06/08/2026
❝ স্মৃতিপটে জুলাই বিপ্লব :প্রেক্ষিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ❞
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু না হওয়ায় বাড়িতে বসে ছুটি কাটাচ্ছিলাম। সময় যত গড়াতে থাকে আন্দোলন বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ছাত্র জনতার এ আন্দোলন দমাতে সরকারও নানামুখী অপচেষ্টা ও পলিসি গ্রহণ করতে থাকে।
১৬ জুলাই আবু সাইদের শাহাদাতের পর আন্দোলন কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিতে থাকে। এরপর মৃত্যুর মিছিল হয়েছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। এক পর্যায়ে এ আন্দোলন নয় দফা এবং সেখান থেকে স্বৈরাচার সরকার পতনের এক দফা দাবিতে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
এই এক দফার দাবিতে এদেশের আমজনতা রাজপথে নেমে আসে। এক দফা জনতার প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। রাজধানী ঢাকা-সহ বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, এমনকি উপজেলা পর্যায়ে এ আন্দোলন ছড়িয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই এর ছোঁয়া লাগে আমাদের সাতকানিয়া-লোহাগাড়া উপজেলায়।
★ তেসরা আগস্ট:অগ্নিগর্ভ লোহাগাড়া
৩৪ জুলাই অর্থাৎ তিন আগস্ট গণহত্যা ও গনগ্রেপ্তার, শিক্ষকদের উপর হামলার প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। লোহাগাড়ায় বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় বিকাল তিনটায়। মিছিল পদুয়া বাজার থেকে শুরু হয়ে যাবে আমিরাবাদ।
আর বাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না। বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণে মনস্থির করলাম। সিদ্ধান্ত হলো বাহাদির পাড়া থেকে আমরা যারা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করব, সবাই একসাথে একতাবদ্ধ হয়ে বের হব।
এদিন দুপুরের খাবার গ্রহণের পর আমরা যার যার মত করে মিছিলের প্রস্তুতি নিতে থাকি। বের হতে না হতে মারওয়ান এসে ডাক দিয়ে বলে, “বের হ তাড়াতাড়ি।” এদিক থেকে হাবিব,ইমরান,আরমান ভাই আর আমি বের হই।
আমাদেরকে পরিবার থেকে বাঁধা দেওয়া হচ্ছিল। আম্মু আর দাদু বলছিল, এসব আন্দোলন আর মিছিল-মিটিং থেকে যেন দূরে থাকি;আমি তাদের একমাত্র সন্তান;আমার কিছু হয়ে গেলে তাদের কি হবে? কে দেখবে তাদের? এসব বলাবলি করছিল। কিন্তু আমাদের বিবেক আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে দিচ্ছিল না। এতগুলো শহীদ ভাইদের রক্তকে আমরা বৃথা যেতে দিতে পারি না।
অনেককে দেখেছি, পরিবারের চাপে কিংবা অজুহাতে আন্দোলন হতে দূরে থাকতে। আবার বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মসূচি সফল করতে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে–এমন নজিরও অনেক দেখেছি।
যাইহোক,আমাদের সাথে বড় ভাই সা’দ, রিদওয়ান, ছোট ভাই আকিব, বাবার বয়সী চাচা—সেলিম কিংবা মসজিদের মুয়াজ্জিন—মাওলানা আরাফাতের মত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তাদেরকে দেখে আমরা উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
যাইহোক, সকলে মিলে গাড়ি করে রওনা দিই মিছিলের সূচনাস্থল পদুয়ার দিকে। পদুয়া বাজারে সেদিন বিজিবি’র কিছু সদস্য ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন উপস্থিতি নজরে পড়েনি। পদুয়া থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে স্লোগান সহকারে আমিরাবাদের দিকে যাচ্ছিল। আমরাও স্লোগান দিচ্ছিলাম—“আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে?” “আপোষ না সংগ্রাম? সংগ্রাম,সংগ্রাম” “রক্তের বন্যায়,ভেসে যাবে অন্যায়”। এভাবে স্লোগানে স্লোগানে আমিরাবাদ পৌঁছে আমরা সেখানে অবস্থান নিই।
সাতকানিয়া লোহাগাড়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন এসে আস্তে আস্তে জড়ো হচ্ছিল। সবার কন্ঠে একটাই আওয়াজ—“জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস। আমিরাবাদের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে অনেকক্ষণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর ওই দিনের মতো মিছিল সমাপ্ত করে আমরা বাড়িতে ফিরে আসি।
