14/05/2025
মঙ্গল- অমঙ্গলের নদী ভদ্রা!
-ডক্টর প্রণব কুমার রায়
দাকোপ উপজেলার পূর্ব সীমানার নদী পশর আর পশ্চিম সীমানায় শিবসা নদী। পূর্ব পারে মোংলা আর পশ্চিম পারে পাইকগাছা উপজেলা। তিনটি দ্বীপের সমষ্টি দাকোপ। পশর নদীর সন্নিকটস্থ চালনার দক্ষিণ পাশ দিয়ে কূল কূল রবে পশ্চিম দিকে বয়ে চলেছে চুনকুড়ি নদী। দাকোপ ওয়াপদা অফিসের পূর্বে 'খনা' নামক স্থানে চুনকুড়ি নদী মিলিত হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে বয়ে আসা ঢাকী ও ভদ্রা নদীর সাথে। বস্তুত ভদ্রা-ঢাকী ও চুনকুড়ি নদীর সঙ্গমস্থল হচ্ছে দাকোপের 'খনা' নামক স্থান। পূর্বে এখানে ছিল দাকোপ থানা বা প্রশাসনিক দপ্তর। নদী গর্ভে বিলীন প্রাচীন দাকোপ থানা। আজ শুধু তিন নদীর কল কল ধ্বনি। স্থাপত্যের কোন নিদর্শন নেই এখানে। প্রবীণ ব্যক্তিরা নদী পথে চলার সময় স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, "ঐ খনার পারে একদিন থানা ছিল, হাসপাতাল ছিল। আজ নদী গর্ভে সব বিলীন।"
ঢাকী নদীর সহোদরা ভদ্রা নদী পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দাকোপ হাই স্কুল বামে রেখে এগিয়ে চলেছে কামারখোলা ইউনিয়নের থান্দারের ভাঙ্গন নামক স্থানে। এরপর সোজা দক্ষিণে বাঁক নিয়ে কালীনগর বাজার ডানে রেখে রামনগর, শ্রীনগর অতিক্রম করে একপারে সুন্দরবন, অপর পারে সুতারখালী ইউনিয়নের পাশ ঘেঁষে এঁকে বেঁকে বিচিত্র ভঙ্গিমায় কালাবগী নামক স্থান অতিক্রম করার পর শিবসা নদীতে মিলিত হয়ে ভয়াল রূপ ধারন করেছে।
ভদ্রা নদী পারের মানুষ মনের দুঃখে বলে, "ভদ্রা গাঙ যতটা ভদ্র ততটা অভদ্র।" কেন যে দুপারের লোক এমন কথা বলে তার নিশ্চয়ই কারন আছে। যে নদী দিয়ে তারা শহর-বন্দরে যাওয়া আসা করে, যে নদীর জল দিয়ে ফসল ফলায়, যে নদীতে মাছ ধরে, চৈত্র সংক্রান্তির দিন কুলার স্নান পালন উপলক্ষে আবাল বৃদ্ধ বনিতা জলে নেমে সাঁতার কাটে, গঙ্গাদেবীর পূজা করে সিদুর ভাসিয়ে দেয়-সে নদীর নামে কেন তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে-সে ইতিহাস বড়ই মর্মন্তুদ, হৃদয় বিদারক। কিন্তু কিছুই যখন বলার থাকে না, করার যখন কিছুই থাকে না তখন বুকে পাষাণ বেঁধে থাকা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এ ভদ্রা নদী যে কত পল্লী বধূর সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়েছে-কত শিশুকে করেছে পিতৃ-মাতৃহারা তার ইয়ত্বা নেই। তার বক্ষের কামোট, কুমির অসহায় মানুষজনকে ভক্ষণ করে উদর পূর্তি করেছে। বৃদ্ধ-পিতা-মাতা বোবা কান্না অথবা চীৎকার করে আর্তনাদ জানিয়েছে-কিন্তু কোন কান্নায় সাড়া দেয়নি সর্বনাশী ভদ্রা নদী। অনাদি কাল ধরে যেন 'কিছুই বোঝে না' এমনি ভাবে সে বয়ে চলেছে আপনগতিতে। অসহায় মানুষ আপনজনকে হারিয়ে শুধু বুক চাপড়াতে চাপড়াতে নিয়তিকে দোষারোপ করে বাড়ি ফিরেছে শূন্য হাতে, শূন্য কোলে। মৃত লাশটিকেও ফিরিয়ে দেয়নি ভদ্রা। এমনি নিষ্ঠুরা অমঙ্গলের প্রতিভূ এ রাক্ষুসী ভদ্রা নদী।
