29/09/2026
বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভা'র বর্ষিয়ান ভিক্ষু ব্যক্তিত্ব শ্রীমৎ অতুলানন্দ থেরো'র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যথাযথ শ্রদ্ধায় শিলক সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রসঙ্গে আলোচনা
***********************************************************
এটি শুধু মৃতদেহ সৎকারের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ধর্মীয় শ্রদ্ধা, অনিত্যতার উপলব্ধি, পুণ্যসঞ্চার, সংঘের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বিশেষ করে বাংলাদেশে থেরোবাদী বৌদ্ধদের বিভিন্ন সম্প্রদায়—বড়ুয়া, চাকমা, মারমা, রাখাইন প্রভৃতির—মধ্যে রীতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
১. অনিত্যতার বোধ জাগ্রত করা: বৌদ্ধ দর্শনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো অনিত্য (Anicca)— জাগতিক সব সৃষ্ট বস্তুর উৎপত্তি ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ত্রিশরণ গ্রহণ, পঞ্চশীল পালন এবং পালি সূত্র পাঠের মাধ্যমে জীবনের অনিত্যতা স্মরণ করা হয়। প্রচলিত পাঠের মূল বক্তব্য হলো—সব সংযোজিত বস্তু অনিত্য; উৎপন্ন হয়ে তা বিলীন হয়।
অতএব, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো মৃত্যুকে জীবনের স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে উপলব্ধি করা।
২. ভিক্ষুর প্রতি ধর্মীয় শ্রদ্ধা নিবেদন: একজন ভিক্ষু সাধারণ গৃহীর তুলনায় বৌদ্ধ সংঘের ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। তাই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিভিন্ন বিহার থেকে ভিক্ষু, উপাসক-উপাসিকা ও দূর-দূরান্তের অনুসারীরা অংশগ্রহণ করেন। বিশেষত কোনো প্রবীণ বা বিশিষ্ট মহাথেরো'র ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান বৃহৎ সামাজিক সমাবেশে পরিণত হয়।
৩. পুণ্য অর্জন ও পুণ্য উৎসর্গ: বৌদ্ধ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জীবিতরা দান, সংঘদান, ধর্মশ্রবণ ও অন্যান্য সৎকর্মের মাধ্যমে পুণ্য অর্জন করেন এবং সে পুণ্য মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। বাংলাদেশে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরবর্তী সাংঘদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; সাপ্তাহিক সংঘদান অনুষ্ঠানেও ভিক্ষুদের দান ও ধর্মীয় আচার পালনের প্রচলন রয়েছে।
এখানে মূল বিষয় হলো—মৃত ব্যক্তিকে কোনো বস্তুগত উপহার দেওয়ার পরিবর্তে সৎকর্মের মাধ্যমে অর্জিত পুণ্য উৎসর্গ করা।
৪. সংঘের সঙ্গে গৃহী সমাজের সম্পর্ক সুদৃঢ় করা: ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংঘ ও সাধারণ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে। ভিক্ষুর জীবদ্দশায় তিনি যেমন ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দেন, মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে গৃহীরা সংঘের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভিক্ষুদের উপস্থিতি শোকাহত মানুষকে ধর্মীয় সান্ত্বনা ও মৃত্যুচিন্তার শিক্ষা দেয়।
৫. বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সমন্বয়: বাংলাদেশে বৌদ্ধ ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মূল বৌদ্ধ ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক রীতিও যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা সমাজে বিশিষ্ট ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, ঢোল-বাদ্য, শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় এসব নৃত্য ও সংগীতকে একই সঙ্গে ধর্মীয় শ্রদ্ধা এবং মারমা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৬. সামাজিক সংহতি ও সামষ্টিক অংশগ্রহণ: একজন সম্মানিত ভিক্ষুর মৃত্যু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে বৃহত্তর সম্প্রদায়ের ঘটনায় পরিণত হয়। দূরবর্তী বিহার ও অঞ্চল থেকে ভিক্ষু এবং সাধারণ মানুষ এসে অংশ নেন। ফলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্প্রদায়ের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতি বৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করে। বাংলাদেশি বৌদ্ধ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে গবেষণাতেও ব্যাপক সামাজিক অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. দেহের অনিত্যতা ও পুনর্জন্মের ধারণা: বৌদ্ধিক দৃষ্টিতে মৃতদেহকে চিরস্থায়ী হিসেবে দেখা হয় না। তাই দাহক্রিয়া দেহের ক্ষয় ও অনিত্যতাকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের মধ্যে দাহক্রিয়া প্রচলিত; তবে ভিক্ষুর ক্ষেত্রে অঞ্চল, সম্প্রদায় ও মর্যাদাভেদে দেহ সংরক্ষণ ও অন্ত্যেষ্টির সময়কালেও পার্থক্য দেখা যায়।
উপসংহার: সুতরাং, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ধর্মীয়, দার্শনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক—এ চারটি মাত্রাকে একত্রিত করে। এর মাধ্যমে একদিকে ভিক্ষুর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, অন্যদিকে অনিত্যতার শিক্ষা স্মরণ, পুণ্যসঞ্চয় ও পুণ্য উৎসর্গ, সংঘ-গৃহী সম্পর্ক দৃঢ়করণ এবং বৌদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের বড়ুয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজে এ অনুষ্ঠান স্থানীয় সংস্কৃতি ও থেরোবাদী বৌদ্ধধর্মের পারস্পরিক অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ভিক্ষুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার রীতি সব বাংলাদেশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে এক নয়; বড়ুয়া ও মারমা সমাজের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
লেখক : প্রজ্ঞাবারিধি অধ্যাপক সুমেধানন্দ মহাথের
মহাসচিব, বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভা