খাতের বিভিন্ন নিরীক্ষাকাজে তাদের মানদণ্ডগত বিচ্যুতি, আন্তর্জাতিক অডিটিং স্ট্যান্ডার্ড (ISA) লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরোপিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ইতিহাস এই নিয়োগকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
দুই ফার্মের অতীত পারফরম্যান্স ও পেশাগত বিচ্যুতির বিস্তারিত চিত্র
ব্যাংকিং খাতের স্থায়িত্ব ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তবে ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর বিশেষ পর্যালোচনায় দুটি ফার্মের অতীত কার্যক্রমের যেসব বড় ধরনের পেশাগত বিচ্যুতি উঠে এসেছে:
১. মাহফেল হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস:
* নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষেধাজ্ঞা (BSEC Ban): পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান 'রিং শাইন টেক্সটাইল'-এর আইপিও (IPO) ও ২০১৮ সালের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষায় গুরুতর অনিয়ম, মূলধনের অসঙ্গতি না ধরা এবং পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অডিট রিপোর্ট তৈরির অপরাধে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (BSEC) এই ফার্মটিকে ৩ বছরের জন্য পুঁজিবাজারের অডিট প্যানেল থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
* বিভাগীয় শাস্তি ও সিএ লাইসেন্স স্থগিত: সংস্থাটির সাবেক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অডিট পার্টনারদের বিরুদ্ধে আইসিএবি (ICAB) কর্তৃক পেশাগত অসদাচরণের (Professional Misconduct) অভিযোগে জরিমানা এবং নিরীক্ষা অনুশীলনের সনদ (Practice Certificate) স্থগিত/বাতিল করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
* ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স বিতর্ক: কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে কোটি কোটি টাকার তহবিল তছরুপ ও নজিরবিহীন অনিয়মের বিষয়গুলো ঢাকা পড়া এবং ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে অডিট কার্যক্রম শেষ করার প্রেক্ষিতে BSEC ফার্মটির দায়িত্বপ্রাপ্ত অডিটরদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
২. এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস:
* দুর্বল ওয়ার্কিং পেপার ও তদারকির অভাব: আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ড (ISA) অনুযায়ী পর্যাপ্ত অডিট নথিপত্র বা 'ওয়ার্কিং পেপারস' সংরক্ষণ না করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করার বিষয়ে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC) এবং BSEC-এর নজরে আসে ফার্মটি।
* অনিয়ম চিহ্নিত করতে না পারা: একাধিক পুঁজিবাজারভিত্তিক কোম্পানির খেলাপি ঋণ, লোকসান ও মূলধনী গরমিল থাকা সত্ত্বেও 'Qualified Opinion' বা উপযুক্ত সতর্কবার্তা না দিয়ে অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করার অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে পরবর্তীতে ব্যাংক বা কোম্পানির প্রকৃত চিত্র সামনে এলে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডাররা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স মনে করে, অতীতে যেসব অডিট ফার্মের বিরুদ্ধে মূল আর্থিক চিত্র আড়াল করার বা দুর্বল অডিট তদারকির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের হাতে ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রকাণ্ড প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষাভার ন্যস্ত করায় আমানতকারীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে।
৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতা ও অডিট রিপোর্ট পুনঃবিবেচনার যৌক্তিকতা
ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেখানে অতীতে প্রকাশিত অডিট রিপোর্টগুলোর বস্তুনিষ্ঠতা পুনঃমূল্যায়ন করা এখন প্রধান দাবি।
১. প্রকৃত আর্থিক চিত্র উন্মোচন ও অতীত অডিটের নির্ভরযোগ্যতা:
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদ ও গঠিত বিভিন্ন বিশেষ তদন্ত কমিটির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ব্যাংকটিতে পূর্বে বিতরণকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার বেনামী ঋণ ও মূলধনী ঘাটতির নজির সামনে আসতে শুরু করেছে। ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স মনে করে, বিগত বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত ঋণ থাকা সত্ত্বেও তা অডিট রিপোর্টে সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হওয়া প্রমাণ করে তৎকালীন অডিট রিপোর্টগুলো নিরপেক্ষ ছিল না।
২. 'ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার ভিউ' নিশ্চিতকরণ ও পুনঃনিরীক্ষা (Re-audit):
ব্যাংকের আয়ের প্রকৃত হিসাব, খেলাপী ঋণের সঠিক শ্রেণীকরণ এবং প্রবিশন (Provision) ঘাটতি ঢাকা পড়েছিল কিনা—তা নির্ধারণে অতীতের অডিট রিপোর্টসমূহ এবং বর্তমান নিরীক্ষকদের পর্যালোচনাকে ফরেনসিক রি-অডিটের (Forensic Re-audit) আওতায় আনা যুক্তিসঙ্গত।
৩. পেশাগত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার:
অতীতের বিশেষ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের মুখে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল কিনা, তা বিচারে নতুন বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে একটি স্বাধীন অডিট রিভিউ প্রয়োজন বলে ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ট্রাস্ট-রেটিং ও ভবিষ্যৎ করণীয়
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদার ও বৈশ্বিক রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছে ইসলামী ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর অনুসন্ধানী দল মনে করে, ব্যাংকটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং বিদেশি ব্যাংকের সাথে ঋণপত্র (L/C) নিষ্পত্তিতে আস্থার সংকট দূর করতে অডিট প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স-এর বিশেষ দিকনির্দেশনামূলক সুপারিশ:
* এফআরসি (FRC)-এর বিশেষ নজরদারি: যৌথ নিরীক্ষকদ্বয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রতিটি অডিট ওয়ার্কিং পেপারস ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC) কর্তৃক কঠোর 'কোয়ালিটি কন্ট্রোল রিভিউ' (QCR)-এর আওতায় আনা।
* বিশেষ ফরেনসিক অডিট (Special Forensic Audit): বিগত বছরগুলোর বিতরণকৃত ঋণ ও মূলধনের প্রকৃত হিসাব নিরূপণে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরপেক্ষ কোনো তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে ফরেনসিক নিরীক্ষা পরিচালনা করা।
* নিয়ন্ত্রক সংস্থার যৌথ মনিটরিং: সেন্ট্রাল ব্যাংক, এফআরসি এবং বিএসইসি কর্তৃক সমন্বিতভাবে ব্যাংকের অডিট কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
উপসংহার
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকার্স অ্যালায়েন্স মনে করে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীর নিরপেক্ষতা রক্ষায় বর্তমান অডিট ফার্মগুলোর কাজ যেমন নিবিড় তদারকিতে রাখা প্রয়োজন, তেমনই ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন আর্থিক বাস্তবতায় অতীত অডিট রিপোর্টগুলোর পুনঃবিবেচনা করা কর্পোরেট সুশাসনের জন্য অত্যন্ত জরুরী।