06/10/2026
দাওয়াম নিয়ে পাঠকের অনুভূতি
দাওয়াম (অর্থাৎ আমার সংগ্রাম) প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটা তাঁর লিখিত নয়; মূলত এটি তাঁর কয়েকটি ভাষণের সংকলন। জরুরি এই কিতাবে প্রফেসর এরবাকানের ৯টি ভাষণ স্থান পেয়েছে। প্রতিটি ভাষণই গুরুত্বপূর্ণ। প্রফেসর এরবাকান একইসঙ্গে একজন প্রমিনেন্ট স্টেটসম্যান, উম্মাহর নেতা, ইসলামী মুভমেন্টের প্রাণপুরুষ এবং একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তুরস্ক, এমনকি পুরো দুনিয়ায় প্রফেসর এরবাকান তাই একজন আলোচিত ও অসাধারণ ব্যক্তি। [১]
প্রথম ভাষণটি অসাধারণ। এখানে প্রফেসর এরবাকান ‘মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও মানুষ’ শিরোনামে আলোচনা করেছেন। জগত-দুনিয়ার সৃষ্টি নিয়ে তাঁর আলোচনার সঙ্গে মানুষের আমানত ও ইমারতের দায়িত্বকে সম্পৃক্ত করে অসাধারণ কম্প্রিহেনসিভ আলোচনা টেনেছেন তিনি। রাজনীতিবিদ এরবাকানের বদলে আলেম এরবাকানের দৃষ্টান্ত এই প্রবন্ধটি। এখানে একইসঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন জিহাদ ও সংগ্রামের অসাধারণ প্রেরণা। এরবাকানের ভাষায়—
“আমরা জিহাদ না করলে দুনিয়াতেও শোষিত হবো, আখেরাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হবো।”
এবং ইসলামী মুভমেন্টে ইস্তিকামাতের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে কী ধরনের যোগ্যতা অর্জন করা দরকার, তা নিয়েও একটি ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচনা হলো ‘শাশ্বত বিধান ইসলামের দিকেই আমাদের দাওয়াত’। দাওয়ামের সবচেয়ে দীর্ঘ আলোচনা এটি। এ অধ্যায়ে ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব, ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাস, ইউরোপ তার জ্ঞানের ক্ষেত্রে কীভাবে ইসলামের কাছে ঋণী—এসব বিষয় এসেছে। তাবৎ আলোচনার মাধ্যমে মূলত এরবাকান হোজা (তুর্কি শব্দ, অর্থ—উস্তাদ) ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ানে রূপ দিয়েছেন।
এ জায়গায় এরবাকান হোজার শ্রেষ্ঠত্ব হলো—তিনি আমাদের কুসসাস-ওয়ায়েজীনদের মতো ‘ইসলাম শ্রেষ্ঠ’ এতটুকু বলেই থেমে যাননি। বরং আলোচনা করে, যুক্তি দিয়ে সেটিকে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
তৃতীয় অধ্যায়ে দুনিয়াকে শাসনকারী শক্তিবর্গ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একপক্ষ জায়োনিজমকে একটি কনস্পিরেসি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, আরেকদল দুনিয়ার সব জায়গায় শুধু ইলুমিনাতি দেখতে পান। এ দুয়ের মাঝে এরবাকান হোজা দেখিয়েছেন জায়োনিস্টদের অর্থনৈতিক শোষণ ও ডলারিজমের আধিপত্যকে। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা পেয়েছি এখানে এবং শহীদ মালিক আল-শাহবাজের (ম্যালকম এক্স) আলাপে।
চতুর্থ অধ্যায় হলো ইসলামী ইউনিয়ন নিয়ে আলোচনা। এরবাকানের যেসব দিক এক কথায় অনন্য, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের মূলনীতি ও তার কাঠামো নিয়ে চমৎকার আলোচনা আছে এই অধ্যায়ে। একইসঙ্গে সাদ্দামের সঙ্গে ডিল করে এরবাকান হোজা কীভাবে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন, তার ঐতিহাসিক দলিলও রয়েছে এই অধ্যায়ে।
সাইপ্রাস শান্তি মিশন-এর আলোচনায় সাইপ্রাসের মুসলিমদের জন্য এরবাকান হোজার ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা ও তাঁর অসাধারণ অবদানের আলোচনা আছে।
‘আমাদের সভ্যতা’ অধ্যায়ে ইসলামের ১২০০ বছরের লিগ্যাসি এবং ভবিষ্যতে বিজয়ের সম্ভাবনা উঠে এসেছে।
‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা’ অধ্যায়ে এরবাকান তুলে ধরেছেন ইসলামের সময়কার শিক্ষাধারার শ্রেষ্ঠত্ব এবং বর্তমানে এর প্রায়োগিক জায়গাটি কোথায় হতে পারে, তা।
পরের অধ্যায়ে শিল্পায়নের গুরুত্ব—ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে অর্থনৈতিক গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে, শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্র, দেশীয় প্রযুক্তির সাহায্যে শুধুমাত্র অবিচলতা থাকলেই কীভাবে উন্নয়ন সম্ভব—তার রসজ্ঞ বর্ণনা এসেছে।
পরের অধ্যায় হলো ‘ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’। এখানে ‘নতুন দুনিয়া’—যা এরবাকান হোজার মূল দর্শন এবং প্রকল্প, যার মাধ্যমে তিনি গোটা উম্মাহকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন—তার আলোচনা এসেছে। এ অধ্যায়ে একইসঙ্গে জি-৭-এর বিকল্প হিসেবে ডি-৮-কে তুলে ধরেছেন তিনি। এ অধ্যায়টি বারবার পড়া দরকার।
সর্বশেষ আলাপ, অর্থাৎ ‘শেষ কথা’তে উঠে এসেছে দাওয়ামের সারাংশ। সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহসহ মুজাহিদদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন এরবাকান হোজা। অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত এর পরতে পরতে।
দাওয়ামের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় মূলত? আমাকে কেউ এ প্রশ্ন করলে আমার জবাব হলো—এরবাকান হোজার সবচেয়ে বড় শ্রেষ্ঠত্ব হলো ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব ও বিজয়ী চেতনা জনমানুষের ভাষায় প্রকাশ করে প্রতিটি হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া। একজন শ্রমিকও তাঁর এই বক্তব্যে স্বাপ্নিক হয়ে উঠবে, একজন রিকশাওয়ালাও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে, একজন দারোয়ানও নতুন দুনিয়া নিয়ে কথা বলে উঠবে। প্রতিটি হৃদয়ে ইসলামের বিজয়ী চেতনা ঢুকিয়ে দিয়ে ব্যক্তি ও উম্মাহকে উজ্জীবিত করাই এরবাকান হোজা ও দাওয়ামের শ্রেষ্ঠ জায়গা।
সুতরাং আত্মবিশ্বাসী হতে চাইলে, উজ্জীবিত হতে চাইলে দাওয়াম পড়ার কোনো বিকল্প নজরে আসে না। আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করাই দাওয়ামের সার্থকতা। কারণ—
“একটি ফুল দিয়ে কখনো বসন্ত হয় না, কিন্তু প্রতিটি বসন্তই একটি ফুল দিয়ে শুরু হয়।”