05/12/2025
ধম্মস্থানে অধম্ম-অসভ্যতা, এ লজ্জা রাখি কোথায়!
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
আজ অতীব ভারাক্রান্ত ও হতাশান্বিত হয়ে বরাবরের মতো এবারও লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমরা যে বড়ুয়া সমাজে বসবাস করছি এবং যে বড়ুয়াদেরকে ধম্মোপদেশ প্রদান করছি, সে বডুয়াদের অনেকের কাছে সেগুলির কোনো গুরুত্বই নাই। বরং বডুয়া যুব সমাজের অনেকের উশৃঙ্খলতা দিন দিন লাগামহীনভাবে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কি ঘরে, কি বাহিরে কিংবা কি বিহারে সর্বত্রই তাদের উশৃঙ্খল বেহায়াপনা প্রদর্শিত হচ্ছে। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, আমরা উলু বনে মুক্তা ছড়াচ্ছি। ব্যর্থ আমাদের এ প্রবচন!
তারা লোক দেখানো কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমাদেরকে সঙ্ঘদানের নামে আহ্বান করে থাকে। আমরাও নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে সেখানে কিছু ধম্মকথা বলে থাকি। উপস্থিত সকলে তখন ভক্তিতে গদ গদ হয়ে করজোড়ে সাধুবাদও দিয়ে থাকে। কিন্তু তা শুনে সেগুলির ছিটে ফোটাও তাদের জীবনে অনুশীলন করতে চোখে পড়েনা। আচরণ সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের যুব সমাজের ইন্দ্রিয়াসক্তি এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তারা কোথায় কি করবে তার হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। অথচ এককালে যারা ভিক্ষু-শ্রামণ রূপে বিহারে অবস্থান পূর্বক অন্যদের ধম্ম শিক্ষা দিয়েছে এবং সমাজের কাছ হতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে তাদের আচরণের মধ্যেও বুদ্ধ, ধম্ম এবং ভিক্ষু সঙ্ঘের প্রতি শ্রদ্ধা, গৌরব ও সম্মানবোধ দেখা যায়না।
আমি বিশেষ করে ফ্রান্সের বিষয়ে উল্লেখ করছি। এতদিন মদ্যাদি নেশা পান করে কারো বাড়িতে, পার্কে কিংবা কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানের ক্লাবে বিকৃত অঙ্গ-ভঙ্গি করে যৌনোত্তেজক গানের সাথে সাথে উন্মত্ত নৃত্য-গীত করতে দেখেছি আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখন সে উন্মত্ত উদ্দীপনার সীমা অতিক্রম করে বিহারে ধম্মস্থানে পর্যন্ত এসে গিয়েছে। বিহারে অবস্থানরত ভিক্ষু এবং বুদ্ধকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
বিহারকে সবাই পবিত্র ধম্মস্থানরূপে গৌরব করে থাকে। ধম্মচর্চা ও ধ্যান-ভাবনা অনুশীলনের জন্যই বিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে কামোন্মত্ত নৃত্য-গীত করার স্থান নয়। যে বুদ্ধ আমাদেরকে ধম্ম শিক্ষা প্রদান কেরেছেন, সে বুদ্ধের সামনেই আমরা যেভাবে বেহায়া গানের তালে তালে উদ্দাম নৃত্য-গীত করছি, ইহা কি বুদ্ধ বা ভিক্ষুর প্রতি চরম অবমাননা, অসম্মান, অগৌরব ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন নয় কি? যাদের নিকট সামান্য ধম্মজ্ঞান এবং বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তারা কখনও বিহারে গিয়ে এগুলি করার চিন্তাও তো করতে পারবেনা। তাই তাদের এরকম উশৃঙ্খল আচরণে বুঝা যায়, তারা যে একসময় গায়ে চীবর