★ চৌঠা আগস্ট:ঐক্যবদ্ধ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া
বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে ও এক দফার দাবিতে আজকেও কেরানীহাটে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচির ডাক দেয় সাতকানিয়ার ছাত্রসমাজ ও জনসাধারণ। গতকালের মতো আজকেও আমরা বাড়িতে ফেরার অনিশ্চয়তা নিয়ে বের হয়ে পড়ি আন্দোলনে। আত্মরক্ষার স্বার্থে যে যার মত সামনে যা-ই পেয়েছি, হাতে নিয়ে নিয়েছি।
এরপর, গাড়ি নিয়ে আমরা ছুটে চললাম মিঠাদীঘির দিকে, যেখান থেকে আমাদের কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। সবাই চুপচাপ!কারো মুখে হাসি ছিল না;ছিল একরাশ দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কা। কিন্তু বুকে ছিল পাহাড়সম সাহস;অন্তরে ছিল মুক্তির সুতীব্র বাসনা।
মিঠাদীঘি পৌঁছেই আমরা মিছিলে যোগ দিলাম। আমাদের ভাইয়েরা আগে থেকে রাজপথ দখলে রেখেছিল। যথারীতি স্লোগানে স্লোগানে এগিয়ে যেতে থাকলাম গন্তব্যস্থল সাতকানিয়ার প্রাণকেন্দ্র কেরানীহাটের সম্মুখে। পথে পথে স্লোগান উঠছিল—“দফা এক,দাবি এক:হাসিনার পদত্যাগ”;“এক, দুই, তিন, চার—শেখ হাসিনা গদি ছাড়”;“বউত দিন হাইয়, আর ন হাইউ।”
কেরানিহাট পৌঁছে দেখলাম আমাদের পূর্বেই আন্দোলনকারীদের আরেকটি মিছিল চত্বরে অবস্থান নিচ্ছিল। আমরাও তাদের সাথে মিলিত হলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সফল কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষনা করা হল।
তারপর আবারও অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে, কিছু পথ গাড়ি করে আমরা ফিরে আসতে লাগলাম। পথিমধ্যে গুঞ্জন উঠলো আমিরাবাদে সন্ত্রাসীদের একটি দল অবস্থা নিচ্ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঐদিন পূর্ব কর্মসূচি না থাকা সত্ত্বেও আমরা আমরাবাদের দিকে অগ্রসর হই। আবারো সবার কন্ঠে হুংকার:“সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায়, স্বৈরাচারের ঠাই নাই” “হই হই, রই রই:ছাত্রলীগ গেলি কই”। মজার ব্যাপার হলো,আমাদের পরিচিত ছাত্রলীগের কিছু সাবেক কর্মীরাও আমাদের সাথে সুর মিলিয়ে এসব স্লোগান দিচ্ছিল। অবশ্য তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে আমাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছিল। আরো আশ্চর্যের বিষয় দেখলাম, আমিরাবাদ যাওয়ার পথে মা-বোনরা আমাদের জন্য পানি ও বিস্কিট-কলা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এই মুহূর্তগুলো আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমিরাবাদ পৌঁছে আমরা দেখি, সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতার খবরটি সঠিক ছিল ন। এরপরও ঐদিন আমরা কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান কর্মসূচি পালন ও স্বৈরাচার সরকার পতনের এক দফা দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করি। সন্ধ্যার দিকে অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় মিছিল শেষ করে সবাই বাড়ির দিকে রওনা দিতে শুরু করি।
★ ৫ই আগস্ট:নতুন স্বাধীনতা
টানা দুই দিন আন্দোলনের পর তৃতীয় দিনের মতো পাঁচ আগস্ট-ও বিকালের দিকে আমরা বের হয়েছিলাম। তবে আজ কোন ভয় বা ভীতি ছিল না। সবার হৃদয়ে বয়ছিল খুশির জোয়ার। যেন বাংলাদেশ আবার নতুন করে বিজয় লাভ করেছে। হ্যাঁ, বাংলাদেশ এক ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচার থেকে মুক্তি লাভ করেছে।
সেদিন আল্লাহর কাছে শুকরিয়ার মস্তক অবনত করেছি এবং একটাই দোয়া করেছি, আমাদের এই মাতৃভূমির মাটিতে যেন আর কোন হাসিনার জন্ম না হয়। শহিদ ফরহাদ, তরুয়া-সহ হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়কে আমরা রক্ষা করব—এই যেন হয় আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক:
নাজমুস সাকিব নাবিল
শিক্ষা সম্পাদক
সমাজ কল্যাণ সংস্থা