18/03/2024
পবিত্র গণতন্ত্র, অলঙ্ঘনীয় বাকস্বাধীনতা, সর্বজনীন মানবাধিকার ইত্যাদি
-------------------------------------
যে আইডিওলজি বা ভ্যালু সিস্টেমগুলো পশ্চিমা সভ্যতায় চর্চা করা হয়, সেগুলো চর্চা করা হয় তাদের কলোনিয়াল হেজিমনি ধরে রাখার স্বার্থে। যেমন গণতান্ত্রিক বিভিন্ন চর্চা -- নির্বাচন, মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এই চর্চাগুলো পশ্চিমা দেশে প্র্যাকটিস করা হয় এবং প্রাচ্যে প্রোমোটও করা হয় -- কিন্তু সেটা ততক্ষণ, যতক্ষণ সেটা তাদের কলোনিয়াল হেজিমনি ধরে রাখার পক্ষে সহায়ক টুল বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে কাজ করে।
এ কারণে সেলেক্টিভলি অনেক দেশে গণতন্ত্রের কোনো চর্চা না থাকলেও এটা নিয়ে পশ্চিমাদের কোনো মাথাব্যথা নাই। ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা -- এই টুল বা অস্ত্রগুলো ব্যবহারের অলিখিত প্রযোজ্য শর্ত হচ্ছে এগুলো শুধুমাত্র অ-লিবারেল ধ্যানধারণার অবমাননা এবং লিবারেল নষ্টামিকে প্রোমোট করার জন্য ব্যবহার করা যাবে। কেউ যদি নির্বাচন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার এসবকে পশ্চিমা হেজিমনির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করে, তখন পশ্চিমা শক্তি খুব কঠোরভাবে তাদেরকে দমন করে প্রচণ্ড ভায়োলেন্স কিংবা দমনমূলক আইনের মাধ্যমে -- এরকম উদাহরণ শয়ে শয়ে, তাদের দেশে এবং দেশের বাইরে। আপনি তার অস্ত্র দিয়ে তাকে ঘায়েল করবেন -- এতটা বোকা তো সে না।
গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, নির্বাচন -- এগুলো হচ্ছে একেকটা মূর্তির মতো, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতি ধরে রাখার জন্য কলোনিয়াল ব্যবস্থার হর্তাকর্তারা এগুলোর উপাসনা জারি রাখে, তবে যখন দরকার নেই সেগুলো নদীতে ফেলে দেয়। এগুলোর জন্ম হয়তো কল্যাণকামিতা বা নৈতিকতার খাতিরে কিংবা কোনো এক্সট্রিম ট্রমাটিক যামানায় হয়েছিল, কিন্তু কুফর সভ্যতার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী -- অল্প কিছু লোক, যাদেরকে কুরআনের ভাষায় বলে আল-মালা বা এসটাবলিশমেন্ট তারা নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে এগুলোকে মূর্তির মতো গড়ে আর ভাঙ্গে।
উপনিবেশকাল থেকে বিমূর্ত এই ধ্যানধারণাগুলো মুসলিমদের সামনে খুব আকর্ষণীয়, চলনসই, ফেয়ার একটা ভ্যালুসিস্টেম হিসেবে হাজির করানো হয়েছে আর ইসলামকে সিস্টেম্যাটিক্যালি উপস্থাপন করা হয়েছে অকার্যকর, অন্যায্য একটা ধর্ম হিসেবে -- যেকারণে এই শতকে তাই মুসলিমরা মুসলিম নাম ও নামস্বর্বস্ব কিছু প্র্যাকটিস চালু রেখে ইসলামকে কোনোরকমে ধরে রেখেছে কিন্তু মন-মননে এই কলোনিয়াল যুগে নির্মিত মূর্তিগুলোকে ধারণ করে রেখেছে।
এই মূর্তিগুলো তাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, এটাই তাদের কাছে একমাত্র বাস্তবতা -- মেইড বাই ওয়েস্ট সিস্টেমের বাইরে কিছু নেই, থাকতে পারে না, যা কিছু করার এর মধ্যে থেকেই করতে হবে, ইসলামকে এর মধ্যে যতটুকু 'ফিট' করানো যায়, ততটুকুই বড়জোর সম্ভাব্য লক্ষ্য, সর্বোচ্চ চাওয়া। এমনকি, যেসব মুসলিম ইসলামে সিরিয়াসলি বিশ্বাস করে, ইসলামের বাস্তবায়ন ও বিজয় দেখতে চায়, তাদের মধ্যেও একটা বড় অংশ এই 'ঘোর' থেকে বের হতে পারে না, চায় না - এ যেন কারাগারের চমতকার ব্যবস্থাপনা আর নিয়মনীতিতে মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করতে চাওয়া, লক্ষ্য তার একটি বড়সড় প্রকোষ্ঠে বাকি জীবন আরামসে কাটিয়ে দেওয়া!
পশ্চিমা সভ্যতার রোশনাই লাগা চোখে মনের এই বন্দীত্ব এতটাই স্বাভাবিক, চিন্তার এই শৃঙখল এতটাই ভারি, পশ্চিমা চশমায় দেখা দুনিয়াটা এতটাই বাস্তব যে -- কেউ যখন এই চশমা ছুঁড়ে, শৃঙখল ভেঙ্গে, মনের এই প্রাচীর টপকে বের হয়ে আলো ধরার বাসনা রাখে -- সেটা স্বেচ্ছাবন্দীদের কাছে প্রতিভাত হয় পাগলামি, মূর্খতা কিংবা চিন্তাপরাধ হিসেবে।
মুক্তির প্রথম ধাপ অন্ধকারের প্রতি এই অভ্যস্ততা, ঔদাসীন্য আর মুগ্ধতা থেকে মুক্তি। Zim Tanvir Hafi