জড়িয়েছিল, বিহারে আশ্রয় নিয়েছিল সেগুলিও কেবল উদর পূর্তির জন্য এবং চীবর ও বুদ্ধকে পূঁজি করে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য। কদাপি বুদ্ধ কিংবা ধম্মের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হয়ে নয়। যদি শ্রদ্ধা থাকতো, তাহলে বড়ুয়ার ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান অন্তত: বুদ্ধের সামনে এরকম নাচ-গান করার মতো দৃষ্টতা দেখানোর সাহস করতে পারতোনা। যে বিহারে এসব অনৈতিক অপকর্ম হয়েছে, সেখানে অবস্থান রত ভিক্ষুরাও বিহারে ধম্ম-বিনয় পরিপন্থী কাজ হচ্ছে দেখেও কিভাবে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চুপ থাকতে পারল তাতে আরও বেশী অবাক হয়েছি। এতে ধরে নেওয়া যায় মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। আমাদের সমাজের কিছু তরুণ-তরুণীরা ধম্ম এবং ধম্মস্থানকে আজ কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
যারা অনেক অর্থ ব্যয় করে সন্তানের মঙ্গল কামনায় বিহারে ধম্মের নামে এরকম অধম্ম -অনাচারের আয়োজন করেছে, এখানে পুণ্য যত, তার চেয়েও অধিক পাপ সঞ্চয় করেছে। কেননা আগুনের সদ্ব্যবহারে কল্যাণ যেমন হয়, তেমনি অপব্যবহার করলে অমঙ্গল হয় ততোধিক। ইহা সার্বজনীন এবং শাশ্বত ধম্ম। ধম্মস্থান হল আগুন সদৃশ। পাপের ফল শীঘ্র বা দেড়ীতে হলেও ভোগ করতে হয়। ভোগ ব্যতীত কৃত কর্মের ফল সমাপ্ত হয়না।
অনেকের কাছে কথাগুলি অপ্রিয় হবে জানি। তারপরেও বলতে হচ্ছে। এ সম্পর্কে ধম্মপদে বুদ্ধ বলেছেন-
‘ওবদেয্যানুসাসেয্য অসব্ভা চ নিবারযে,
সতং হি সো পিযো হোতি, অসতং হোতি অপ্পিযো।’
অর্থাৎ যিনি অসভ্যতা নিবারণে অন্যদের উপদেশ দেন, অনুশাসন করেন, তিনি অসতের অপ্রিয় হয়ে থাকেন এবং সৎ লোকের হন প্রিয়ভাজন।
কামোত্তেজক নাচ-গানের অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে বুদ্ধ কি বলেছেন তা আমাদের সকলের অবগত থাকা প্রয়োজন।
অঙ্গুত্তর নিকায়ের রুণ্ণ বা রোদন সুত্রে বুদ্ধ তথাগত বলেছেন যে-
‘ভিক্ষুগণ! কামোত্তেজক বা রোমাঞ্চকর ‘গান’ আর্য-বিনয় সম্মত নয়। আর্য-বিনয় অনুসারে সেরকম ‘গান’ হল রোদন সদৃশ।
ভিক্ষুগণ! কামোত্তেজক বা রোমাঞ্চকর যে ‘নৃত্য’ তাও আর্য-বিনয় সম্মত নয়। আর্য-বিনয় মতে ‘নৃত্য’ হল পাগলামি।
ভিক্ষুগণ! যাঁরা দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত দাঁত দেখিয়ে উচ্চ স্বরে হাঁসতে থাকে, তাও আর্য-বিনয় অনুসারে ধর্ম সম্মত নয়। আর্য-বিনয় অনুসারে উচ্চ স্বরে দাঁত প্রদর্শন করে হাঁসা হল নাবালকত্বতা বা অপরিপক্কতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এজন্য ভিক্ষুগণ! এ যে কামোত্তেজক বা রোমাঞ্চকর যে গান, তার পরিণাম ভাল নয়। সুগতির সেতু নষ্ট বা ধ্বংসকারক। যারা সেরকম নৃত্য করে, তারাও একইভাবে নিজেদের সদ্গতির সেতু নষ্টকারী কাজই করে থাকে।
ধম্মে রমিত বা ধম্মে স্থাপিত সৎপুরুষেরা কখনও দন্ত দেখিয়ে উচ্চ হাস্য করেননা। সেরকম হাঁসা হল সাধারণ কামভোগীদের লক্ষণ।সৎপুরুষগণের মুস্কি হাঁসিই যথেষ্ট, যা হল আর্য-বিনয়ানুকুল।
ভিক্ষুগণ! তিনটি বিষয়ের কখনও তৃপ্তি হয়না। সে তিনটি বিষয় কি কি?
