21/09/2026
বিচারহীন প্রতিটি মৃত্যু পরবর্তী মৃত্যুর অনুমতিপত্র
আগুনে পুড়ে, বিল্ডিং ধসে, কেমিক্যালের আগুনে, কিংবা ব্রয়লার বিস্ফোরণে মৃত্যুর মতো যন্ত্রণাকাতর বীভৎস মৃত্যু আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনে এই ধরণের মৃত্যুর ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা সব থেকে বেশি। তাজরীন, রানা প্লাজা এমন এক ঘটনা, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন কয়েক হাজারের শিল্প কারখানার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা।এর পরেও বাংলাদেশে কত ট্যাবলেট, টেকনিক, হেকমত এসেছে কিন্ত তারপরও সেই মিছিল থামাতে পারেনি।তাজরীন-রানা প্লাজার পরে বাংলাদেশজুড়ে কর্মক্ষেত্র ও শিল্পকারখানায় সংঘটিত ১৭টি বড় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় মোট ৩৫৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাঁদের মধ্যে ১৮৪ জন শ্রমিক বলে সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে (সামগ্রিক হিসেব)। এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল অগ্নিকাণ্ড, বয়লার ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, রাসায়নিক বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শ, ভবনধস, বিপজ্জনক পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণ, অপর্যাপ্ত বহির্গমনব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাবিধির দুর্বল প্রয়োগ। মাল্টিফ্যাবস (২০১৭) এখনো অনেকের স্মৃতিতে আছে, ১৪ আগস্ট বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ফেরদৌস স্টিলের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ এমটি রাসির (IMO 9176008) ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে নয়জন শ্রমিক মারা যান, একমাস পরে আজকে প্রীতি গ্রুপএর ৭ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা মনে করেন সংখ্যা আরো বেশি। জীবন কোনো সংখ্যা নয়, একটি মৃত্যুও মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
যেকোনো জাতি তার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শেখে যেন অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়।বাংলাদেশ পোশাক খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট মালিক, সরকার, কিছু ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা এনজিও শেখে কিনা সে বিষয়ে একজন শ্রমিক নেত্রী প্রশ্ন তুলেছেন আজ। একটি গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেলো একটি শ্রম কমিশন হলো কিন্তু একজন শ্রমিক মারা গেলে তার ক্ষতিপূরণ ২ লক্ষ টাকা বাংলাদেশ শ্রম আইনে থেকেই গেলো।কোনোভাবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক টেকনিক দিয়ে এটির পরিবর্তন করা গেলো না! শ্রমিক মারার এতো সস্তা লাইসেন্স পৃথিবীর অসভ্য দেশে ছাড়া কোথাও পাওয়া যাবে না নিশ্চিত। সভ্যতার মাপকাঠি হলো যে শ্রমিকের শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতি চলে, সেই শ্রমিককে মেরে ফেললে বিলিয়ন ডলার রপ্তানিকারক মালিকরা মাত্র ২ লক্ষ টাকা দিয়ে আইনের দ্বারা বিশুদ্ধ হয়ে যাবেন। একজন শ্রমিকের জীবনকে মাপা হবে মাত্র ২৭ সেট ডেনিম বিক্রির এর মূল্যের দিয়ে!
বাংলাদেশের আদালতে রানা প্লাজা বা তাজরীন এর শ্রমিকদের বিচার হলো না এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। কিন্ত এসব নিয়ে কোনো সভা-সেমিনার এ খুব কমই আলোচনা হয়। আলোচনা হয় "জাস্ট ট্রানজিশন" নিয়ে, লাল-সবুজ রং দিয়ে জ্বলজ্বলে পোস্ট কার্ডে ক্যাম্পইন হয় "জলবায়ু পরিবর্তন" নিয়ে কিন্তু একটি মৃত লাশের দাম যে দুই লক্ষ টাকা হতে পারে না, একথার দাবি পোস্টকার্ড কথা বলে না। কারণ ডোনাররা বা বায়ার এসব বিষয়ে আগ্রহী নয়; ডোনারের আগ্রহ দিয়ে এদেশে শ্রমিক আন্দোলনের এজেন্ডা নির্ধারণ হয়ে। শ্রমিক আন্দোলনের এজেন্ডা নির্ণয় হয় ব্যাংকক, কলম্বো কিংবা কাঠমান্ডু অথবা জেনেভা, নিউ ইয়র্ক সানফ্রান্সিসকো, ফ্রাঙ্কফুর্ট কিংবা স্টকহোমের ট্রান্সন্যাশনাল সেমিনার রুমে, সেখানে মৃত শ্রমিককের আর্তনাদ চাপা পড়ে যায়। বায়ার আগ্রহী "রাইটস হোল্ডারস ফোরাম" নিয়ে, এসব আবার তারা নিজেরা করে না, করে ফাউন্ডেশন দিয়ে, এনজিওর মাধ্যমে, লেবার এনজিও দিয়ে। যেসব ব্রান্ডের টাকায় রাইটস হোল্ডারস ফোরাম হয়, ঠিক একই ব্রান্ডের কারখানায় ৭ জন শ্রমিক মারা যায়। এখন কি রাইট হোল্ডারস ফোরাম ক্ষতিপূরণ আদায় করবেন আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুসারে এক জীবনের ক্ষতিপূরণের সমান? কারণ শ্রমিকের জীবনকে ডিও ডিলিজেন্স এর বিবেচনার আওতায় আনবেন? মাননীয় এনজিও প্রধানরা কি বলবেন রানা প্লাজা আর তাজরীন এর বিচার সম্পন্ন করতে হবে অবিলম্বে। এধরণের রায়ের বিচার যেকোনো দেশে আইন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। মাননীয় বিজ্ঞ আদালতের বিচারক কি একটু বিবেকটি জাগ্রত করবেন, বলবেন যে ন্যায় বিচারই হলো প্ৰতিষ্ঠানের প্রথম ও প্রতিষ্ঠানের প্রধান ধর্ম? আপনার কলমখানি অন্তত একটি সত্য কথা বলুক।
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর আপনাদের রিপোর্টে কি বলবে শ্রমিকের জীবনও মালিকের জীবনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, নিশ্চিত করবেন যে শ্রমিক বাড়িতে সন্তান, বৌ, বৃদ্ধ-বাবা মা আত্মীয় পরিজন রেখে আসেন তাদের কাছে কাজ শেষে আবার নিরাপদে ফিরবেন? আপনার বেতনের টাকাটা তাঁদের শ্রম থেকেই কিন্তু আসে। শপথ নেবেন পৃথিবীর সবচেয়ে কম মজুরের কলঙ্ক এই দেশ আর বহন করবে না? সবশেষ একটি কথা বিড়ালের সামনে খাবার থাকলে বিড়াল ইঁদুর ধরে না, ফান্ডিং, কারিগরি সহায়তা ট্রেড ইউনিয়নকে ভোঁতা করে দিয়েছে। এখন দরকার নতুন জেনেরেশনের ইউনিয়ন যারা দাঁড়াবে শ্রমিকের নিজস্ব শক্তিতে শ্রমিকের নেতৃত্বে শ্রমিকের স্বার্থে। বাংলাদেশে মালিকদের আর অজন্তার্জাতিক ব্রান্ডসমূহের শ্রমিকের প্রতি যে মনোভাব তাতে এসব কোনো কিছুই হবে না, মৃত্যুর মিছিল থামবে না, অন্তত বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের ইতিহাস তাই বলে। তাই শ্রমিককে আজ নিজস্ব সংগঠন নিয়ে এসব হত্যার বিচার করার শক্তি অর্জন করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায় বিচার শ্রমিককেই প্ৰতিষ্ঠা করতে হবে, আল্লাহও বলেছে যদি কেউ তার নিজের ভাগ্য পরিবর্তন না করে আমি তার ভাগ্য পরিবর্তন করি না। এই সত্য শ্রমিকদের উপলব্ধি করতে হবে। প্রীতি গ্রুপের শ্রমিকদের হত্যার বিচার চাই।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সোমবার
Content note: This post does not promote or incite violence. It documents workplace deaths in Bangladesh’s industrial sector and raises questions of safety, accountability, and justice.