26/03/2024
দেওবন্দের ফাতওয়া : তারাবীহের ইমামতীর বিনিময় জায়িয নয়।
--------------------------------------------------------
বর্তমান বিশ্বে দ্বীনি ইলমের অন্যতম কেন্দ্র হলো দারুল উলূম দেওবন্দ। তারাবীহের ইমামতী নিয়ে সাম্প্রতিক বিভ্রান্তি সম্পর্কে ওজাহাত করে দারুল উলূম দেওবন্দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে :
তারাবীহের বিনিময় প্রসঙ্গে সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রশ্ন দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতায় আসতে থাকে। বিশেষ করে মাহে রামাজানে মানুষ এ বিষয়ে বেশি প্রশ্ন করে থাকে।
বিগত দিনে কোনো কোনো এলাকা থেকে এ সংবাদ এসেছে যে, দারুল উলূম দেওবন্দের ফত্ওয়া বিভাগ এ মাসআলায় পূর্বমত থেকে ফিরে এসেছে। এমনকি অন্ধ্র প্রদেশের নিজামাবাদ শহর থেকে একটি প্রশ্ন আসে, যার সঙ্গে একটি লিফলেটও ছিল। লিফলেটে মারাত্মক প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। দারুল উলূম দেওবন্দের মুফতীয়ানে কেরাম, এমনকি আকাবির উস্তাদগণের নামে এ ভ্রান্ত কথা প্রচার করা হয়েছে যে, তাঁরা সকলে একমত হয়ে তারাবীর বিনিময়কে জায়েয ফত্ওয়া দিয়েছেন।...
অপর এক লিফলেটে হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উসমানী দা. বা.-এর দিকে সম্বন্ধ করে তারাবীর বিনিময় জায়েয হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যাতে মুফতী সাহেবের দীর্ঘ একটি লেখার অসম্পূর্ণ উদ্ধৃতি পেশ করে ভুল ফলাফল বের করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে।.
এ প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই মানুষের ভুল ধারণা দূর করার লক্ষ্যে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে কেন্দ্রীয় ফত্ওয়া প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই মূল ফতওয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরছি :
এক. তারাবীহ নামাযের ইমামতীর বিনিময় গ্রহণ করা কোনভাবেই জায়েয নয়।
দুই. তারাবীহের বিনিময় গ্রহণ করা নিঃশর্তভাবে নাজায়েয। চাই তাকে কুরআন শরীফ খতমের বিনিময় ধরা হোক বা তারাবীহের ইমামতির বিনিময় ধরা হোক।
তিন. বহু আকাবির মুফতীয়ানে কেরামের ফত্ওয়ায় তারাবীর ইমামতির বিনিময়কে সুস্পষ্টভাবে নাজায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন-- ই’লাউস সুনান-এর লেখক মাওলানা যফর আহমদ উসমানী এক প্রশ্নের জবাবে লেখেন :
والأصل فيه ما حققه ابن عابدين في رسالته شفاء العليل وبل الغليل من حرمة الإجارة ...
তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের সারকথা হলো, তারাবীহের ইমামতির বিনিময় নেওয়া জায়েয নয়। কারণ, যে জরুরত বিবেচনা করে কুরআন শরীফের তা’লীম, ফরয নামাযের ইমামতি, আযান ইত্যাদির বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয বলা হয়েছে, সেই জরুরত তারাবীহর জামা‘আতে সাব্যস্তই হয় না। কেননা, উল্লিখিত বিষয়গুলো হয় ফরজের অন্তর্ভুক্ত, না হয় সুন্নতে মুআক্কাদার অন্তর্ভুক্ত। আর তারাবীহের জামা‘আত ও ইমামতি সুন্নতে কেফায়াহ।
এরপর তারাবীহের ইমামতি সুন্নতে কেফায়া হওয়ার পক্ষে কিছু ইবারত দ্বারা দলীল পেশ করার পর হযরত মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন, উল্লিখিত ইবারত থেকে বোঝা গেল, তারাবীহের বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয নয়। তা কেবল ইমামতী বিনিময়েও নয়, কেবল খতমের বিনিময়েও নয়।
বলা বাহুল্য, তারাবীহের বিনিময়কে যদি কুরআন শরীফের খতমের বিনিময় ধরা হয়, তাহলে তো তা নাজায়েযের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। আর যদি তারাবীহের ইমামতির বিনিময় ধরা হয়, তাহলে এ সন্দেহ হতে পারে যে, পরবর্তী যুগের হানাফী ফক্বীহগণ পাঁচওয়াক্ত নামাযের ইমামতির বিনিময় গ্রহণ করাকে জায়েয বলেছেন, অতএব, এর ওপর কিয়াস করে তারাবীহের ইমামতির বিনিময়ও জায়েয হবে; কিন্তু আসলে তা সঠিক নয়। কেননা, আকাবির উলামায়ে কেরাম এতদুভয়ের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট করে এ সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন। সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এ নামেও (তারাবীর ইমামতি) বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয নয়।
