17/03/2026
প্লেটোর 'অ্যাপোলজি'।
খ্রীস্টপূর্ব ৩৯৯। এথেন্সে সহস্র মানুষের ভিড়। দ্য গ্রেটেস্ট ফিলোসফার সক্রেটিস এর বিচার হবে আজ। এথেন্সের কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী সক্রেটিস আজ আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন। সক্রেটিস বিরুদ্ধে দুই অভিযোগ: ১. গ্রিসের যুব সমাজকে সরকার বিরোধী করা। ২. গ্রীক গডদের অ্যাকনলেজ না করা। উৎসুক জনতার ভিড় বাড়ছে। ভিড়ের মাঝে সক্রেটিসের ছাত্র প্লেটো। সম্পূর্ণ সময়টা পরবর্তীতে তিনি লিখে রাখবেন তার 'অ্যাপোলজিয়া' বইতে, যেটা পড়েই পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে সক্রেটিসের ইতিহাস।
আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু। কই ! অন্যসব অভিযুক্তের মতো সক্রেটিস ক্ষমা চাইছেন না, অপরাধের জাস্টিফিকেশন দিচ্ছেন না, বরং ফিলোসোফিক্যাল ভঙ্গিতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কেন ইর-র্যাশনাল সেই যুক্তি দিচ্ছেন। বিচারকরা ক্ষুব্ধ: "এই লোকটার ভুল ধরা কি শেষ হবে না!"।
সক্রেটিসের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
সাবলীলভাবে বোঝালেন, যুবসমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো তার দোষ না, রেজিম এর এগেইনস্টে প্রশ্ন করা, তথাকথিত জ্ঞানীদের চোখে আঙুল দিয়ে অযৌক্তিকতা দেখিয়ে দেয়া দোষের না। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন আত্মার উন্নতিই সৃষ্টিকর্তার কাছাকাছি যাওয়ার একমাত্র পথ। এথেন্সের জনগণের দিকে তাকিয়ে বলেন- "হে এথেন্সের জনগণ, সত্য ও জ্ঞানের মাধ্যমেই 'the greatest improvement of soul' হওয়া সম্ভব। সত্য ও জ্ঞানের দিকে ফিরে আসো"। বিচারকরা এবার বিক্ষুব্ধ।
৫০০ জন বিচারকের মধ্যে ২৮০ জন সক্রেটিসকে দোষী সাব্যস্ত করে, ২২০ জন নির্দোষ রায় দেয়। আজকের দিন শেষ। ভোট অনুযায়ী সক্রেটিস দোষী, তবে কী শাস্তি হবে তা কাল জানানো হবে। সম্ভাব্য শাস্তি- মৃত্যুদণ্ড।
সক্রেটিস অবাক, ২৮০ জন বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন বলে নয়, ২২০ জন পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে। সক্রেটিসের কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি তার শাস্তি হিসেবে কী প্রত্যাশা করেন। জবাবে সক্রেটিস বলেন ফিলোসোফির ইতিহাসের এক বিখ্যাত লাইন- "The unexamined life is not worth living."
সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
সক্রেটিস হাসলেন, বললেন "মৃত্যুদণ্ড যে একটা শাস্তি, তা তোমরা কীভাবে জানো? মৃত্যু হলো আত্মার মুক্তি এবং আত্মা— অমর"। সত্যিই তা-ই হলো। সেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ সক্রেটিসকে অমর করে রাখলো। সক্রেটিস সবার সামনে থেকে বিদায় নেন। হেমলক বিষ পান করিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এই সবকিছুই ঘটে সক্রেটিসের প্রিয় ছাত্র প্লেটোর সামনে। যা তিনি পরবর্তীতে লিখেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'অ্যাপোলজিয়া'য় (গ্রিক অ্যাপোলজিয়ার মানে 'আত্ম-উক্তি')। সক্রেটিসের বিদায় মুহূর্ত নিয়ে প্লেটো তার অ্যাপোলজিয়ায় লিখেন, "We go our ways. I to die, you to live. Which one is better, only God knows".
প্লেটো রাগে, ক্ষোভে এথেন্স ছাড়েন। এক যুগ পর ফিরে আসেন। তৎকালীন এথেন্সকে বলা হতো গণতন্ত্রের জন্মভূমি। এবং সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডও হয় ভোটের মাধ্যমে। প্লেটো পরবর্তীতে গণতন্ত্রের অসাড়তা, এবং গণতন্ত্র কেন সকল সিদ্ধান্তে র্যাশনাল না সেটা মানুষকে বোঝাতে শুরু করেন। গণতন্ত্র সত্য, ন্যায় কিংবা জ্ঞানের পক্ষে ভোট দেয় না, জনপ্রিয়তা বা ট্রেন্ডকে ভোট দেয়। সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড যার প্রমাণ। গণতন্ত্র না হলে শাসন ব্যবস্থা কেমন হতে পারে তার একটা ধারণা দেন তার লেখা বিখ্যাত 'রিপাবলিক' বইয়ে। পরবর্তীতে, প্লেটোর ছাত্র এরিস্টটলও গণতান্ত্রিক সিস্টেমের তীব্র সমালোচনা করেন।
নিচের ছবিটি ১৭৮৭ সালে জ্যাঁ লুই ডেইভিডের আঁকা বিখ্যাত ছবি " The Death of Socrates". ছবিতে মাঝখানে সক্রেটিস, তার সামনে পেয়ালায় হেমলক বিষ। সক্রেটিসের পায়ের উপর হাত রাখা সক্রেটিসের বন্ধু ক্রিটো। সবার বামে বসে থাকা প্লেটো। ইন্টারেস্টিংলি প্লেটোর বয়স তখন অনেক কম থাকলেও ডেভিড প্লেটোকে সক্রেটিসের বয়সী ও একই কাপড়ে এঁকেছেন, কারণ সক্রেটিস সম্পর্কে আমরা যা জানি প্লেটোর মাধ্যমেই জানি।
(ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া)
লেখা: মো: সাইদুল ইসলাম, ইইই, চুয়েট।