25/08/2026
নূরে মোহাম্মদী ও মারেফতের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনকে শুধু ইতিহাসের একটি জন্মঘটনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; কারণ তিনি এমন এক মহাসত্যের বাহক, যার আগমনে মানবতার অন্ধ অন্তঃকরণে তাওহীদের নূর প্রজ্বলিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন— “আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)। এই আয়াতের গভীরতায় প্রবেশ করলে বোঝা যায়, মুহাম্মদ ﷺ-এর রিসালাত কেবল মানুষের সামাজিক সংশোধনের জন্য নয়; বরং সৃষ্টিজগতের প্রতি আল্লাহর রহমতের এক মহাজাগতিক প্রকাশ। তিনি হিদায়াতের দরজা, সুন্নাহর জীবন্ত মশাল এবং আল্লাহমুখী হওয়ার পূর্ণাঙ্গ আদর্শ।
মারেফতের দৃষ্টিতে মানুষ যতক্ষণ নিজের নফসের পর্দায় আবদ্ধ, ততক্ষণ সে নিজের রবের পরিচয়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। নফসের অন্ধকার, অহংকারের আবরণ, দুনিয়ার মোহ এবং ‘আমি’-র মিথ্যা দাবিই তাকে হক থেকে দূরে রাখে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন সেই পর্দা ছিন্ন করার পথ দেখিয়েছে। তিনি মানুষকে নিজের দিকে বন্দী করেননি; তিনি মানুষকে নিজের রবের দিকে ফিরিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা মানুষের অন্তরকে মাখলুকের মোহ থেকে খালিকের মহব্বতের দিকে, নফসের বন্দিত্ব থেকে ইবাদতের স্বাধীনতার দিকে, গাফেলত থেকে জিকিরের দিকে এবং অজ্ঞতা থেকে মারেফতের দিকে পরিচালিত করে।
এই কারণেই নবীপ্রেম মারেফতের পথে কোনো পার্শ্বিক অনুভূতি নয়; বরং আত্মশুদ্ধির অন্যতম প্রাণশক্তি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি, ১৫; সহিহ মুসলিম, ৪৪)। এই হাদিসের রহস্য শুধু আবেগে নয়—এখানে ‘ভালোবাসা’ বলতে এমন এক আনুগত্যপূর্ণ মহব্বত বোঝা যায়, যেখানে নিজের নফস, নিজের প্রবৃত্তি, নিজের স্বার্থ ও নিজের অহংকারের ওপর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ ও আদর্শকে স্থান দেওয়া হয়। যে হৃদয়ে নবী ﷺ-এর মহব্বত সত্য হয়ে ওঠে, সেখানে নফসের আধিপত্য ক্রমশ ক্ষীণ হয়।
কুরআনও এই ভালোবাসার পরীক্ষা নির্ধারণ করে দিয়েছে—“যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়, অর্জিত সম্পদ ও প্রিয় বাসস্থান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো...” (সূরা আত-তাওবা, ৯:২৪)। অর্থাৎ মারেফতের পথিকের জন্য আসল সংগ্রাম বাহিরের পৃথিবীর সঙ্গে নয়—নিজের অন্তরের সিংহাসন নিয়ে। সেখানে কে রাজত্ব করবে—নফস, না রাসূলের আদর্শ? দুনিয়ার মোহ, না আল্লাহর মহব্বত? নিজের ‘আমি’, না প্রিয় নবীর সুন্নাহ? এই অন্তর্দ্বন্দ্বেই প্রেমের সত্যতা প্রকাশ পায়।
সুফি-আশেকদের ভাষায়, নবী ﷺ-এর প্রতি মহব্বত এমন এক আগুন, যা অন্তরের মরিচা পুড়িয়ে দেয়। রুমির প্রেমদর্শনে প্রেম হলো এমন অগ্নি, যা ‘আমি’-র দুর্গ ভেঙে প্রিয়ের দিকে নিয়ে যায়। তাই নবীপ্রেমিকের সাধনা হলো নিজের নফসকে ক্রমাগত পরিশুদ্ধ করা, অন্তরের গাফলত দূর করা এবং রাসূল ﷺ-এর আদব ও আখলাককে নিজের অস্তিত্বে প্রতিফলিত করা। সে শুধু দরুদ পাঠ করে না—তার আচরণে দরুদের প্রভাব দেখা যায়; শুধু নবীর প্রশংসা করে না—নবীর রহমত নিজের চরিত্রে ধারণ করে; শুধু মিলাদে আনন্দ করে না—সারা জীবন সুন্নাহর প্রতি আনুগত্যকে নিজের সৌভাগ্য মনে করে।
