15/06/2026
চকরিয়ার তরুণ রিমন ও তার ‘টিউলিপ ম্যাট্রেস’—একটি উদ্যোগের নেপথ্যে মানব সক্ষমতার গল্প
---------------------------------------------------------------------
মাত্র ২,০০০ টাকা বেতনে অন্যের প্রতিষ্ঠানে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন চকরিয়ার এক তরুণ। ঘামের বিনিময়ে মিলত কেবল বেঁচে থাকার ন্যূনতম সংস্থান।
যার চোখে-মুখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন, তাকে কি আর অভাবের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়?
আজ সেই তরুণের কারখানায় তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার ম্যাট্রেস ও বেডিং সামগ্রী; কর্মসংস্থান হয়েছে ১৯ জন স্থানীয় যুবকের! বলছিলাম কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার এক উদীয়মান, একসময় পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রিমনের অভাবনীয় সফলতার গল্প।
কক্সবাজারের চকরিয়া অঞ্চলের চেনা পরিমণ্ডলে বড় হওয়া রিমনের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।
পুঁজি বলতে ছিল শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা। নিজের একটি স্বাধীন ব্যবসা বা উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন ‘টিউলিপ ম্যাট্রেস এন্ড বেডিং হাউস’।
কিন্তু শুধু স্বপ্ন দিয়ে তো আর ব্যবসা চলে না। সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে শুরুতেই তাকে পড়তে হয়েছিল নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য টিকে থাকার লড়াইটা কতটা কঠিন, তা রিমন প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছিলেন।
ঠিক যখন কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম আর বাজারজাতকরণের জটিলতায় রিমনের স্বপ্নটা থমকে যেতে বসেছিল, তখনই তার জীবনে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত টার্নিং পয়েন্ট!
রিমনের এই সম্ভাবনাময় কিন্তু পিছিয়ে পড়া উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়ায় সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্য ফিজিক্যালি ভালনারেবল (SARPV)।
রিমনের মেধা ও আগ্রহ দেখে তাকে যুক্ত করা হয় বিশ্ব ব্যাংক ও PKSF-এর অর্থায়নে পরিচালিত RAISE Project (Recovery and Advancement of Informal Sector Employment)-এর আওতায়।
এখানে এসে রিমন শুধু ঋণ পাননি, বরং পেয়েছেন একজন প্রকৃত সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন।
SARPV-এর আয়োজনে তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ১৬ দিনব্যাপী "ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগ উন্নয়ন প্রশিক্ষণ" সম্পন্ন করেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল—ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং জীবন দক্ষতা (Life Skills) উন্নয়ন প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে রিমন তার ব্যবসায়িক মডেলে আমূল পরিবর্তন আনেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন—"শুধু জ্ঞান কোনো শক্তি নয়, প্রয়োগকৃত জ্ঞানই আসল শক্তি।"
মাত্র ২ লাখ টাকার প্রাথমিক পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসাটিতে RAISE প্রজেক্টের আওতায় ৫ লাখ টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা (হ্রাসকৃত সার্ভিস চার্জে) যুক্ত হয়।
যে রিমন একসময় অন্যের প্রতিষ্ঠানে ২,০০০ টাকা বেতনে কাজ করতেন, আজ তার প্রতিষ্ঠানে ১৯ জন স্থানীয় তরুণের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে।
বর্তমানে ‘টিউলিপ ম্যাট্রেস এন্ড বেডিং হাউস’-এর মোট ব্যবসায়িক সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকায়! সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে রিমনের বর্তমান মাসিক নিট আয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা।
রিমন এখন চকরিয়া ও সমগ্র কক্সবাজার অঞ্চলের তরুণদের জন্য এক অনন্য রোল মডেল।
যে ক্ষুদ্র উদ্যোগ একসময় টিকে থাকার লড়াই করছিল, তা আজ স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
রিমন প্রমাণ করেছেন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণেরাও জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে। আগামীতে তার এই ম্যাট্রেস শিল্পকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি, যেখানে আরও শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে।
মানব সক্ষমতার এই অভাবনীয় বিকাশই PKSF, বিশ্ব ব্যাংক এবং SARPV-এর মূল লক্ষ্য।
টেকসই উন্নয়ন এবং তরুণদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে।
#কর্মসংস্থান #সফলতারগল্প #চকরিয়া #কক্সবাজার #ব্যবসাঋণ #উদ্যোগউন্নয়ন #দক্ষতাউন্নয়ন