03/08/2026
ঢাকায় অনুষ্ঠিত বন রক্ষার দাবিতে নাগরিক সমাবেশ থেকে যে স্মারকলিপিটি জমা দেয় হয় তারই একটি সংশোধিত কপি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ময়লার ভাগাড় নির্মাণ বন্ধ করে বিকল্প স্থানে নির্মাণ করার দাবিতে আজকে সকালে স্মারকলিপি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে দেওয়া হয়েছে। ছবিতে রিসিভ কপি সংযুক্ত করা হলো। যদিও এরআগে অনুলিপি ডাকযোগে প্রশাসক ও সিইও বরাবর পাঠানো হয়।
হুবহু নিচে দেওয়া হলো:
স্মারকলিপি
তারিখঃ ৩ আগস্ট, ২০২৬
বরাবর
প্রশাসক
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন
নগর ভবন, গাজীপুর।
বিষয়ঃ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ময়লার ভাগাড় নির্মাণ বন্ধ করে বিকল্প স্থানে নির্মাণ করার দাবি।
জনাব, সবিনয় নিবেদন এই যে, গাজীপুর জেলার বনভূমি বর্তমানে ব্যাপক হারে উজাড়, দখল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বনভূমি সংকুচিত হওয়ার ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও বিচরণপথ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এর বর্জ্য ডাম্পিং এর সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেটির নির্মাণ কাজ চলমান, যা ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বন ও পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অতিদ্রুত নগরায়িত হতে থাকা গাজীপুর জেলার জন্য এই বন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং কার্বন শোষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরের প্রায় ৫,০২২ হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত। হরিণ, বুনো শূকর, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাসস্থল উক্ত বন। ময়লার ভাগাড় থেকে নির্গত লিচেট অর্থাৎ বর্জ্য থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত তরল - মাটি দূষিত করবে ও কৃষিজমি এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যাবে। এর ফলে শুধু পরিবেশ নয়, স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি এবং নিরাপদ পানির উৎসও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে, বনের বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, এমনকি মৃত্যুবরণও করতে পারে। এটি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। বনের ভেতরে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, স্থানান্তরের মতো কার্যক্রম ভাওয়ালের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অপূরণীয় হতে পারে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান 'বন আইন, ১৯২৭'-এর ২০ ধারার অধীনে ঘোষিত একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এছাড়া 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২' অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বা স্তূপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে উদ্যানের সীমানা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ইটভাটা স্থাপনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর জারিকৃত সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতেও স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া উক্ত স্থাপনা 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত, ২০১০)' ও 'পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩'-এর তফসিল-৯ অনুযায়ী অবস্থানগত দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য। একই বিধির অধীনে এটি "হলুদ" শ্রেণিভুক্ত, যেখানে অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। তা সত্ত্বেও কোনো ছাড়পত্র ব্যতিরেকেই বেআইনিভাবে এসটিএস নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড় নির্মাণের এই উদ্যোগ প্রচলিত আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর ৭ ধারায় বনবহির্ভূত কাজে প্রাকৃতিক বন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় বননীতি ২০২৫, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে বন, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় দেশের বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য আপনার কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
দাবিসমূহ:
১। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ও সংলগ্ন এলাকায় আইনবিরোধী সকল অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ করতে পদক্ষেপসহ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃক নির্মিত ময়লার ভাগাড় নির্মাণ কাজ অবিলম্বে বন্ধ করে বিকল্প স্থানে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়াও যেখানে সোর্স থেকে বর্জ্য আলাদাকরণ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৪। সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান ও বিদ্যমান বন ও পরিবেশবিষয়ক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং বনভূমি দখল, অবৈধ নির্মাণ ও পরিবেশবিধ্বংসী সব কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকাধীন বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে উপরোক্ত দাবিসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আপনার আন্তরিক ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।
বিনীত,
পক্ষে,
নয়ন সরকার
পরিবেশ কর্মী
০১৭৭০২৪৬২৪৯
অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধসহ প্রেরণ করা হলো (জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে নয়):
১। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা।
২। মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
৩। মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
৪। প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
৫। সচিব, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
৬। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, নগর ভবন, গাজীপুর।
৭। প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর, বন ভবন, আগারগাঁও, ঢাকা।
৮। জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, গাজীপুর।
৯। পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর গাজীপুর, গাজীপুর। ।
১০। পুলিশ সুপার, গাজীপুর জেলা।