পঞ্চাশের দশকে কালীনগর গ্রামের সনাতন মোড়ল তার ভাইপো মথুর ও পুত্র শিরিষকে নিয়ে গেলেন চালনা হাটে বর্ষাকালে ধান রোয়ার কিষান আনতে। সনাতন মোড়লদের ৪০০ বিঘা সম্পত্তি। অবস্থাপন্ন পরিবার। সুতরাং বড় নৌকা করে চালনা হাট থেকে ১৫-২০ জন জোন নিয়ে ভদ্রা নদী দিয়ে সন্ধ্যার সময় কালীনগর ঘাটে পৌঁছালেন। নদীতে তখন ভাটার স্রোত তীব্র। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই জোনরা একসাথে নৌকার গলুইয়ে এসে তীরে নামা শুরু করল। আর এখানেই ঘটলো বিপত্তি। নৌকার মাথা জলের নিচে চলে গেল। তরতর করে জল উঠলো নৌকায়। অকস্মাৎ ডুবে গেল নৌকা। 'বাঁচাও' 'বাঁচাও' আর্তনাদ। শিরিষ, মথুর ডুবন্ত প্রায়। ভাইপো ও পুত্রের এ মুমূর্ষু অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন সনাতন মোড়ল। দু ছেলেকে দু হাত দিয়ে ঠেলে দিলেন ডাঙার দিকে। শিরিষ মথুর মাটি আকড়ে ধরলো। আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠল। কিন্তু তাদের পিতা ও কাকা সনাতন! তার কি অবস্থা? তখন অন্ধকার। সবাই উঠলেও সনাতনকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। 'সনাতন' 'সনাতন' আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ছুটে এলেন বাড়ির সবাই। হ্যাঁচাক লাইট জ্বালা হলো কয়েকটা। নৌকা করে ভদ্রা নদীর এপার ওপার চললো তল্লাশী। সনাতনকে আর পাওয়া গেল না। পরদিন চললো অপেক্ষার পালা। অন্তত লাশটা যদি পাওয়া যায়। কিন্তু সব আশা বৃথা। রাক্ষুসী ভদ্রার বুকে লালিত কামোটের পেটে চলে গিয়েছে সনাতনের সুঠাম দেহ। সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল সনাতনের স্ত্রীর। দু পুত্র মাণিক আর শিরিষ হারালো পিতাকে। পূর্ব গতিতে বয়ে চলেছে ভদ্রা। যেন কিছুই সে জানে না।
'৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে সকলে ভারত থেকে বাড়ি ফিরেছে। সর্বসান্ত মানুষ। কিছু নেই। সব শেষ। শ্রীনগর গ্রামের রতন বড়ই গরীব। খ্রিস্টান মিশন থেকে সাহায্য পেল ঘর বাঁধার জন্য বেশ কয়েকটা বাঁশ। শ্রীনগর নিজ বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। নৌকা করে নিয়ে যাবার পয়সা নেই। ঘাড়ে করে কালীনগর মিশন বাড়ি থেকে শ্রীনগর পরান রায়ের বাড়ি পর্যন্ত বহন করা আদৌ সম্ভব নয়। অগত্যা মাথায় একটা বুদ্ধি এলো রতনের। সমস্ত বাঁশ নদীতে একত্রে বেঁধে ভাটার সময় বাঁশের ভেলায় উঠে পড়লো রতন। স্ত্রী বিন্দেকে বলে এসেছিল দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে। কালীনগর বাজারের অনেকে দেখেছিল রতনকে বাঁশের ভেলায়। ঐ তো দেখা যাচ্ছে বাঁশের ভেলা। কিন্তু কই! বাঁশের উপর তো কেই নেই। মহা দুশ্চিন্তায় পড়ল বিন্দে। বাড়ির লোক এগিয়ে এলো। বেলা গড়িয়ে বিকাল হলো। রতন আর ফিরে এলো না। সকলের ধারনা, বাঁশের ভেলার উপর থেকে কুমিরে নিয়ে গেছে রতনকে। ভদ্রা নদীর সন্তান কুমিরের উদর পূর্তি হয়েছে রতনের তাজা দেহ দিয়ে।
