15/01/2023
সাম্প্রতিক সময়ে সিজারিয়ান বেবি খুব একটি আলোচিত টপিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে বাইরে সামনে পেছনে ডানে বায়ে উপরে নিচে যেদিকেই তাকান না কেন সমাজের সর্বত্র কেবল সিজার সিজার আর সিজারের সম্মোহনী আবহবার্তা।দিনকে দিন অবস্থাটা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াচ্ছে যে,সিজারিয়ান ই যেন সন্তান জন্মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।অথচ বছর বিশেক আগেও চিত্রটি এমন ছিল না!ব্যতিক্রম সবকিছুতেই থাকে,জটিলতাও সবখানেই থাকে তবে সেটি হাতে গোনা গুটিকয়েক। প্রকৃতির রীতিবিধান কে অতিক্রম করে মনুষ্যবুদ্ধি কোন কালেই সুষ্ঠু ধারার বিজয় লাভ করতে পারেনি,পারবে না। কথায় আছে---
' যত বুদ্ধি বাড়ে ,তত লক্ষ্মী ছাড়ে।'
হাল আমলে আমাদের মনুষ্য প্রজাতির তেমনি লক্ষীছাড়া দশা বিরাজ করছে। ডাক্তার,গর্ভবতী মা এবং পরিবারের ত্রিমুখী ব্যবস্থাপনায় অবস্থাখানা দাঁড়িয়েছে এমন যে, মাতৃগর্ভে সন্তান যেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আস্তানা গেড়েছে,সিজার ব্যতীত তাকে যেন দুনিয়াতে আনাই সম্ভব নয়!প্রতিনিয়ত সমাজের সর্বত্র এ চিত্র যেন মহামারী রূপ ধারণ করছে! খোঁজ নিয়ে দেখা যাচ্ছে---
গর্ভবতী প্রায় প্রতিটি মায়েরই নাকি গর্ভ জটিলতা বিরাজ করে যেমন: নির্ধারিত সময়ের আগেই গর্ভস্থ ফ্লুইড শুকিয়ে যাওয়া,শিশুর নড়াচড়া ও হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিকতা,প্রসব ব্যথা অনুভূত না হওয়া প্রভৃতি। এই চিত্রের প্রকৃত সত্যাসত্য কতখানি তা আসলে তদন্ত ও ভাবনার বিষয়। চিকিৎসকগণের সাজানো প্রহসন মঞ্চে নীরব কৌশলে চিকিৎসা সেবাটি অতি সন্তর্পণে বাণিজ্যিক পর্যায়ে মোড় নিচ্ছে না তো?গর্ভকালীন সময়ে একজন মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা নাজুক ও দুর্বল থাকে,এক ধরনের অজানা ভীতি ও দুশ্চিন্তাও কাজ করে ভেতরে ভেতরে! এ সময়ে তাকে অনুপ্রেরণা ও সাহস যোগানো অতীব জরুরি। যে কাজটি তার চিকিৎসক,পরিবারের সদস্য ও আশপাশের শুভাকাঙ্ক্ষীগণ খুব সহজেই করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট আমরা ভিন্ন দেখি। সাহসের পরিবর্তে নানা রকম জটিলতা, নেতিবাচকতা ও অপ্রাসঙ্গিক উপদেশে গর্ভবতী মাকে মনের দিক থেকে আরও দুর্বল ও ভীতু করে তোলা হয়। যা একজন মাকে সিজারিয়ান বেবি গ্রহণে আগ্রহী করে।
'The Painful Truth About Childbirth and Modern Maternity Care'গ্রন্থের লেখক জেনিফার ব্লক বলেন, 'ধরুন, আপনি একটি রেস্টুরেন্টে গেলেন, আরাম করে টেবিলে বসলেন কিন্তু কোন খাবারের অর্ডার দিলেন না।ফলে স্বাভাবিকভাবেই রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ আপনার কাছ থেকে কোন পয়সাই নিতে পারল না। হাসপাতাল / ক্লিনিকে গিয়ে সিজার ব্যতীত সন্তান প্রসব করাও অনেকটা তেমনি।'
অনেকের মাঝে একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, নরমাল বেবি অপেক্ষা সিজারিয়ান বেবি অধিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হয়ে থাকে।বাস্তব কথা হচ্ছে--- একজন নিজের বুদ্ধি বিবেচনা খরচ করে নিজে নিজে পথ চিনে গন্তব্যে পৌঁছালো, আর একজন চোখ-কান বন্ধ করে বসে থেকে অন্যের সহযোগিতায় গন্তব্যে পৌঁছালো।অভিজ্ঞতা ও কর্ম তৎপরতার দিক থেকে তাহলে কে এগিয়ে থাকলো? বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টেলিজেন্সি তো এখানেই বিবেচ্য হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনের প্রথম দিনগুলোতে যেসব ক্ষুদে অনুজীব আমাদের শরীরে এসে স্থান করে নেয়, তারাই পরবর্তীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবাণুগুলোকেও প্রতিহত করে। স্বাভাবিক প্রসবকালে মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিশুর শরীরে এরকম প্রায় ১০০ প্রজাতির উপকারী ব্যাকটেরিয়া এসে জমা হয়। অন্যদিকে সিজারিয়ান শিশুরা এসব উপকারী অনুজীব হতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকে। ফলে পরবর্তীতে তারা শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যা এলার্জি এজমা ও দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
