03/06/2026
ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরছি। বাসে পাশের সিটের সহযাত্রী একজন প্রকৌশলী। তিনি ঢাকায় অবস্থিত স্যামসাংয়ের একটি R&D সেন্টারে কাজ করেন; এটি পৃথিবীজুড়ে থাকা স্যামসাংয়ের ২৩টি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি। এর আগে মাইক্রোসফট তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে আর আইবিএম এর নিভু নিভু অবস্থা বলে জানালেন। কথায় কথায় উঠে এলো বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত, বিদেশি বিনিয়োগ এবং গবেষণা পরিবেশের প্রসঙ্গ।
তিনি বলছিলেন, স্যামসাংয়ের কোনো নতুন ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইস বাজারে ছাড়ার আগে সেটি বিশ্বের বিভিন্ন R&D সেন্টারে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। বাংলাদেশেও আসে। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় সেখানে। যেমন- একই ডিভাইস দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ভারতের R&D-তে পৌঁছাতে দুই দিনেরও কম সময় লাগে। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুধু বিমান বন্দরের কাস্টমসে পৌঁছাতে প্রায় এক সপ্তাহ; কাস্টমস থেকে R&D অফিসে পৌঁছাতে কখনো কখনো আরও কয়েক সপ্তাহ, এমনকি এক মাসও লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠিকানায় সামান্য টাইপো, ডকুমেন্টেশনের ক্ষুদ্র অসঙ্গতি বা ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে চালান আটকে থাকে দিনের পর দিন। তিনি এমন একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথাও বলছিলেন, যেখানে গবেষণার জন্য পাঠানো একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস দীর্ঘ সময় আটকে ছিল কেবল একটি ছোট প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে। আর সেই পণ্যটি কাস্টমস থেকে ছাড়াতে "২০ লাখ টাকা ঘুষ" চাওয়া হয়েছিল! তার ভাষায়, এসব ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার সহকর্মীরা জানার পর যেমন বিস্মিত হয়ে যান, তারা নিজেরাও জানাতে গিয়ে বিব্রত হন। কারণ গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি প্রোটোটাইপ এক মাস আটকে থাকা মানে কখনো কখনো পুরো প্রকল্পের সময়সূচি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, বাংলাদেশে প্রযুক্তি জায়ান্টদের অনুপস্থিতির কারণ দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। বাস্তবতা সম্ভবত উল্টো। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দক্ষ প্রকৌশলী বের হচ্ছেন এবং বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ঢাকার স্যামসাংয়ের R&D সেন্টারে সাড়ে চার শতাধিক বাংলাদেশি প্রকৌশলী বৈশ্বিক পণ্যের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি যদি বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে পারে, তাহলে সমস্যার মূল কারণ অন্য কোথাও।
সমস্যা হলো পরিবেশে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শুধু দক্ষ কর্মী খোঁজে না। তারা খোঁজে একটি নির্ভরযোগ্য, দ্রুত এবং পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা। যেখানে গবেষণার জন্য পাঠানো যন্ত্রপাতি বন্দরে আটকে থাকবে না; যেখানে কাস্টমস প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য; যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা গবেষণার গতিকে থামিয়ে দেবে না; যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সদর দপ্তর নিশ্চিত থাকতে পারে যে তাদের প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোবে। এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো predictability বা পূর্বানুমানযোগ্যতা। একজন বিনিয়োগকারীর কাছে সবকিছু নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু তিনি জানতে চান কী হবে, কেন হবে এবং কত দিনে হবে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন একই প্রক্রিয়া একবার দুই দিনে, আরেকবার দুই মাসে সম্পন্ন হয়।
একটি টেক কোম্পানি শুধু দক্ষ প্রকৌশলী দেখে অফিস খোলে না। তারা দেখে কাস্টমস কত দ্রুত, ভিসা কত সহজ, বিদেশি কর্মী আনা যায় কি না, মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়া যায় কি না, করনীতি স্থিতিশীল কি না এবং আইনগত ঝুঁকি কেমন। ভারত, ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড বা মালয়েশিয়া এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশে BUET, MIST, SUST, RUET, KUET, CUET থেকে অনেক ভালো ইঞ্জিনিয়ার বের হন। স্যামসাংয়ের সেন্টারই তার প্রমাণ।
কিন্তু একটি R&D হাব গড়ে উঠতে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, পেটেন্ট সংস্কৃতি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা অবকাঠামো এবং উচ্চমানের গবেষণাগার। এসব ক্ষেত্রে ভারত কয়েক দশক ধরে বিনিয়োগ করেছে। ভারতে Intel, Nvidia, AMD, Qualcomm, Microsoft, Google, Amazon, Apple এবং Samsung- প্রায় সবারই বড় আরঅ্যান্ডডি অপারেশন আছে। কারণ ১৯৯০-এর দশক থেকেই ভারত প্রযুক্তি খাতে ধারাবাহিক নীতি অনুসরণ করেছে। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে, গুরগাঁও, নয়ডা- এসব শহর আজ বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর ছাড়, অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু প্রযুক্তি খাতের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের জন্য আরও মৌলিক কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; যেমন- প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গবেষণাবান্ধব নীতি পরিবেশ।
আজকের বিশ্বে একটি R&D সেন্টার শুধু একটি অফিস নয়। এটি একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নীতি-পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। বাংলাদেশে দক্ষ প্রকৌশলীর অভাব নেই। স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান সেটিই প্রমাণ করছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ কি কেবল সস্তা ও দক্ষ জনশক্তির উৎস হয়ে থাকবে, নাকি এমন একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা গন্তব্যে পরিণত হবে, যেখানে তারা বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবে? প্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন শুধু মেধার নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, নীতি, শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও প্রতিযোগিতা।
✍️-মওদুদ সুজন