ঘর নেই, স্বামী নেই। দিশেহারা বিন্দে। কোথাও ঠাঁই নেই। বাড়ির কর্তা পরান রায় এলাকার সর্বজন পরিচিত দোকানদার। তিনি বিন্দেকে নিয়ে কালীনগর বাজারের প্রথিতযশা ঠাকুর ডাক্তার শ্রী নারায়ণ চক্রবর্তীর বাসায় এলেন। সব ঘটনা শোনার পর ঠাকুর ডাক্তার বিন্দেকে বাড়িতে পরিচারিকা রূপে কাজ করতে স্থান দিলেন। সিঁথির সিদুর চিরতরে মুছে গেল বিন্দের। বৈধব্যের সাদা শাড়ি তুলে নিল সে। ভদ্রা নদীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে চোখের জল ফেলে আজীবন বিন্দে। কিন্তু ভদ্রা
দুহিতা কামোট, কুমির নিশ্চিন্তমনে খেলা করছে মাতৃউদরে।
কামারখোলা গ্রামের পুরোহিত বিজয় ব্যানার্জী। পৌরহিত্য কাজে তার বেশ সুনাম। কি যেন এক বিশেষ কাজে বাড়ির সামনে থান্দারের ভাঙ্গনের কাছে জোয়ারের সময় ভদ্রা নদীতে নেমেছেন। পিছনে তাকিয়ে দেখেন নদীর জল লাল। লাফ মেরে ডাঙ্গায় উঠলেন বিজয়। হাঁটু ও গোড়ালির মাঝের নরম মাংসের কিছুটা নেই অর্থাৎ কামোট এক খাবলা মাংস শানিত দাঁত দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ থাকলে ভদ্রার সন্তান কামোটকূল বিজয় ব্যানার্জীর পুরো দেহটা গ্রাস করতো।
কৈলাশগঞ্জ মুচিরাম মণ্ডলের বাড়ির দেবেন রায়ের ছেলে অচিন্ত্যর বিয়ের আশীর্বাদ শ্রীনগর গ্রামে। দেবেন রায়ের সঙ্গে এসেছে ভাইপো সন্তোষ। বাড়িতে তার শিশু পুত্র মধু। আশীর্বাদ কার্য সম্পন্ন করে রামনগর ঠাকুর বাড়ির খেয়া নৌকায় উঠেছেন সবাই। লোকজন একটু বেশি উঠেছেন নৌকায়। খরস্রোতা ভদ্রা নদী। নৌকা কূলের কাছে ভিড়ালো। সবাই একসাথে নামতে যেয়ে নৌকা গেল ডুবে। দেবেন রায়ের ভারী শরীর। সন্তোষ দেখলো কাকা ডুবে যাচ্ছে। মুহূর্তে ঝাঁপ দিয়ে কাকা দেবেন রায়কে পিঠে করে তীরে ঠেলে দিল। দেবেন রায় মাটি হাতড়ে ধরল। আর সন্তোষ? সে তলিয়ে গেল জলের তলায়। সন্ধ্যা সমাগত। 'সন্তোষ', 'সন্তোষ' আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠলো ঠাকুর বাড়ির খেয়া ঘাট।
রাত ঘনিয়ে এলো। মুচিরাম মণ্ডলের বাড়ির ও গ্রামের লোকজন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় এগিয়ে এলো সকাল বেলায়। তন্ন তন্ন করে খুঁজলো সন্তোষের দেহ। অবশেষে তেলির কোনার বিপরীতে জঙ্গলের তীরে সন্তোষের মৃতদেহ পাওয়া গেল। শরীরের অনেকাংশ কামোটে খেয়ে ফেলেছে। সন্তোষের স্ত্রী দেহে তুলে নিল শ্বেত বস্ত্র। আজীবন বৈধব্যের যন্ত্রণায় ছটফট করতে হলো তাকে। মধু হারালো তার বাবাকে চিরতরে। কিছুই এসে যায় না ভদ্রার। সে নির্বিকার। আপন গতিতে চিরচঞ্চলা নারীর মতো নৃত্যরতা সে। কল-কল ছল-ছল রবে বয়ে চলেছে চিরলাস্যময়ী ভদ্রা।
ভদ্রা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরা হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে সামান্যতম হলেও সদয়া হয়। কালীনগরের বনমালী মোড়লের কনিষ্ঠপুত্র বিজয়ের সাথে সুতারখালী ফরেস্ট অফিসারের ছিল বন্ধুত্ব। একদিন কার্যোপলক্ষে ফরেস্ট অফিসার এবং বিজয় যান জঙ্গলে। সুতারখালী অফিসের পাশে ভদ্রা নদীতে অসাবধানতাবশত ফরেস্টারের বন্দুক জলে পড়ে যায়। সরকারী সম্পদ। বিজয় বিষয়টি তার বড়দা লক্ষ্মণবাবুকে বলেন। লক্ষ্মণবাবু তখন কালীনগর গ্রামের ডুবুরী শীতলকে ডেকে বন্দুকটি উদ্ধার করতে বলেন। শীতল ছিলেন দক্ষ ডুবুরী। জলে ডুবতে ডুবতে তার কানের পর্দা ফেটে যায়। কানে কম শুনতো-এজন্য এলাকায় সে 'কালাশীতল' নামে সমধিক পরিচিত। যাহোক ফরেস্টার নদীতে নির্দিষ্ট স্থান দেখালে পর শীতল ডুব দিয়ে বন্দুক তুলে আনে। কামোট-কুমির কোন ক্ষতি করেনি শীতলের। ভদ্রা নদী এক্ষেত্রে সামান্যতম হলেও দয়াপরবশ হয়েছিল। 