ভিক্ষুগণ! নিদ্রার তৃপ্তি হয়না। যত বেশী নিদ্রা যাবে বা ঘুমাবে, ততবেশী ঘুমের ইচ্ছা হবে।
ভিক্ষুগণ! মদ্য পানাদি নেশা দ্রব্যের সেবন হতেও তৃপ্তি পাওয়া যায়না। যতই পান বা সেবন করা হবে, ততই সেগুলির প্রতি আসক্তি বৃদ্ধি পাবে।
ভিক্ষুগণ! মৈথুন বা কাম সেবনেও কখনও পরিতৃপ্ত হওয়া যায়না। যতই কাম সেবন করা হয়, ততই কাম বা মৈথুন তৃষ্ণা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।
ভিক্ষুগণ! এ তিন বিষয়ের সেবনে কখনও তৃপ্তি পাওয়া যায়না। এগুলি সেবন করা বা এগুলিতে আসক্ত হওয়া তোমাদের কখনও উচিত নয়। সর্বথা মদ্য পান ও নেশা দ্রব্যের সেবন হতে বিরত থাকা উচিত। মৈথুন হতেও বিরত থাকা অবশ্যই কর্তব্য।’
উপরোক্ত ‘রোদন সুত্রে’ কামোত্তেজক বা রোমাঞ্চকর নাচ-গান, বাদ্য-বাজনাকে বুদ্ধ কোন দৃষ্টিতে দেখেছেন বা কিভাবে চিহ্নিত করেছেন এবং সেগুলির দুষ্পরিণাম বা বিপাক কি তাও বুদ্ধ তথাগত এ সুত্রে স্পষ্ট করে বলেছেন। বুদ্ধ দ্বারা নিন্দিত ও বর্জিত বিষয়গুলি ধম্মস্থান বিহারের মতো পবিত্র স্থানে যদি করা হয়, তা কতই যে অপ-সংস্কৃতির চর্চা এবং ধম্মের নামে অধম্মের চর্চা তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের চিন্তাশীল সুধীজন ও ভিক্ষু সঙ্ঘদের এ বিষয়ে গভীর দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। এ সমস্ত অপ-সংস্কৃতির চর্চা অন্তত:পক্ষে বিহার প্রাঙ্গনে না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। পৃথিবীর অন্য কোথাও কোন বৌদ্ধ বিহারে এরকম অপ-সংস্কৃতির চর্চা আমি কখনও দেখি নাই। জানিনা আমার এ কথাগুলি তাদের কানে পৌঁছে বিবেকবোধকে জাগ্রত করে কিনা।
ভবতু সব্ব মঙ্গলং
অভিজ্ঞতা: বিহারে এসে এই কান্ড-কীর্তন করার জন্য যে ভিক্ষু নিষেধ করবে ঐ ভিক্ষুর মতো খারাপ আর কেউ হয় না। আর অনেক ভিক্ষুরাও নীরব থাকেন বিভিন্ন লাভ-সৎকারের বা প্রতিষ্ঠান/বিহার রক্ষার কারণে। এমনকি একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ থেকে বিরত থাকতে বললে বা এগুলো করলে বিহারে আসতে নিষেধ করলে, ভদ্রতা পোষণ করতে বললে, সংযমতার সাথে আচরণ করতে বললে, এমনকি উচ্চস্বরে কথা বলতে নিষেধ করলেও অপরাধ। অনেক মানুষ বিহারে আসে কাকে ছোট করবে, অসম্মানিত করবে এই মানিসিকতা নিয়ে।
মূলত বিহারে আসতে হয় পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও ত্যাগময় মন নিয়ে। খারাপ মন নিয়ে ধর্মস্থানে আসলে নিজেরতো কিছু হবেই না, ধর্মেরও বারোটা বেজে যাবে। যেমনটি চারিদিকে ঘটে চলেছে। বিনয়ী হয়ে ধর্মস্থানে প্রবেশ করতে হয়, সকল মান, অহংকার পিছনে ফেলে। মৈত্রী পরায়ণ হয়ে ধর্মস্থানে প্রবেশ করতে হয়, যেন আমার কারণে কারো মনে পর্যন্ত আঘাত না পায়।