08/06/2026
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে গভীর নিস্তব্ধতা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা আর শিক্ষার অপ্রতুল সুযোগ, সব মিলিয়ে এখানকার জীবন যেন বাংলাদেশের অন্য যে কোন অঞ্চল থেকে অনেকটাই আলাদা। সেই প্রতিকূলতার মাঝেই এক তরুণের স্বপ্ন পূরনের মধ্য দিয়ে অসংখ্য শিশু পাচ্ছে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ। ম্রো জনগোষ্ঠীর সন্তান উথোয়াইহাই। যে বয়সে অন্য সকলে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে, সে বয়সেই তিনি ভাবতে শুরু করেন নিজের জনগোষ্ঠীর শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন, শিক্ষার অভাবে কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ে রয়েছে তারা।
২০১৬ সালে মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে তিনি শুরু করেন একটি ছোট্ট শিক্ষা উদ্যোগ। স্কুলটির নাম দেন ‘পাঠমু খারুকা’, যার বাংলা অর্থ 'কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটানো'। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর স্বপ্ন, সে স্বপ্ন দেখেছিলো পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিশু একদিন শিক্ষার আলোয় বিকশিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ছিল না পর্যাপ্ত অর্থ, অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল। কিন্তু তিনি দমে যায় নি বরং থামার কারণ এগিয়ে গেছেন ধৈর্য ও নিষ্ঠা নিয়ে। শিশুদের বিদ্যালয়ে আনা, অভিভাবকদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, সবকিছুই করতে হয়েছে তাকে একা হাতে। সময় গড়িয়েছে, আর তাঁর স্বপ্ন পূরনের যাত্রাও বিস্তৃত হয়েছে। মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগটি বর্তমানে পরিনত হয়েছে অনন্য এক শিক্ষানেটওয়ার্কে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একাধিক স্কুলে পড়াশোনা করছে অসংখ্য ম্রো শিশু। শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে উঠেছে আবাসিক ব্যবস্থাও, যাতে দূরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসা শিশুরা নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
উথোয়াইহাইয়ের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য কেবল স্কুল প্রতিষ্ঠা নয়, বরং শিক্ষার প্রতি একটি জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া। যে পরিবারগুলো একসময় নিজেদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী ছিল না, তারাই এখন শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। পাহাড়ি অঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বের এমন প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি টেকসই পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উথোয়াইহাই তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার গল্পে প্রায়ই বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প কিংবা অর্থনৈতিক সূচকের কথা উঠে আসে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়নের গল্প লুকিয়ে থাকে এমন মানুষদের মধ্যে, যারা নিভৃতে মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার কাজ করে যান। উথোয়াইহাই তেমনই একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই সম্ভাবনার একটি কুঁড়ি লুকিয়ে আছে, প্রয়োজন কেবলমাত্র যত্ন, সুযোগ আর শিক্ষা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। আর সেই শিশুদের শিক্ষিত করে তোলার প্রতিটি উদ্যোগই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ ও মানবিক করে তোলে।উথোয়াইহাইয়ের গল্প তাই শুধু একজন মানুষের গল্প নয় বরং এটি একটি আশার গল্প, একটি পরিবর্তনের গল্প ও সার্বজনীন শিক্ষার শক্তির এক অনন্য দলিল।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া । (অনুমতি ছাড়া রিপোস্ট করবেন না)
#উথোয়াইহাই #বান্দরবান #পাঠমু_খারুকা #শিক্ষা #শিশু #ম্রোজাতি
#বাংলার_তথ্যপট (বিস্তারিত জানুন কমেন্টে)