'পুরস্কার হিসেবে ফরেস্টার প্রতিবছর শীতলকে একভরা করে জ্বালানী কাঠ দিতেন।দাকোপের ওয়াপদা অফিস থেকে কালাবগী পর্যন্ত প্রবহমান ভদ্রা নদীর দু'তীরের অসংখ্য মানুষের বেদনার্ত হৃদয়ের হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে চিরকাল ধরে। ভদ্রা আগের মত বইছে কিন্তু সেই মানুষগুলি তো আর নেই। তাই ভদ্রা নদীর কাছে প্রশ্ন:-
বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে ভদ্রা বইছো কেন?
রামনগর বীণাপাণি হাইস্কুলের পাশের বাড়ির দুই ভাই ভদ্রা নদীতে মাছ ধরছে। বড় ভাই খ্যাপলা জালের দড়ি ধরে আছে হাঁটু জলে আর ছোট ভাই চরে খারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কুমির এসে বড় ভাইকে ধরে নিয়ে জলের মধ্যে চলে গেল। ছোট ভাই অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে রইল।
বাজুয়া সুরেন্দ্র নাথ কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে সাব রেজিস্ট্রার বাবু নিরঞ্জন রায়ের বাড়ি কালাবগী গ্রামে। তাঁর বাবা ১৯৯০ সালের ৩রা ভাদ্র নৌকা করে বাড়ি থেকে বাজুয়া আসছিলেন। সুতারখালি ফরেস্ট অফিসের বাঁক ঘুরতেই তীব্র স্রোতে নৌকা গেল উল্টে। সলিল সমাধি হলো তার। বহু খোঁজাখুঁজির পর তার লাশ পরদিন পাওয়া গেল ভদ্রার চরে। ভদ্রার বড় বৈশিষ্ট্য-চলার পথে হঠাৎ বাঁক নেয়া। বলতে গেলে ৯০° কোণে অর্থাৎ সমকোণে বাঁক নেয়া। বড় বড় নদী থেকে ভদ্রার এ আলাদা বৈশিষ্ট্য। যেমন থান্দারের ভাঙনের নিকট, আবার সুতারখালি ফরেস্ট অফিসের এবং তেলির কোনায় মোটকথা কয়েক মাইল পর পর হঠাৎ বাঁক নেয়া। আর হঠাৎ বাঁক নিলে স্রোতের তীব্রতাও বাড়ে। সেই সাথে শুরু হয় ভাঙ্গন। যেমন থান্দারের ভাঙ্গন, রামনগর বৃহস্পতিবার হাটের কাছের ভাঙ্গন। তাহলে ছোট নদীর গতিবিধি, চালচলন কি হঠাৎই হয়? ভদ্রার সহোদরা ঢাকী নদীরও ঠিক একই বৈশিষ্ট্য। এ দুই-নদী চলার পথে বহু ঘর-বাড়ি জনপদ আপনগর্ভে বিলীন করেছে। বহু পরিবারকে করেছে গৃহহীন। বহু মায়ের বুক করেছে খালি। কামোটে যাদের শরীরের মাংসপিণ্ড খেয়েছে তারা 'কামোটে কাটা' এ অভিধায় ভূষিত হয়ে কালাতিপাত করছে। তবু ভদ্রা আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। ভদ্রাকে নিয়ে কত গান, কত কবিতা রচিত হয়েছে। লোককবি ও শিল্পী মনোরঞ্জন সরকারের কবিতায় ফুটে উঠেছে তার চিত্র। ভদ্রা গাঙে চলমান নৌকা দেখে একজন বালিকা বধূ তার মনের কথা প্রকাশ করেছে। কথিত আছে, ভদ্রা গাঙে নৌকা ডুবলে রক্ষা পায় না। উপরন্তু ভদ্রা গাঙ কুমিরের জন্য বিখ্যাত। নিচের গানে ভদ্রা নদীর প্রতি ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে:-
ভদ্রা গাঙে কেডা তুমি যাচ্ছ রে গান গাইয়ে ও খিলে ডিঙ্গির নাইয়ে, (ওরে) এটা কথা শুনে যাও নৌকা চাপায়ে!!
