02/01/2026
আজ ২জানুয়ারি ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম কলেজ দিবস
আজ ২জানুয়ারি চট্টগ্রাম কলেজ দিবস
চট্টগ্রাম কলেজ—এই অঞ্চলের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির বিবর্তনের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""'
২ জানুয়ারি ১৮৬৯—একটি দিন নয়, একটি জাতিগত স্মৃতি। এই তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ অভিযাত্রা। ১৫৫ বছর বয়সের চট্টগ্রাম কলেজ কেবল ইট-পাথরের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি চেতনা, একটি দায়িত্ব এবং একটি আলোকবর্তিকা— যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখিয়ে চলেছে।
প্রায় ১৫৫ বছরের গৌরবময় পথচলায় চট্টগ্রাম কলেজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মানবিকতা ও নৈতিকতার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে।
এখানে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়—শিক্ষা মানে ইতিহাস বোঝা, সমাজকে উপলব্ধি করা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের যোগ্যতা অর্জন করা।
আমি একজন ইতিহাসের শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন আমাকে প্রতিদিন ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর সেই ইতিহাস আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম কলেজের অতীতের গৌরব থেকে ভবিষ্যতের দায়িত্বের দিকে।
কারণ এই কলেজ কেবল ইতিহাস পড়ায়নি—ইতিহাস গড়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ—দেশের প্রতিটি যুগান্তকারী সংগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজ ছিল নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে এই কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ফেরদৌস কবির স্যার যে প্রথম নিবন্ধ রচনা করেছিলেন, তা আজও আমাদের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের অনন্য নিদর্শন। ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ—লিচুতলায় অধ্যক্ষ আবু সুফিয়ান স্যারের নেতৃত্বে শিক্ষকবৃন্দের শপথ ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; ছিল নৈতিক অবস্থান গ্রহণের এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।
এই কলেজ তাই শুধু পাঠ্য ইতিহাসের অংশ নয়—এটি প্রেরণার উৎস। চট্টগ্রাম কলেজ নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও অগ্রদূত। অধ্যক্ষ শামসুল উলামা কামাল উদ্দিন স্যারের নেতৃত্বে নারী শিক্ষার সূচনা, শিক্ষার্থীদের জন্য এপ্রোন প্রবর্তন কিংবা চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার—সবকিছুই এই প্রতিষ্ঠানের প্রগতিশীল মানসিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
আজও চট্টগ্রাম কলেজ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষার পরিবেশ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও সচল শ্রেণিকক্ষ—সবখানেই জ্ঞানচর্চার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ।
মানসম্পন্ন পাঠদান, দায়িত্বশীল শিক্ষকতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব একাডেমিক পরিবেশ এই কলেজের মৌলিক শক্তি। শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে চট্টগ্রাম কলেজ বরাবরই অগ্রগামী। নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক উৎসব শিক্ষার্থীদের মনন ও শরীর—দু’টিকেই সমৃদ্ধ করে।
জাতীয় টেলিভিশন বিতর্কে চট্টগ্রাম কলেজের সাফল্য আমাদের গর্বের অংশ।
বাঙালি সংস্কৃতি এখানে কেবল দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন নয়—এটি চর্চার বিষয়। পহেলা বৈশাখ, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস চট্টগ্রাম কলেজে পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ, শালীনতা ও নৈতিকতার চর্চা—ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিকতার সমন্বয়—এই কলেজের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম কলেজে যে দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটেছে—তার পেছনে ছিল এক সুস্থ প্রশাসনিক সম্পর্ক। অধ্যক্ষ প্রফেসর মুজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী স্যার ও উপাধ্যক্ষ প্রফেসর সুব্রত বিকাশ বড়ুয়া স্যারের পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা ও সমঝোতা এই প্রতিষ্ঠানকে একটি প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সত্যিকারের পরিবারে রূপান্তর করেছে।
এখানে কখনোই একক কৃতিত্বের দাবি করা হয়নি—সব সাফল্য ভাগ করে নেওয়া হয়েছে পুরো কলেজ পরিবারের সঙ্গে।
উপাধ্যক্ষ প্রফেসর সুব্রত বিকাশ বড়ুয়া স্যারের অবসর গ্রহণে সাময়িক আবেগ থাকলেও আমরা জানি—প্রকৃতি শূন্যতা শূন্য রাখে না। নবযোগদানকৃত উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ শওকত ইকবাল ফারুকী স্যার এই পরিবারের নতুন অভিভাবক হিসেবে যুক্ত হয়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন—এই বিশ্বাস শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে সুদৃঢ়।
ক্যান্টিন গেইটে ঐতিহাসিক থিমের তোরণ নির্মাণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পুকুর খনন, ছাত্রাবাস উন্নয়ন, আধুনিক অডিটরিয়াম, স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত খাবারের ক্যান্টিন, মাস্টার রোল কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, অটোমেশনভিত্তিক ভর্তি ও সেবা—এই মানবিক ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিই চট্টগ্রাম কলেজকে আলাদা করে।
কিছুদিনের মধ্যেই শহীদ মিনারে ফুটবে রুদ্র পলাশ। আরবি বিভাগের সামনে তালিপাম গাছ একদিন ফুল দিয়ে স্মৃতি হয়ে যাবে—ঠিক যেমন চট্টগ্রাম কলেজ রেখে যায় আলো, স্মৃতি ও চেতনা—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
গভীর ইতিহাস, ব্যতিক্রমী নান্দনিকতা ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ—এই তিনের সমন্বয়েই চট্টগ্রাম কলেজ।
নতুন বছর, নতুন প্রত্যাশা। শুভ নববর্ষ ২০২৬।
শুভ জন্মদিন—২ জানুয়ারি ১৮৬৯—প্রিয় চট্টগ্রাম কলেজ।
ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে তুমি অনন্য—এবং আগামীর পথচলায় তুমি আমাদের গর্ব হয়েই থাকবে।
Anowar Malek Mazumder
শ্রেণী শিক্ষক ও ইতিহাস কর্মী