এই দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী আশেকের কাছে নিছক উৎসব নয়; এটি শুকরের ময়দান, মহব্বতের ময়দান এবং আত্মপরিচয়ের ময়দান। যে দিন পৃথিবী রহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ-এর আগমনের সংবাদ পেয়েছে, সে দিনকে স্মরণ করে প্রেমিক হৃদয় নিজের কাছে প্রশ্ন করে—আমি কি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসি? আমার নফস কি তাঁর আদর্শের কাছে নত হয়েছে? আমার চরিত্রে কি তাঁর রহমত এসেছে? আমার অন্তরে কি তাঁর আদব জেগেছে? আমার জীবন কি তাঁর সুন্নাহর দিকে এগিয়েছে?
মারেফতের দৃষ্টিতে এখানেই মিলাদের আসল রহস্য—মিলাদ মানে শুধু নবীর জন্ম স্মরণ নয়; নিজের অন্তরে নবীপ্রেমের পুনর্জন্ম ঘটানো। যে অন্তর গাফেল ছিল, তাকে জাগানো; যে নফস বিদ্রোহী ছিল, তাকে দমন করা; যে হৃদয় দুনিয়ার মোহে বন্দী ছিল, তাকে আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। কারণ নবী ﷺ-এর স্মরণ যদি অন্তরকে পরিবর্তন না করে, তবে সেই স্মরণ এখনো তার গভীরতম উদ্দেশ্যে পৌঁছায়নি।
সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ মহামানব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, রহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ-এর আগমন তাই আশেকদের কাছে মহা-আনন্দের কারণ। কারণ তাঁকে ভালোবাসা মানে আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর আখলাককে জীবনে ধারণ করা এবং তাঁর দেখানো পথে নিজের নফসকে সমর্পণ করা। আর যে প্রেমিক সত্যিই এই পথে প্রবেশ করেছে, সে জানে—প্রেমের চূড়ান্ত দাবি মুখের উচ্ছ্বাস নয়, নিজের অস্তিত্বের পরিবর্তন।
তাই মিলাদের মজলিসে যখন দরুদের ধ্বনি ওঠে, আশেকের অন্তর কেবল একটি ঐতিহাসিক জন্মের কথা স্মরণ করে না; সে নিজের হারানো অন্তরকে খুঁজে নেয়। সে উপলব্ধি করে—যাঁর মাধ্যমে আমরা কুরআন পেয়েছি, যাঁর মাধ্যমে সুন্নাহ পেয়েছি, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহর দিকে চলার পথ পেয়েছি, তাঁর প্রতি মহব্বত আমাদের ঈমানের অলংকার নয়—আমাদের ঈমানেরই এক গভীর প্রাণস্পন্দন।
আর সেই প্রেমের সর্বোচ্চ সাক্ষ্য হলো—নবী ﷺ-কে মুখে ভালোবাসা, অন্তরে ধারণ করা, চরিত্রে প্রকাশ করা এবং জীবনের প্রতিটি মোড়ে তাঁর সুন্নাহকে নিজের নফসের ওপর বিজয়ী করা। তখনই মিলাদের আনন্দ গানের শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অন্তরের তাজকিয়া হয়ে ওঠে, নফসের পরাজয় হয়ে ওঠে, মারেফতের দরজা খুলে দেয় এবং মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয়ের দিকে ফিরিয়ে নেয়।
নবী ﷺ-এর আগমন রহমত; তাঁর মহব্বত নাজাতের পথ; তাঁর সুন্নাহ পথের আলো; আর তাঁর আদব—মারেফতের দরজার চাবি।
--রাফিন সাদ