এই না গাঙ্গের আগের বাঁয়ে আমার বাপের ঘর হ্যাঁদে মাথার কিরে দিয়ে তাগে কইও এই খবর
আমার বাপ ভাই গো নেই কি কারো মনে?
এওনা না নিতি আ'লো সারান্দির গোনে, ওরে অ্যাদ্দিন তো নাইয়ের গেছে সকল বাড়ীর মাইয়ে।
নিইনি নায়েব আশায় আশায় গেছে জষ্টিমাস ওরে হ্যাও বেরাও কি ওরা আমারে করবে রে নিরাশ? এই দিনি তো থাকপে ঘরে কত রওমের মিটে মা গড়বে কাঁচি ফোড়া আরো তেলের পিটে।
উগে ক্যামনে পিটে উঠপে গালেরে-উগে ক্যামনে পিটে ওঠপে গালে আমারে ফেলায়ে।
ভদ্রা নদীর তীরে বাড়ি থাকায় একজন মৎস্যজীবীর গর্ব-ভদ্রার চরে ঘর আমার; আমি সুন্দরবনের জেলে, নিত্য নতুন পয়সা কামাই, আমি নদীতে জাল ফেলে!! জাল নৌকো সাথী আমার কারো আমি ধরিনে ধার, চিন্তে নেই রে খাওয়া পরার জাল ধরলে মেলে মাছ।
নানা রকম জ্যান্ত মাছ হাপোর বোঝাই দিয়ে, নগত টাকায় দেই যে বেচে চালনার হাটে গিয়ে।
রেখা রুচ্চে দাঁতনে কাইন গললা চিংড়ে ভেটকী বাইন, চিতরে পাঙ্গাস পার্শে ভাঙ্গান খুশী সবাই পেলে।'
ভদ্রা নদী মানুষকে এত দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা দেয়। তবু তাকে নিয়ে কত মধুর সঙ্গীত রচনা করে দুপারের মানুষ। কালিনগরের নারীরা কুলার স্নানের দিন কোমর জলে নেমে মধুর সুরে গান গায়। ইংরেজ কবি শেলীর Skylark কবিতার সুরধ্বনি যেন অনুরণিত হয় "Our sweetest songs are those that tell of saddest thought- করুণতম কাহিনীতে মধুরতম সঙ্গীত বাজিয়া ওঠে-"এ যেন
তারই সুরধ্বনি। মানুষ চেয়ে থাকে ভদ্রা পানে, তার তীরে ওড়া, বাইন, কেওড়া, পিঠেকড়া, গোল গাছের দিকে, ছেলে মেয়েরা চরের বন থেকে আহরণ করে কাউফল, বাউলেফল, গোলফল, ওড়া, কেওড়া। ভদ্রার চরে ঘুরে বেড়ায় বাটাং, বক, হালতি, ডাহুক, গালচারা প্রভৃতি পাখি। পূজার পর বিভিন্ন প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় ভদ্রা নদীতে। মরা গরু, পশু পাখি, আবর্জনা সবকিছু বুকে ধারন করে এ পতিত পাবনী ভদ্রা। সব মিলিয়ে অনাদি কালের ভাঙ্গা-গড়ার জীবন স্মৃতি এ ভদ্রা নদী। তাকে ভাল না বেসে উপায় নেই। কারন সকলের রক্ষয়িত্রী দেবী মা দুর্গার বা মহামায়ার আরেক নামই তো ভদ্রা।