এছাড়া বৃটিশ মেডিকেল জার্নাল পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা: জোস ভিলার ৪১০ টি ল্যাটিন আমেরিকান হাসপাতালের ৯৭,০০০ ডেলিভারি রিপোর্ট অনুসন্ধান করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় সিজারিয়ান করা মায়েদের মৃত্যু ঝুঁকি তিনগুণ বেশি থাকে। রিপোর্টে বলা হয় স্বাভাবিক প্রসবে যেখানে মায়েদের মৃত্যু ঝুঁকি ০.১% সেখানে সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে ০.৪% । বিশেষজ্ঞদের মতে সিজারের ঝুঁকি বহুমুখী। মূত্রথলি ও অন্ত্রে অস্ত্রপচার জনিত আঘাতের ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, মারাত্মক রক্তক্ষরণ ,জরায়ুতে জীবাণু সংক্রমণজনিত সমস্যা এমনকি অপারেশনের ক্ষত শুকাতে জরায়ুর টিস্যুতে যে পরিবর্তন ঘটে তাতে ভবিষ্যৎ গর্ভধারণও তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক সময় সিজার পরবর্তী জটিলতায় নবজাতককে মায়ের স্তন্যদানে বিলম্ব ও বিঘ্ন ঘটে এমনকি প্রসব পরবর্তীকালে মায়েদের মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় ব্রেন স্ক্যান রিপোর্টে দেখা গেছে, মা ও শিশুর আত্মিক বন্ধন বা গভীরতম সম্পর্ক তৈরিতে সিজারিয়ান একটি মারাত্মক বাধা। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীগণ বলছেন, স্বাভাবিক প্রসবকালে যখন জরায়ুতে সংকোচন ঘটে তখন মায়ের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড হতে 'অক্সিটোসিন' নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। যা মা ও সন্তানের মাঝে মমতার সেতুবন্ধন ও সুষম আত্মিক যোগাযোগ রচনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সিজারের পুরো প্রক্রিয়াতে এই হরমোনের কোন ভূমিকা না থাকায় পরবর্তীকালে এসব মায়েদের বিষন্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে।
এছাড়া সিজারিয়ান অপারেশনে ব্যথা নাশক ও চেতনা নাশক যে সকল ইঞ্জেকশন ব্যবহৃত হয় সেগুলোও মা ও শিশুর শরীরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রসূতির মেরুদণ্ডের ভেতরের স্নায়ুতে চেতনা নাশক ইঞ্জেকশন যথাযথ ভাবে Push করতে না পারার কারণে প্রসূতি মাকে বিভিন্ন রকম জটিল ও কঠিন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয়। যা মা শিশু ও বিশ্ব মানবতার অপূরণীয় ও চরম ক্ষতি!
তাই দেখা যাচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশন মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ।একান্ত জরুরী না হলে এই পন্থার অবলম্বন মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর রিপোর্ট অনুসারে গোটা বিশ্ব জুড়ে যত সংখ্যক সিজারিয়ান অপারেশন ঘটছে তার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় ও ঐচ্ছিক সিজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতাল ও ক্লিনিক গুলো এক্ষেত্রে পরিচালিত হচ্ছে মুনাফার চিন্তাধারণা দ্বারা। হেন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সকলের সম্মিলিত সচেতনতা ও ইতিবাচক পদক্ষেপ দরকার। আমাদের প্রত্যেককে স্মরণ রাখতে হবে যে,স্বাভাবিক প্রসব সবসময়ের জন্যই ভালো। দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের স্বার্থে সাময়িক ব্যথা ও ছোটখাটো জটিলতাকে সহ্য করবার মত মানসিক শক্তি রাখা সকলের জন্য একান্ত আবশ্যক।
এ ব্যাপারে সম্মানিত চিকিৎসকগণের প্রতি বিনীত আরজ রাখি,মানবসেবার মহান ব্রতের দীক্ষা নিয়ে চিকিৎসা সেবার অঙ্গনে পদার্পণ করে অনুগ্রহপূর্বক আপনারা ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে নিজেদেরকে তুচ্ছ বানাবেন না। বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা বাণিজ্যের ভয়াল ফাঁদরূপী অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের ভয়াবহতা হতে বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করায় আপনাদিগের সদয় অবগতি ও তৎপর ভূমিকা
প্রার্থনা করি।
তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট (জুলাই ২০১১)।
---সিজারিয়ান বেবি:
চিকিৎসা বাণিজ্যের ভয়াল ফাঁদ
আক্তারুন্নাহার রেহানা
তারিখ : ১৫.০১.২০২৩ খ্রি.।