চার. আকাবিরের কারও কারও ফত্ওয়ায় অনুগামী (تبعا) হিসাবে তারাবীহের ইমামতীর বিনিময় গ্রহণের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু বুঝতে হবে, যারা অনুগামী (تبعا) হিসাবে তারাবীহের বিনিময় গ্রহণের সুযোগের কথা বলেছেন, তারাও নিঃশর্তভাবে বলেননি। যেমন-- হযরত ফক্বীহুল উম্মত রহ. বলেন, ‘মূল মাযহাব তো নাজায়েযই। তবে উল্লিখিত সুরতে উল্লিখিত কৌশল অবলম্বনের সুযোগ (گنجایش) আছে।’ এখানে হযরত উল্লিখিত সুরত ও উল্লিখিত কৌশলের সঙ্গে ‘সুযোগ’ (گنجایش) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
তেমনি হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম লাজপুরী রহ. বলেন : ‘অনন্যোপায় (مجبورا) হলে এ সুরত অবলম্বন করতে পারে যে, হাফেয সাহেবকে রমযানের জন্য সহকারী ইমাম নিযুক্ত করবে। ইশা ও অন্য এক-দুই ওয়াক্ত নামায তার জিম্মায় থাকবে। পাশাপাশি তারাবীহও পড়াবেন। এ কৌশল অবলম্বন করলে মসজিদের ফান্ড থেকে সহকারী ইমাম হিসাবে বিনিময়ের লেনদেন জায়েয হবে।’ এখানে হযরত অনন্যোপায় (مجبورا) শব্দ উল্লেখ করেছেন। বোঝা গেল, আকাবিরের কেউ কেউ যে অনুগামী (تبعا) হিসাবে বিনিময় গ্রহণের সুযোগের কথা বলেছেন, তাও মজবুরির সুরতে। অন্যথায় তাও নিঃশর্তভাবে সতর্কতার পরিপন্থী।
(পক্ষান্তরে হযরত থানভী রহ. শেষে এ সুরতকেও নাজায়েয বলেছিলেন। হযরত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ জায়েয হওয়ার ফত্ওয়া ওই সুরতে যখন কেবল ইমামতিই উদ্দেশ্য হবে। অথচ এখানে মূল উদ্দেশ্য কুরআনের খতম। এটা (দু-এক ওয়াক্তের ইমামতি) একটি হীলা বা কৌশলমাত্র। যেহেতু দিয়ানাতের ক্ষেত্রে মুআমালা হয় বান্দা ও আল্লাহর মাঝে, তাই হীলা-কৌশল কোনো কিছুকে জায়েয করতে পারে না। অতএব তা নাজায়েযই হবে। ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/৪৮৫, তারাবীহ পরিচ্ছেদ, প্রশ্ন : ৪১০, ইদারায়ে তালীফাতে আওলিয়া, দেওবন্দ)
হযরতের এ জবাবের ওপর টীকা লিখতে গিয়ে মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী মুদ্দাযিল্লুহুল আলী বলেন, একটি মূলনীতি হলো, الأمور بمقاصدها (অর্থাৎ সকল বিষয় তার উদ্দেশ্যের দিক থেকেই বিবেচ্য হয়ে থাকে)। অতএব কোনো হাফেয সাহেবকে যখন কোরআন শরীফ খতমের জন্য তারাবীর ইমাম বানানো হয়, তখন তো এটা সুস্পষ্টই যে তার দ্বারা উদ্দেশ্য ইমামতি নয়, কুরআনের খতম। (ফাতাওয়া দারুল উলূম জাদীদ : ৪/২৭৩) কিন্তু হযরত মুফতী কিফায়াতুল্লাহ রহ. এ হীলা-কৌশলকে জায়েয ফত্ওয়া দিয়েছেন। তথাপি এটা তো স্পষ্টই যে, এটা কেবলই একটি হীলা বা কৌশল। এখানে উদ্দেশ্য কুরআনের খতমই। ইমামতি কখনোই উদ্দেশ্য নয়। আর দিয়ানতের ক্ষেত্রে হীলা-কৌশল জায়েযের ফায়দা দেয় না। فالحق ما أفتى به المجبيب قدس سره العزيز -
সাঈদ আহমদ (টীকা, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/৪৮৫, তারাবীহ পরিচ্ছেদ, প্রশ্ন : ৪১০, ইদারায়ে তালীফাতে আওলিয়া, দেওবন্দ)
ছয়. হয়তো এমন হলো যে, তারাবীহের ইমাম ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের মাঝে বিনিময়ের ব্যাপারে কোনো কথাবার্তা হয়নি। তবে ওই এলাকায় কুরআন খতমের বিনিময়ে লেনদেনের রেওয়াজ আছে। এ পরিস্থিতিতে ফিকহের প্রসিদ্ধ মূলনীতি المعروف كالمشروط (অর্থাৎ প্রচলিত বিষয় শর্ত করার মতোই হয়ে থাকে)-এর ভিত্তিতে তারাবীর বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয হবে না।...
সাত. حبس وقت (সময় আটকে থাকা)-এর দোহাই দিয়ে তারাবীহের ইমামতীর বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয হবে না। কারণ, যে সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয বলেছেন, তার মূল কারণ হলো ضياع دين তথা দ্বীন বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। (এটাকেই জরুরত শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে।) حبس وقت জায়েযের মূল কারণ নয়। অন্যথায় حبس وقت -কে যদি জায়েযের কারণ সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তো সব ইবাদতেই বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয হবে। কারণ, সকল ইবাদতের মধ্যেই حبس وقت পাওয়া যাবে। আর এটা তো স্পষ্টই যে উল্লিখিত জরুরত তারাবীতে সাব্যস্ত হয় না।
অতএব তারাবীর বিনিময় গ্রহণ করা কোনভাবেই জায়েয হবে না।
তা সর্বাবস্থায় নাজায়েয ও হারাম হবে।
(দ্রষ্টব্য : দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত রেসালাহ -মু‘আওয়াযা আলাত-তারাবীহ : ১২-২৬ পৃষ্ঠা)