10/05/2026
বিলস আয়োজিত মহান মে দিবস স্মারক বক্তৃতা ২০২৬
-----------------------------------------------------------
গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের আহ্বান
==================================
শ্রমজীবী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ- বিলস এর উদ্যোগে আয়োজিত মহান মে দিবস ২০২৬ স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে। “গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রত্যাশা” শীর্ষক এই স্মারক বক্তৃতা আজ ১০ মে ২০২৬ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
বিলস চেয়ারম্যান মোঃ মজিবুর রহমান ভুঞাঁর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জনাব আবুল মোমেন। উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিলস মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আব্দুর রহমান তরফদার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।
স্মারক বক্তৃতায় আবুল মোমেন উল্লেখ করেন, লুটপাটের মাধ্যমে বিত্তবানের জন্যে ঊর্ধমুখী শ্রেণি-উত্তরণের পথ কেবল সুগমই হয় নি, এর যাত্রীও উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এ ছাড়া ধর্মের নামে অন্ধ বিশ্বাসে, প্রথা-সর্বস্ব আচারের সংস্কৃতি শ্রমজীবীসহ সমাজের ওপর রীতিমত চেপে বসেছে। অর্থনীতির বিকাশ হলেও সমাজে মানবিক বিকাশ আশানুরূপ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে মূল্যবোধে যে ধস নেমেছে সে বিষয়ে হুঁশিয়ার হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরকম অবস্থায় সংগঠন ও সংগ্রাম ন্যায্য ইস্যুতে পরিচালনা ও তাতে সফল হওয়া কঠিন। যাঁরা শ্রমিকদের নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন তাঁদের অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষকে যদি কেবলই পিছনে ফেলে রাখি, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে বাড়তে না দেই, তাঁর জীবনে যদি আনন্দ-বিনোদনের কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে তাঁর জন্যে বাস্তবতা মারাত্মক প্রতিকূল হয়ে ওঠে। নিরন্তর প্রতিকুলতা মানুষের নীতি ও মূল্যবোধ ধরে টান দেয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, উত্তরণের জন্যে তার মনের সহজাত বিকাশ-শক্তির অর্গল খুলে দিতে হবে; তাকে আনন্দ পেতে, দিতে এবং সৃষ্টিতে তার সক্ষমতা বাড়াতে দিতে হবে। তাহলে তার সংগ্রামী শক্তি বিজয় অর্জন পর্যন্ত টেকসই হবে, মাঝপথের আপস কিংবা হাল ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা কমবে।
অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তৃতার ওপর আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন শ্রম অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহ্বায়ক মেজবাহউদ্দীন আহমেদ, আই-সোস্যাল-এর চেয়ারপারসন, অর্থনীতিবিদ ড. অনন্য রায়হান, লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, আইএলও’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিরান রামজুথান, শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) শাহ্ আবদুল তারিক, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের হাওলাদার, এ এ এম ফয়েজ হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নাইমুল আহসান জুয়েল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী মহিলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাসরিন আক্তার ডিনা, বিলস এর আজীবন সদস্য খন্দকার আব্দুস সালাম, আওয়াজ ফাউন্ডেশনের কোষাধ্যক্ষ খাদিজা আক্তার প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিলসের পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ। অনুষ্ঠানে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও শ্রমিক সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিগণ, নারী ও যুব শ্রমিক নেতৃত্ব, বিলস-এর উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও আজীবন সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা স্মারক বক্তৃতার ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অবদান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের ন্যায্য অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়নে শ্রমিকের মর্যাদা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং বৈষম্যহীন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের কাছে মে দিবস শুধু আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; বরং এটি তাদের সংগ্রাম, ঐক্য ও অধিকার আদায়ের অনুপ্রেরণার প্রতীক। তিনি বলেন, পহেলা মে ঘিরে যে শ্রমিক ধর্মঘটের সূচনা হয়েছিল, তা সে সময় শ্রমিকদের মধ্যে নতুন চেতনা ও ঐক্যের জন্ম দেয় এবং পুরো আমেরিকাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মে দিবসের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন পেশা ও ভিন্ন শ্রেণির মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নেমেছিলেন। কোনো আন্দোলন সফল করতে হলে এবং ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহান মে দিবস আমাদের সাহস, সংহতি ও ন্যায্য দাবিতে দৃঢ় থাকার শিক্ষা দিক—এটাই হওয়া উচিত এই দিনের মূল প্রেরণা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, অটোমেশন, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের সম্প্রসারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সময়োপযোগী শ্রমনীতি, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, কার্যকর শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সংলাপ অপরিহার্য। শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র কখনো পূর্ণতা পায় না। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণআন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অবদান থাকলেও পরবর্তীকালে তাদের প্রত্যাশা ও অধিকারের বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শেষে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।