17/02/2026
মায়ের প্রতি ভালোবাসা
আজিজুর রহমান মুনিরী
~~~~~~~~~~~~~~~
গল্প শুনতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আর প্রিয় মানুষের মুখ থেকে শুনতে পারলে সে ভালো লাগা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রিয়জনদের জীবনের গল্প হলে তো কথাই নেই—সেটা আলাদা এক আনন্দ।
আমার একজনই খালাম্মা। তিনি আমাকে খুব আদর করেন। তাই খালাম্মাকে কাছে পেলেই গল্প শোনানোর আবদার করি, আর তিনি প্রতিবারই আমার সেই আবদার রাখেন। একদিন তাঁর পাশেই গিয়ে বসলাম। আগের মতোই গল্প শোনানোর অনুরোধ করলাম। খালাম্মা মুচকি হেসে বললেন,
—আজ তোমাকে পীর সাহেব হুজুরের বাড়ির একটা ঘটনা শোনাবো। শুনবে?
আমি তো খুশিতে কথা হারিয়ে ফেললাম। শুধু মাথা কাত করে সম্মতি জানালাম।
খালাম্মা বলতে শুরু করলেন—
একবার পীর সাহেব হুজুরের বাড়িতে হঠাৎ আগুন লেগে যায়; কেউ কেউ বলেন, শত্রুরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। তখন পীর সাহেব কেবলা (আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আবু বকর মুহাম্মদ শামসুল হুদা রহঃ) বাড়িতেই উপস্থিত ছিলেন। আগুন দেখে প্রথমে নিজ হাতে নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু আগুন ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিতে থাকে।
আগুনের খবর পেয়ে গ্রামের মানুষজন, মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা দৌড়ে এসে জড়ো হন। সেই সময় হাফেজ মাওলানা আব্দুর রহমান হানাফি রহঃ–এর স্ত্রী, অর্থাৎ পীর সাহেব কেবলার আম্মাজান, পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে নীরবে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরপাড়ের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন—যেন কোনো পরপুরুষের নজরে না পড়েন।
অন্যদিকে মরহুম সানি রহঃ ব্যাকুল হয়ে মাকে খুঁজতে থাকেন—বাহির থেকে ভেতরে, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়ান। আগুন নেভাতে বহু লোক জড়ো হয়। কিছুক্ষণ পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, আর লোকজন ধীরে ধীরে চলে যায়।
সবাই চলে যাওয়ার পর হুজুরের মা ও স্ত্রী ঘরে ফিরে আসেন। ফিরে এসে দেখেন—গোলার ধানসহ ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। হাল চাষের কয়েকটি গরুও আগুনে পুড়ে মারা গেছে।
সব দেখে হুজুরের আম্মাজান গভীর আফসোস করতে লাগলেন। তখন পীর সাহেব কেবলা শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—আম্মাজান, এসবের জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। এতটুকু সুযোগ ছিল যে গরুগুলো বের করে নিতে পারতাম। কিন্তু মা, আমি তখন শুধু আপনার চিন্তাতেই বিভোর ছিলাম। আপনাকে খুঁজতেই ব্যস্ত ছিলাম। আমার গাফলতিতে আপনার যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না। তাই অন্য কিছুর দিকে ভ্রুক্ষেপ করিনি।
একটু থেমে তিনি বললেন,
—আলহামদুলিল্লাহ, মা আপনি সুস্থ ও নিরাপদে আছেন—এইটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার আর কোনো দুঃখ নেই।