25/03/2026
একজন বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল- আমার টাকা পয়সা কিচ্ছু লাগবে না, আমার সন্তানের লা*শটা খালি বুঝাইয়া দেন, আমার এত ছোট সন্তানডা..
কথাগুলো বলেই হাউমাউ করে কাঁদছিলেন তিনি।
আরেকটা ছোট্ট ছেলে ফেরি থেকে হাতটা বাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাকছিল- মা ও মা গো, আমার হাতটা ধরো।
ছেলেটা মাকে বাঁচাতে না পেরে ফেরিতে এসে চিৎকার করে বলছিল- মাগো, তুমি আমারে এতিম বানাইয়া চইলা গেলা, ও মাগো।
আরেকজন লোক মর্মাহত সুরে বলছিল- "আমার বউটারে বলছিলাম, আমার ডিউটি আছে তোমরা বাড়িতে থাকো। কিন্তু বউটা শুনলো না।
বলল, আব্দুল্লাহর বাপ তোমারে না দেখলে আমার ভালো লাগে না, আমি থাকমু না। তোমারে না দেখলে আমার অস্থির লাগে। এখন আমার কি হইব? আমি কেমনে বাঁচমু?"
কথাগুলো বলতে বলতে এই লোকটাও হাউমাউ করে কাঁদছিল। মনে হচ্ছিল পরিবারের লোকজনকে হারিয়ে
যেন একদম নিঃস্ব হয়ে গেছে সে।
আরেকটা ছোট্ট ছেলে আফসোস করে বলছিল- আমার আম্মু এখনো বাসের ভিতরে। আমি আম্মুরে বের করতে পারি নাই, দম নিতে পারি নাই পানির ভিতর। পরে জানালা দিয়া বের হইয়া গেছি।
ছেলেটা এখন হন্য হয়ে তার মাকে খুঁজতেছে আর আফসোস করছে কেন তার মাকে বের করতে পারে নাই। কেন সে একা একাই বের হলো।
আরেকজন ফেরি দেখার জন্যে বাস থেকে বের হয়েছিল। তার বউ, বাচ্চা তখন বাসেই ছিল। লোকটার চোখের সামনেই বাসটা পড়ে গেল। লোকটা বাসের পিছন পিছন দৌঁড়েছে কতক্ষণ কিন্তু ধরতে পারে নাই।
লোকটা এখন শোকে পাথর হয়ে গেছে ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না। বারবার শুধু বলছে- আমিও মরে গেলাম না কেন? আমার কি হইবো এখন!
এগুলো মাত্র কয়েকজনের আর্তনাদ। এমন আরও বহু পরিবার, বহু নারী, ছোট ছোট বাচ্চারা ডুবে আছে পানির নিচে। মাত্র ১৭ জন বের হয়ে আসতে পারছে, বাকিরা পারে নাই। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও নাই।
উদ্ধারার্মীরা এসে দুই ঘন্টা এমনি বসেছিল। তাদের না-কি আধুনিক যন্ত্রপাতি নাই। ততক্ষণে বাসটা ৯০ ফুট গভীরে চলে গেছে, ভিতরের লোকগুলোও দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে। ভিতরের একটা মানুষও আর জীবিত নাই।
কাকে দোষ দিব? এদেশে এমপি-মন্ত্রীদের সমস্যা, আইনকানুনে সমস্যা, জনগণের সমস্যা। বাস ড্রাইভারদের সমস্যা।
এই বাসের ড্রাইভারও নিজে বাস না চালিয়ে চালাতে দিয়েছিল হেলপারকে। পরে বাস পড়ে গেছে নদীতে।
এদেশে প্রতিটা পদে পদে মৃত্যু। লঞ্চে চড়লে মৃত্যু, ট্রেনে চড়লে মৃত্যু, বাসে চড়লেও মৃত্যু। এদেশে আমাদের জন্মই হয়েছে ডুবে মরার জন্যে।
যেই মানুষগুলো মারা গিয়েছে তাদের প্রত্যেকে হাসিখুশিভাবে ঈদের ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরছিল। পরিবারের কাছ থেকেও হাসিখুশিভাবে বিদায় নিয়েছিল।
ইচ্ছে ছিল পরেরবার আবারও পরিবারের সাথে একসাথে ঈদ করবে, আনন্দ করবে কিন্তু সে ইচ্ছেটা আর পূরণ হলো না।
বাবা-মা যত্ন করে বাড়ি থেকে যে খাবারগুলো বক্সভর্তি করে রান্না করে দিয়েছে সেগুলো এখন পড়ে আছে পানিতে, সেগুলোও আর খাওয়া হবে না তাদের। তার আগেই এই মানুষগুলো চলে গেল পরপারে।
পরের ঈদে এই মানুষগুলোর পরিবারের সাথে কুরবানির ঈদ করার কথা ছিল অথচ তারা তখন থাকবে কবরে।
এই মানুষগুলোও জানতো না তারা মারা যাবে। না জেনেই হয়তো কত প্ল্যান করে রেখেছিল, পরের ঈদের জন্যে স্বপ্ন দেখেছিল। অথচ মুহুর্তেই সব শেষ!
আমরা প্রতিনিয়ত কতশত প্ল্যান করি অথচ জীবন কত অনিশ্চিত
- Ibrahim Khalil Shawo