14/06/2026
গবেষণায় ভয়ঙ্কর তথ্য
শিশুদের শরীরে ২টি ছাড়া সব অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর!
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবজাতির সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু ভাবুন তো, যে ওষুধ একসময় কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, তা যদি হঠাৎ করেই শরীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়? আরও ভয়ের ব্যাপার হলো, এই মরণফাঁদের মুখোমুখি এখন আমাদের দেশের ছোট শিশুরা! রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করা সাম্প্রতিক একটি গবেষণা চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, শিশুদের শরীরে প্রথম সারির প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকই সম্পূর্ণ অকার্যকর। কিন্তু কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? আজ আমরা সে বিষয়টিই জানব।
চলুন একটু গভীরে যাওয়া যাক। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিকু/পিআইসিইউ) এ বছরের প্রথম ৪ মাসে একটি গবেষণা চালানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন ৪৯টি শিশুর শরীর থেকে জীবাণুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফলাফল কী এল জানেন? চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই আর কোনো কাজ করছে না! সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রতিটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণু প্রধান ৬টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ, ওষুধগুলো এখন স্রেফ পানি বা চকের গুঁড়োর মতো কাজ করছে, জীবাণুর কিচ্ছু হচ্ছে না! এই মুহূর্তে চিকিৎসকদের সামনে কেবল টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন নামের দুটি ওষুধ কার্যকর রয়েছে। কিন্তু গবেষকদের আশঙ্কা, যেভাবে জীবাণু শক্তিশালী হচ্ছে, তাতে খুব দ্রুতই শেষ অস্ত্র কলিস্টিনও কার্যকারিতা হারাতে পারে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই গবেষণাটি চালান। তাঁরা দেখতে পান, পিআইসিইউতে শিশুদের সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত করছে জটিল জীবাণু, যা মোট সংক্রমণের প্রায় ২৪.৫ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বহুল ব্যবহৃত ইমিপেনেমের ওপর জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা ৯৬.৭ শতাংশ এবং মেরোপেনেমের ক্ষেত্রে ৯৬.৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে! লেভোফ্লক্সাসিনের মতো ওষুধও ৮৪.২ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি টেইকোপ্লানিন নামের আরেকটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বিরুদ্ধেও ১৫.৮ শতাংশ জীবাণু এরই মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
খেয়াল করুন, জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রথম সারির ৬টি ওষুধের গড় রেজিস্ট্যান্সের হার যেখানে ছিল ৮৩.৮ শতাংশ, এপ্রিল মাসে সেটি এক লাফে পুরো ১০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে! এই পরিসংখ্যানটি হাসপাতালজুড়ে একটি বড় ধরনের বিপদের সংকেত।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু আগেও কোনো না কোনো কারণে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছিল, তাদের শরীরে একাধিক ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি! এর পরিণতি কতটা মারাত্মক তা চিকিৎসার সময় দেখলেই বোঝা যায়। সাধারণ জীবাণুর সংক্রমণে একটি শিশু যেখানে গড় ৬ দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে, সেখানে এই সুপারবাগে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে লাগছে দ্বিগুণ সময়। যেসব শিশু ৪৮ ঘণ্টার বেশি ভেন্টিলেশনে থাকে কিংবা দীর্ঘ সময় পিআইসিইউতে অবস্থান করে, তারাও এই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।
এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হচ্ছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যখন-তখন অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। একটু জ্বর বা ঠান্ডা-কাশি হলেই আমরা ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে শিশুদের খাইয়ে দিই। আবার অনেক সময় কোর্সও সম্পূর্ণ করি না। আমাদের এই অসচেতনতাই জীবাণুগুলোকে আরও শক্তিশালী ও সুপারবাগে পরিণত করছে।
সমাধানের পথ তবে কী?
এই গবেষণার পরিধি হয়তো একটি হাসপাতাল এবং ৪৯ জন শিশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এটি পুরো দেশের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। এই ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচার উপায় কী?
গবেষক দল জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন:
১. অকারণে এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
২. হাসপাতালে কঠোরভাবে হাত ধোয়া এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার নিয়ম চালু করতে হবে।
৩. শেষ ধাপের ওষুধগুলোর ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে।
৪. দেশব্যাপী এই সংকটের গভীরতা মাপতে একটি জাতীয় তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
গবেষক দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্পষ্ট করেই বলেছেন— সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে শিশুদের এমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পরিচর্যার মধ্যে রাখা, যাতে তারা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো জটিল অসুস্থতাতেই না পড়ে। মনে রাখবেন, আজ আমাদের একটি ছোট ভুল আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সুতরাং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই আপনার শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না।
Independent Television