03/05/2026
ডিমলা উপজেলা: ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য জনপদ
বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের নীলফামারী জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা হলো ডিমলা। উত্তরে ভারতের কোচবিহার, পূর্বে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, দক্ষিণে জলঢাকা ও পশ্চিমে ডোমার উপজেলা দ্বারা বেষ্টিত এই জনপদটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত।
নামকরণ ও ইতিহাস
ডিমলা নামের উৎপত্তি নিয়ে দুটি জনশ্রুতি প্রচলিত। এক মতে, ১৭৭০ সালে জমিদার বাবু হররাম সেন এখানে ডিম্বাকৃতি (ডিমের মতো) একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, যার থেকেই ‘ডিমলা’ নামের সৃষ্টি। অপর মতে, এলাকার তেল্লাই বিলে প্রচুর পাখির ডিম পাওয়া যেত, যা থেকে ‘ডিম তেল্লাই’ হয়ে কালক্রমে ‘ডিমলা’ নাম ধারণ করে।
ইতিহাসের পাতায় ডিমলার অবস্থান অতি প্রাচীন। একসময় এটি কামরূপ রাজ্য, পাল ও কোচ রাজবংশের অধীনে ছিল। ১৭৯৩ সালে থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে ডিমলা এবং ১৯৮৪ সালে উপজেলায় উন্নীত হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ডিমলা ছিল সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ১১ ডিসেম্বর পাক হানাদারমুক্ত হয় এই উপজেলা।
ভূগোল ও প্রশাসন
ডিমলা উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ৩২৬.৮০ বর্গকিলোমিটার। এখানকার পূর্ব সীমানা বয়ে চলেছে তিস্তা নদী, আর পশ্চিম ধরে বুড়ি তিস্তা। এই নদীবিধৌত এলাকার পূর্বাংশ বালুকাময় ও অনুর্বর হলেও পশ্চিমাংশ অত্যন্ত উর্বর।
প্রশাসনিকভাবে ডিমলা ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো: পশ্চিম ছাতনাই, বালাপাড়া, ডিমলা সদর, খগা খড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী, নাউতারা, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, টেপা খড়িবাড়ী এবং পূর্ব ছাতনাই।
অর্থনীতি ও জনজীবন
ডিমলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার প্রধান ফসল ধান, ভুট্টা, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা ও হলুদ। বিশেষ করে ভুট্টা ও মরিচের ফলন উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিস্তা নদী থেকে সংগৃহীত নুড়িপাথর ও বালু এই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ডিমলার মোট জনসংখ্যা ৩,১৬,৮৩৮ জন। সংখ্যাগরিষ্ঠ ৮৯.০৮% মুসলমান, প্রায় ১০.৯০% হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৯৭০ জন।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
শিক্ষার হারে ডিমলা এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সাক্ষরতার হার ৬৭.৬৪%। উপজেলায় রয়েছে ডিমলা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়, ঝুনাগাছ চাপানী সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়, খগাখড়িবাড়ী দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ডিমলা রাণী বৃন্দারাণী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া কারিগরি শিক্ষার জন্যও রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ভাওয়াইয়া ও সত্যপীরের গান ডিমলার লোকসংস্কৃতির অঙ্গ। কালীগঞ্জের উরশ ও মেলা এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব। হাডুডু, ডাংগুলির মতো ঐতিহ্যবাহী খেলা এখন ক্রিকেটের কাছে কিছুটা ম্লান হলেও এখনও জনপ্রিয়।
দর্শনীয় স্থান ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য ডিমলায় দেখার মতো স্থান রয়েছে তিস্তা নদী, বুড়ি তিস্তা নদী, বালাপাড়া বুরুজ ও গণকবর, তিস্তা সেচ প্রকল্প এবং ডিমলা জমিদার বাড়ি।
এই উপজেলার কৃতি সন্তানদের মধ্যে মশিউর রহমান যাদু মিয়া (সাবেক সিনিয়র মন্ত্রী), শফিকুল গনি স্বপন (সাবেক মন্ত্রী), এন.কে. আলম চৌধুরী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, শিক্ষার প্রসার ও কৃষি নির্ভর অর্থনীতির এই জনপদ ডিমলা আজও তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাদামাটা মানুষের আন্তরিকতায় ডিমলা যেকোনো পর্যটক কিংবা গবেষকের মন কাড়তে সক্ষম।